২৪ মে ২০১৯
উপজেলা প্রতিনিধি, দোয়ারাবাজার

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ও লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি খাসিয়ামারা নদী। নদীটি খনন না করায় কপাল পুড়ছে লক্ষাধিক কৃষকের। শুকনো মৌসুমে কৃষকদের ফসলি জমি চাষাবাদের সুবিধার্থে পানি সংরক্ষণ করে রাখতে নদীটির সুরমা ইউনিয়নের পশ্চিম টিলাগাঁও অংশে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় রাবারড্যাম সেচ প্রকল্প।
আর রাবারড্যামের উজানে বছরের পর বছর পাহাড় থেকে আগত বালি জমে বিশাল চর সৃষ্টি হওয়ার ফলে ভেস্তে যাচ্ছে কৃষকদের স্বপ্নের রাবারড্যাম প্রকল্প। নদীতে চর জেগে ওঠায় শুকনো মৌসুমে পানি ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গত কয়েক বছর ধরে পানির অভাবে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে হেক্টরের পর হেক্টর ফসলি জমি। এতে একদিকে যেমন খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
অপরদিকে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা। নদী ভরাটের কারণে ভরা বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে ধেয়ে আসা অল্প পানিতে অসময়ে বন্যার সৃষ্টি হয়ে প্রতি বছরই প্লাবিত হয় নদীর দুই কূলের বিস্তীর্ণ এলাকা।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, নদীর উভয় তীরে বিশালাকার বালুচরের সৃষ্টি হয়েছে। আর এসব চরের কারণে নাব্যতা হারিয়ে ইতোমধ্যে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ অনেকটাই পাল্টে গেছে। এতে রাবারড্যাম-লক্ষীপুর সড়কটি রয়েছে হুমকির সম্মুখীন।
অপরদিকে, নদীভাঙন ক্রমশ চরম আকার ধারণ করছে। ফলে অব্যাহত নদীভাঙনে হুমকির মুখে রয়েছে পশ্চিম বাংলাবাজার, টিলাগাঁও, মহব্বতপুর, আলীপুর বাজারসহ নদী বিধৌত আশপাশের প্রায় ১০-১৫টি গ্রামের বসতভিটা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। নদী ভরাটের কারণে রাবারড্যাম প্রকল্পটি কাজে আসছে না। আর গত কয়েক বছর ধরে নদীর উজানে ভারতের সন্নিকটে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখছে স্থানীয়রা। ফলে রাবারড্যাম সেচ প্রকল্পে পর্যাপ্ত পানি ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পানি না থাকায় গত কয়েক বছর ধরে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে।
ফলে স্থানীয় কৃষকদের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা পরিচালনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষকদের দাবি, চাষাবাদ ও কৃষিজমি টিকিয়ে রাখতে খাসিয়ামারা নদী খনন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে রাবারড্যাম পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম ও টিলাগাঁওয়ের কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, ‘নদীতে চর পড়ে ভরাট হওয়ায় রাবারড্যাম সেচ প্রকল্পের মাধ্যমেও পানি ধারণ করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পানি না থাকায় এবারও বেশিরভাগ জমি অনাবাদি রয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামিতে বৃহত্তর লক্ষীপুর ইউনিয়নের কৃষি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে। তাই অবিলম্বে সরকারি ভাবে নদী খননের উদ্যোগ নেয়া হোক।’
জাতীয় কৃষক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আবাদি কৃষক নেতা আব্দুল আওয়াল জানান, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। খাসিয়ামারা নদীর খনন না হওয়ায় উপজেলার লক্ষাধিক কৃষক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আমরা একাধিকবার ভুক্তভোগি কৃষকদের নিয়ে সভা-সমাবেশ করে কৃষিকাজের সুবিধার্থে খাসিয়ামারা নদী খননের দাবি জানিয়েছি। কৃষকদের এই প্রাণের দাবি মেনে নিয়ে সরকারিভাবে দ্রুত নদী খননের উদ্যোগ নেয়া হোক।’
বৃৃহত্তর লক্ষীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহান মাস্টার জানান, ‘নদী ভরাট হওয়ায় শুধু কৃষকরাই নয়, আশপাশ এলাকার সবাই ক্ষয়ক্ষতির শিকার। নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। এলাকাবাসীর বৃহত্তর স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরণের প্রকল্প গ্রহণ করে ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে খাসিয়ামারা নদী খননের উদ্যোগ নেয়া অত্যাবশ্যক। এতে এলাকার সবাই উপকৃত হবেন।’
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মামুনুর রশীদ জানান, কৃষকদের দাবির সাথে আমিও একাত্মতা পোষণ করছি। উজানে বালুর চর জেগে ওঠায় বহুল আলোচিত খাসিয়ামারা নদীটি ক্রমশ তার নব্যতা হারাতে বসেছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, গ্রাম-গ্রামান্তর ও ফসলি জমিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। শুকনো মৌসুমে পানি না থাকায় কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না। রাবারড্যামের উজান থেকে ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে নদী খনন করা গেলে নদী আগের মতো তার নব্যতা ফিরে পাবে। কৃষকরা আশানুরূপ ফলন উৎপাদনেও বেশ উপকৃত হবেন। তাই দ্রুত খাসিয়ামারা নদী খননের জোর দাবি জানান তিনি।