২০ মে ২০২০


সরকারি গুদামে মধ্যসত্ত্বভোগীর ধান, বঞ্চিত কৃষকরা

শেয়ার করুন

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের পর শুরু হয়েছে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের কার্যক্রম। প্রক্রিয়ায় রয়েছে উন্মুক্ত লটারীর ব্যবস্থাও। কিন্তু তালিকা হালনাগাদ এবং মাঠ পর্যায়ে তদারকির অভাবে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষকরা। সরকারের গুদামে যাচ্ছে মধ্যসত্ত্বভোগীদের ধান। ফায়দা লুটছেন জনপ্রতিনিধি, তাদের আত্মীয় এবং অন্য পেশার লোকজন।

এমন চিত্রই উঠে এসেছে হবিগঞ্জ জেলায় কৃষকদের কাছ থেকে সরকারের বোরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে। অভিযোগ রয়েছে কার্ডধারীদের অল্প টাকা দিয়ে অসাধু লোকদের রমরমা বাণিজ্যেরও। লোকবল সংকটের কারণে মাঠ পর্যায়ে পুরোপুরি যাচাই করা যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলায় এবার ২০ হাজার মেট্রিক টন বোরো ধান সংগ্রহ করেছে সরকার। দাম নির্ধারণ হয়েছে প্রতি কেজি ২৬ টাকা। গেল কয়েকদিনে সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বানিয়াচং উপজেলার দু’টি ইউনিয়ন থেকে ৩৫ কার্ডের বিপরীতে এসেছে ৭০ মেট্রিক টন। যাদের ৩০ জনই কাগাপাশা ইউনিয়নের।

ওই ইউনিয়নে উন্মুক্ত লটারী কার্যক্রমে অংশ নেন ৬৫০ কার্ডধারী। নির্বাচন করা হয় ২১৫টি কার্ড। ইতোমধ্যে ৩০টি কার্ডের বিপরীতে ধান এসেছে ৬০ টন। অন্যদিকে ৩০ কার্ডধারীর মধ্যে ১৪ জনই প্রকৃত কৃষক না বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় লোকজন। মধ্যসত্ত্বভোগীরা কার্ডপ্রতি ৫০০ অথবা ১ হাজার টাকা দিয়ে নিজেদের ধান দিচ্ছেন সরকারের গুদামে। এমনটাই দাবি করেছেন জনপ্রতিনিধিরা।

লটারী বিজয়ীদের তালিকায় রয়েছেন ওই ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামের দীপন দাশ, ধনঞ্জয় দাশ, সুরঞ্জিত দাশ, রামমোহন নাগ, রীনা রানী দাশ, মিহির সরকার, জলাই মিয়া, রিজিয়া বেগম ও হাফিজুর রহমান। কাগাপাশার রঞ্জু সরকার ও অপু মিয়া এবং বাগাহাত গ্রামের শাফির উদ্দিন, ফারুক মিয়া ও কামাল মিয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এদের মধ্যে শাফির উদ্দিন ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য, রামমোহন নাগ পল্লী চিকিৎসক এবং রিজিয়া বেগম একজন এনজিও কর্মী। বাকী ১১ জনের কেউই বর্তমানে কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত নয়।

উপকারভোগী ধনঞ্জয় দাশ বলেন, তার স্ত্রী সাবেক নারী ইউপি সদস্য। বর্তমানে তিনি অসুস্থ। ছেলে দোকান কর্মচারী। চাষ করেননি জমিও। অন্য একজনের নিকট থেকে দুই টন ধান ক্রয়ের পর সরকারিভাবে বিক্রি করেছেন তিনি। জমি চাষ না করেও কিভাবে ধান বিক্রয় করলেন জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি এদের আরও কয়েকজন।

তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল কাশেম চৌধুরী বলেছেন, এদের কার্ড ব্যবহার করে গুদামে ধান বিক্রয় করেছেন মধ্যসত্ত্বভোগীরা। মৌসুম এলেই ১ হাজার অথবা ৫০০ টাকা দিয়ে কার্ড হাতিয়ে নেয় ওই চক্রটি।

জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও কৃষককে বঞ্চিত করে নিজে সুবিধা কেন নিলেন জানতে চাইলে ইউপি সদস্য আলতাব আলী বলেন, সরকারি নিয়মানুযায়ী লটারীর মাধ্যমে আমি এবং আমার ভাতিজা ধান বিক্রি করেছি।

এ ব্যাপারে কাগাপাশা ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু কাউছার বলেন, ধান না থাকলেও অনেক কার্ডধারীকে ব্যবহার করে গুদামে ধান দিচ্ছেন মধ্যসত্ত্বভোগীরা। জনবল কম থাকায় মাঠ পর্যায়ে বেশী তদারকি করা যাচ্ছে না। অন্যত্র থেকে লোকজন এসে কার্ড ক্রয়ের মাধ্যমে ধান বিক্রি করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

যোগাযোগ করা হয় লটারী বিজয়ী আরও দু’টি ইউনিয়নের ৩ কার্ডধারীর সঙ্গে। এদের মধ্যে দু’জন একই পরিবারের সদস্য অকৃষক এবং অন্যজন পেশায় রাজমিস্ত্রী। তাদের ঘরে নেই বিক্রয়যোগ্য ধান। কিভাবে লটারী বিজয়ী হলেন তাও জানেন না তারা। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের কার্ড ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে রয়েছে বলে জানান।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য গুদামের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করলে দেখা যাবে অন্তত ৪০ শতাংশ কার্ডধারীই অকৃষক। যাদেরকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে মধ্যসত্ত্বভোগীরা।

এদিকে ২৬ টাকা কেজি দরে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে হবিগঞ্জ জেলায় ২০ হাজার মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করছে সরকার। যার মূল্য হয় ৫২ কোটি টাকা। অথচ কিছুদিন পূর্বেও হবিগঞ্জে ধানের বাজার দর ছিল সর্বোচ্চ ১৪ টাকা কেজি। এতে ২০ হাজার মেট্রিক টনের মূল্য হয় ২৮ কোটি টাকা। তখনই ধান ক্রয় করে একটি সিন্ডিকেট।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ জেলা কৃষক লীগ সভাপতি হুমায়ুন কবীর রেজা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষকদের সুবিধা নিশ্চিতে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চালু করেছেন। অথচ প্রতি বছরই এক শ্রেণীর অসাধু লোক সিন্ডিকেট করে হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। এদের সঙ্গে জড়িত থাকেন দায়িত্বশীলরাও। সেজন্য লটারী কার্যক্রমে শুধু কার্ডের নাম্বার না ব্যবহার না করে কার্ডধারীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার যুক্ত করা উচিত। এছাড়া উন্মুক্ত লটারীর পর তালিকা সঠিকভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় টানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকার বলেন, নিয়মিতই মাঠ পর্যায়ে তদারকি করা হচ্ছে। কার্ড ব্যবহার করে মধ্যসত্ত্বভোগীদের ধান দেয়ার বিষয়টি ধরা পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেয়ার করুন