২৮ জুন ২০২০
ডেস্ক রিপোর্ট : টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। সবকটি নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তলিয়ে গেছে সড়ক ও হাটবাজার। কোথাও কোথাও বাড়ি-ঘর, মাছের ঘের ও আমনের বীজতলা তলিয়ে যাওয়ায় লোকজন ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ছাতক ও কোম্পানীগঞ্জে বন্যা দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ শহরে মধ্যবাজারে পানি উঠায় অনেক দোকান পাট বন্ধ রয়েছে। দোয়ারা বাজারে ভেঙ্গে গেছে চিলাই নদীর বেড়িবাঁধ। বিভিন্ন সড়কে দেখা দিয়েছে ফাটল ও ভাঙ্গন।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, টানা আরো ১০ দিন সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হবে। তবে, রোববার প্রচুর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত (২৪ ঘন্টায় ১০৭ মি: মি:) বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। এদিকে, বিভিন্ন নদনদীর পানি বিপদ সীমার ওপরদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে দুপুর ১২ টায় সুনামগঞ্জের সুরমা নদীতে ষোলঘর পয়েন্টে পানির প্রবাহতা ৮.৩৭ সেন্টিমিটার রেকর্ড করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যা বিপদ সীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া, কানাইঘাটে সুরমা ও লোভা নদী বিপদসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
সিলেট সদর
টানা বৃষ্টি এবং উজানের ঢলে সিলেট শহরতলীও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে জালালাবাদ- হাটখোলা ও মোগল ইউনিয়নের বেশিরভাগ গ্রামের বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া খাদিম নগর , ৮নং কান্দিগাঁওসহ প্রায় সবকটা ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এদিকে হাঁটখোলার উমাইরগাঁও, দখড়ি বড় কাপন, নন্দিরগাও, শিবেরবাজার, হাটখলো, রাজারগাও, জালালাবাদের মানসিনগর, রায়েরগাও, আলীনগর, কালিরগাওসহ পুরো ইউনিয়ন, কান্দিগাঁও ছামাউরাকান্দি, নীলগাঁও, নলকট, মোগলগাঁও ৪নং ওয়ার্ড, খাদিমনগর আলীনগর, ঘোড়ামারা, ছয়দাগ, গনকিটুক, বাউয়ারকান্দি, বাইশটিলা, রঙ্গিটিলা, পীরেরগাও, মধুটিলা, মোকামবাড়ি, বাইলার কান্দি, রইরকান্দি, শিমূল কান্দি, যুগলটিলা, ছালিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে দুর্ভোগ পড়েছেন বাসিন্দারা।
অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে সড়কে পানি উঠে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। মানুষের ন্যায় বন্দি গবাদি পশুও। এতে দেখা দিতে পারে গবাদি পশুর খাদ্যসংকট। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দুর্গত এলাকার লোকজন।
কোম্পানীগঞ্জ
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ বঙ্গবন্ধু মহাসড়ক ব্যতিত উপজেলার সকল কাঁচা-পাকা রাস্তা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। থানাবাজার, টুকেরবাজারসহ বেশিরভাগ বাজারঘাট তলিয়ে গেছে। উপজেলা পরিষদের মাঠ, থানা রোড ও টিএন্ডটি রোডে কোমর সমান পানি।
এছাড়া, ঢালারপাড়-মোস্তফানগর বেড়িবাঁধ, চাঁনপুর গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়ি, বিভিন্ন এলাকার কাঁচা-পাকা রাস্তা ও কালভার্টের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে সর্তক থাকার পরামর্শ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। উপজেলার ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়েছে। বানভাসি লোকজন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন আচার্য জানান, বন্যাকবলিত এলাকার খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। সেই সাথে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণের চাহিদা জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গোয়াইনঘাট
অব্যাহত বৃষ্টিপাতের মাঝে কিছু এলাকায় পানি কমলেও আরো নতুন কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে বন্যা দেখা দেয়া জায়গাগুলোর মধ্যে তোয়াকুল, ডৌবাড়ি ও নন্দীরগাঁও ইউনিয়ন রয়েছে। সারি ও পিয়াইন নদী বিপদসীমার ওপরদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গোয়ানঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব জানিয়েছেন, উপজেলার সিংহভাগ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রের জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে রাখা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষনিক মনিটরিং করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জৈন্তাপুর
অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নতুন করে জৈন্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে দরবস্ত, ফতেহপুর ও চিকনাগুল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা রয়েছে।
জৈন্তাপুর উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন মানিক জানিয়েছেন, বন্যার্থদের মাঝে কোন ত্রাণ সহায়তা এসে পৌঁছেনি। তবে, উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বলেও জানান তিনি।
কানাইঘাট
মোষলধারে বৃষ্টিপাতের কারণে কানাইঘাটের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বন্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল শনিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বারিউল করিম খান বড়চতুল ও লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। টানা বৃষ্টিপাতে কানাইঘাট পৌর এলাকাতে জলাববদ্ধতা দেখা দেয়ায় লোকজন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ
শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের কাজির পয়েন্ট দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সুরমা নদীর পানি। এছাড়াও শহরের বড়পাড়া, তেঘরিয়া, মধ্যবাজার, উকিলপাড়া, নবীনগরে সুরমা নদীর পানি ডুকেছে।
মধ্যবাজারের হোমিও চিকিৎসক ডা. দেবব্রত বণিক জানান, শুক্রবার রাত থেকে মধ্যবাজারে নদীর পানি উঠেছে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও সুরমা নদীর পানি প্রবেশ করেছে। একই বক্তব্য শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা মীর সুলতানের।
সুলতান জানান, রাত থেকে তাদের বসত ঘরে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করে। গতকাল দুপুর ১২ টায় সুরমা নদীতে শহরের ষোলঘর পয়েন্টে পানির প্রবাহতা ৮.৩৭ সেন্টিমিটার রেকর্ড করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যা বিপদ সীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৯০ মিলিমিটার।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পওর-১ মো. সবিবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ভরতে চেরাপুঞ্জিতে গত ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৪৯৫ মিলিমিটার। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত হলে ওই বৃষ্টির পানি সুরমা নদীতে এসে পড়ে। চেরুপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, সীমান্তবর্তী উপজেলা তাহিরপুর, বিশম্ভরপুর ও দোয়ারাবাজারের গ্রামীণ সড়ক ডুবে গিয়ে বন্যা দেখা দিয়েছে।
বিশম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর বিশ্বাস জানান, তার অফিসের নীচ তালয় বন্যার পানি ঢুকেছে। এছাড়াও উপজেলা সদরের সবকটি রাস্তা ডুবে গেছে।
বিশম্ভরপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান জানান, তার অফিসেও বন্যার পনি ঢুকেছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্ধসন সিংহ জানান, বন্যার ঝুকিতে রয়েছে তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন,দক্ষিণ বড়ল ইউনিয়ন ও বালিজুরি ইউনিয়ন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আব্দুল আহাদ জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষে বন্যার সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। তবে, এখনও ক্ষয়ক্ষতির কোন খবর পাওয়া যায়নি। পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী মওজুদ আছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো ও প্রস্তুত করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এব্যপারে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।