২২ মার্চ ২০১৯


‘ঝুঁকি’ নিয়ে চলছে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসা

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

সিলেট : আবাসিক খাতে কয়েক বছর নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় গত কয়েক বছরে সারা দেশের ন্যায় সিলেটেও বেড়েছে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার। গ্রাহকদের চাহিদা থাকায় বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে কয়েকগুণ। পরিপ্রেক্ষিতে সিলেট নগরে কোনো নিয়মনীতি না মেনেই অবৈধভাবে মজুদ করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে সিলিন্ডার বেচাকনোর পরিমাণ।

বেশিরভাগ দোকানি বিস্ফোরক পরিদফতরের সনদ ছাড়াই এ ব্যবসা করছে। যেখানে সিলেট জেলায় ৪৮৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে বিস্ফোরক লাইসেন্স নেওয়া আছে। খোঁদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বলছেন, সারা জেলায় যে পরিমান অনুমোদন দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে বেশি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সিলেট নগরেই। আর ঝুঁকি এড়াতে শীঘ্রই এসব অবৈধ সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানেও নামতে চায় জেলা প্রশাসন।

সিলেটে এলপি সিলিন্ডার এখন পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে। এসব দোকানির অনেকেরই আবার ট্রেড লাইসেন্স নেই। কেউ কেউ ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা করলেও আবার গ্যাস সিলিন্ডার বেচাকেনারও অনুমোদন নেই। এসব দোকানে নেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিকারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায় বাড়ছে ঝুঁকি। ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে প্রাণহানির মত অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা।

সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় নগরের বন্দরবাজার, মহাজনপট্টি, দক্ষিণ সুরমা, সোবহানীঘাট এলাকায় রাস্তার পাশের ফুটপাতে মজুদ করে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া পাড়া-মহল্লা, অলিগলির ছোট ছোট দোকান, খুচরা বাজারের দোকান, আবাসিক এলাকার দোকানগুলোতে যত্রতত্র ফেলে রেখে বিক্রি করছে এলপিজি সিলিন্ডার। এদের বেশিরভাগই বিস্ফোরক পরিদফতরের সনদ নেননি। আবার যাদের ছাড়পত্র ও সনদ আছে তারাও নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন না। অনেকে আবার সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। নেই কোনো তদারকির ব্যবস্থা।

গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য বিস্ফোরক পরিদফতরের সনদ আছে কি না জানতে চাইলে নগরের বন্দরবাজার মহাজনপট্টি এলাকার মো. ইকবাল মিয়া বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন না এবং ডিলারও তাকে অবহিত করেননি। তার মতো অনেক খুচরা এলপি গ্যাস বিক্রেতা আইন না জেনেই ব্যবসাটি চালিয়ে যাচ্ছেন। বেশিরভাগ দোকানি ব্যবসা পরিচালনার সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স নিলেও ১০টির বেশি সিলিন্ডার মজুদ রেখে বিক্রির ক্ষেত্রে বিস্ফোরক সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

নগরের মহাজনপট্টির এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিস্ফোরক পরিদফতরের সনদ ছাড়াই অসংখ্য ব্যবসায়ী এ ব্যবসা করছেন। লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় সবাই এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। সিলিন্ডার ব্যবসায় সরকার বড় অঙ্কের ট্যাক্স নিয়ে থাকে। বিক্রেতা ও সরকার দুই পক্ষ লাভবান হওয়ায় যত্রতত্র সিলিন্ডার ব্যবসা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলছে না।

বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪-এর অধীনে গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা-২০০৪ এর ৬৯ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া অনধিক ১০টি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদ করা যাবে। তবে বিধির ৭০ ধারা অনুযায়ী, এসব সিলিন্ডার মজুদ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুদ রাখতে হবে। এলপিজি স্থাপনা প্রাঙ্গণে ধূমপান, দিয়াশলাই বা আগুন লাগতে পারে এমন কোনো বস্তু বা সরঞ্জাম রাখা যাবে না। মজুদ করা স্থানের কাছে আলো বা তাপের উৎস থাকা চলবে না। তবে এসব নির্দেশনা আর নিষেধাজ্ঞা মানছেন না সিলেটের ব্যবসায়ীরা। চায়ের দোকানে চুলার পাশে মজুদ রেখে কিংবা সিগারেটের দোকানে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার।

সিলেট বিস্ফোরক পরিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলায় ৪৮৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে বিস্ফোরক লাইসেন্স নেওয়া আছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে অ্যামোনিয়া গ্যাসের এবং ৪০টির অধিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। সিলেট বিস্ফোরক পরিদফতর থেকে ৪০টি সিলিন্ডারের কম কোনো ব্যবসায়ীকে অনুমোদন দেওয়া হয় না।

সিলেট বিস্ফোরক পরিদফতরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. আলীম উদ্দিন বলেন, সারা জেলায় যে পরিমাণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এর চেয়ে বেশি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেবল সিলেট নগরেই রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরক লাইসেন্স ১ বছরের মেয়াদে দেওয়া হয়। প্রতি বছর এই লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। সিলেটে বিস্ফোরক লাইসেন্স ছাড়া যারা সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবসা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশনা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিলেটে পাড়া মহল্লায় অবাধে যেভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। এটা খুবই বিপজ্জনক। এতে করে যেকোনো সময় প্রাণহানির মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণকে সতর্ক হতে হবে। ব্যবসায়ীদের মনিটরিংয়ের জন্য বিস্ফোরক পরিদফতর, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সবকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, যততত্র সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করা অনেক বিপজ্জনক। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে সিলেট বিস্ফোরক পরিদফতরের পরিচালকের সঙ্গে কথা হয়েছে। শিগগিরই অবৈধ সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

শেয়ার করুন