২৯ মে ২০২০
ডা. এ.এ সালাম : মানুষ সামাজিক জীব। স্হীর হয়ে থাকা কিংবা একা একা অলস সময় কাটানো তাদের অভ্যাস নেই। যুবকেরা কাজ ছাড়া কেউ ঘরে বসে নেই- ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনমজুর, শ্রমিক, পরিবহন ড্রাইভার-হেলপার ছোট ব্যবসায়ীরা ঘরে বসে জীবিকা নির্বাহে এক কঠোর পরিস্থিতির মধ্যে অনেকেই কষ্টের মধ্যে আছেন। তাদের কাছে জীবনের ছেয়ে ক্ষিদা নিবারন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সরকারী অনুদান ব্যক্তিগত সাহায্য সহযোগিতা চলতে থাকলে ও ৩/৪ কোটি মানুষের প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানো খুবই কঠিন।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যবসায় ধ্বস নামা এবং কোটি কৌটি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ ব্যবসাহিদের জন্য এক দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির মোখে। লকডাউন , সামাজিক দুরত্ব, ঘরে থাকা ইত্যাদি কেউ মানছে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ৪০০০ এর অধিক সংখ্যক সদস্য আক্রান্ত-১৫ জনের অধিক মৃত্যুবর্ন করেছেন । ৮০০ এর অধিক চিকিত্সক সহ হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা দান কারী প্রায় ২০০০ জন আক্রান্ত এবং ১২ জনের অধিক প্রান দিয়েছেন। বিভিন্ন সামরিক বেসামরিক সরকারী বেসরকারী চাকুরীজিবি,সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করছেন।
এমতাবস্থায় দেশের সকল শাখা ও রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে স্হবির থেকে স্হবিরতের দিগে যাচ্ছে। যদিও মৃত্যুর হার আমাদের দেশে ১.৪-১.৬% মধ্যে আছে কিন্তু আক্রান্তের হার ২০%ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যতই টেস্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে আক্রান্তের হার ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সত্যিকারের আক্রান্তের হিসাব কারো জানা নেই। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত প্রতি ৫৮০ জন মানুষের মধ্যে ১ জনের টেস্ট হচ্ছে, ভারতে প্রতি ৪০৫ জনে ১জনের পরীক্ষা হচ্ছে যেখানে উন্নত বিশ্বে প্রতি১৫-২০ জনে ১জনের টেস্ট হচ্ছে। যদিও সেসব দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যর হার অনেক বেশি( ৫-১৬%) ব্রাজিলে আক্রান্তের হার ৫০% এবং বেলজিয়ামে সর্বোচ্চ মৃত্যর হার ১৫-২০% এবং সমগ্র বিশ্বে গড় মৃত্যুর হার প্রায় ৬%। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই বিশ্বের ৩০% আক্রান্ত এবং বিশ্বের ২৮% মৃত্যু সেই দেশে।
এশিয়ার মধ্যে নেপাল ,ভুটান ও শ্রিলংকা আমাদের ছেয়ে ভাল অবস্থানে তবে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ছেয়ে আমরা কিছুটা ভাল । আমাদের দেশে মৃত্যুর হার এখনও কম হওয়ার কারনের মধ্যে একটি কারন হতে পারে এযাবত আমাদের বয়স্ক লোকজন ও দীর্ঘমেয়াদের রোগে যারা ভুগছেন তারা অধিকাংশরাই ঘরের বাহিরে জান নি কিংবা দীর্ঘদিন ছুটির কারনে অফিসআদালতে যেতে হয় নি। করোনা মহামারির ৪র্থ স্তরে এখন বাংলাদেশ অতিবাহিত করছে অর্থাত কমিউনিটি সংক্রমণ হচ্ছে কে করোনা কে করোনা নহে বুঝবার কোন উপায় নেই। ৩০% মানুষ উপসর্গছাড়াই করোনা নিয়ে কমিউনিটি এবং তাদের পরিবারের সাথে বসবাস করে নিরবে করোনা ছড়িয়ে যাচ্ছে।
তাছাড়া শহর থেকে গ্রামে এসে ঈদের কোলাকুলি তাতে করোনার সংগে মাখামাখি ও শুভেচ্ছা বিনিময় কতখানি হলো তারপর আবার শহরে ফিরে গিয়ে কি অবস্থা হয় সেটাও দেখার বিষয়।। এই অবস্থায় সবকিছু চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিগে যাচ্ছে সপ্তাহ তিনেক পরই বুঝা যাবে।মৃত্যুর হার এরকম নিম্নমুখি থাকবে কিনা সেটাও চিন্তার বিষয়। আক্রান্ত ক্রমান্বয়ে যেভাবে বাড়ছে মৃত্যুর হার ও সংখ্যা সেভাবেই বাড়বে বৈকি কমার কোন কারন নেই।
এখনই হাসপাতালে সিট নেই অক্সিজেন ও ভেন্টিলিটার নিয়ে কাড়াকাড়ি দৌড় ঝাঁপ- রোগী বাড়ার সাথে মোকাবিলা করার সক্ষমতা সেইভাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে কি না? সেই অবকাঠামো , জনবল ও যন্ত্রপাতি কতটুকু প্রস্তুত? ।সরকার অর্থনীতির চাকা কিছুটা সচল এবং মানুষের জীবন জীবিকার জন্য সবকিছু পর্যায় ক্রমে সচল করতে যাচ্ছেন এই পর্যায়ে এ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তবে মানুষকে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘঠলে আবারো লকডাউনে যেতে হবে।
যেহেতু এখন পর্যন্ত করোনার কোন কার্যকর চিকিত্সা কিংবা ভেক্সিন আবিষ্কার হয় নি এবং খুব সহসা হবে বলেও মনে হয় না। তাই প্রত্যেক মানুষকে বাঁচার জন্য মাস্ক অবশ্যই পরতে হবে সেই সাথে সকলক্ষেত্রে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা ও হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। নিজের জীবন নিয়ে নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নিজের পরিবারের কথা ভাবতে হবে । তারপরও আক্রান্ত হয়ে গেলে মানসিকভাবে শক্ত থেকে নিজের ঘরে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্সা নিতে হবে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও সমাজ ও দেশকে বাঁচাতে হোম কোয়ারেন্টাইনে নিয়ম মেনে চলতে হবে।
কেবল বেশী শ্বাসকষ্ট হলে হাসপাতালে ভর্তি হবেন। মৃদু শ্বাসকষ্ট হলে ঘরে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে বাড়িতে বসে অকসিজেন নিন। সবসময় ফোনে কিংবা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুষম খাবার গ্রহণ করুন। অন্যান্য অসুখের ঔষধ চালিয়ে যান। দয়াকরে কোন ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত চিকিত্সা পদ্ধতি অনুসরণ করবেন না।
(লেখক : পরিচালক, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট।)