২৪ আগস্ট ২০১৭


নিষিদ্ধ ওষুধ ও ভ্যাকসিনে চলছে গরু মোটাতাজাকরণ

শেয়ার করুন

বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর প্রতিনিধি : কুরবানির ঈদ সামনে রেখে বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলায় পশুর হাটগুলো জমে উঠতে শুরু করেছে। এবার দুই উপজেলায় স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ডজন খানেক পশুর হাট বসছে। প্রতিদিনই উপজেলার কোথাও না কোথাও হাটবারতো থাকছেই।

বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার গোখামারি ও সাধারণ গৃহস্থরা তাদের পালিত পশুগুলো বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে আসছেন। এসব পশুর অধিকাংশই ভ্যাকসিন দিয়ে মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গোখামারিও গৃহস্থরা অধিক লাভের আশায় ভয়াবহতা জেনেও গোপনে তাদের পালিত পশুগুলোকে মোটাতাজাকরণে নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষকদের বাড়ি ও গোখামারে অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারো নিষিদ্ধ ওষুধ ও ভ্যাকসিনের মাধ্যমে চলছে গরু মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়া। অর্থলোভী কিছু অসাধু ব্যক্তি ও খামার মালিক এসব গরু দ্রুত মোটাতাজা করতে সরকারি নিষেধ অমান্য করে ভারতীয় নিষিদ্ধ স্টেয়েড গ্রুপের ক্ষতিকারক ওষুধ গরুকে সেবন করাচ্ছেন।

তবে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগ গরু মোটাতাজাকরণে নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার বন্ধে খামারি ও গৃহস্থদের নিরুৎসাহী করতে কোনো ভূমিকা রাখছে না বলে অভিযোগ ওঠলেও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। ক্ষতিকারক ওষুধ দিয় মোটাতাজাকরা গরু চিহ্নিত করার জন্য পশুর হাটগুলোতে মোবাইল টিম (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনা করার জন্য সচেতন মহল থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলের গরু পালনকারীরা তাদের গরুগুলোকে মোটাতাজাকরণে স্টেরয়েড গ্রুপের ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করে আসছেন। এসব ভ্যাকসিন বা ঔষধে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহে (আড়াই-তিন মাস) গরু মোটাতাজা করা সম্ভব। তবে মেয়াদের মধ্যে মোটাতাজা করা গরু গুলো বিক্রি কিংবা জবাই করা না হলে পরবর্তী বছর সেটাকে পুনরায় মোটাতাজা করা সম্ভব হয়না। এমনকী যে-কোনো সময় সেটি মারাও যেতে পারে। এসব ঔষধের ব্যবহার নিয়ে পশু সম্পদ ও মানবদেহে ক্ষতির বিষয় জানা থাকলেও কম সময়ে দ্রুত বেশি মুনাফার লোভে তা করা হচ্ছে। ক্ষতিকর স্টেরয়েড ব্যবহারে পশু দ্রুত মোটাতাজা হলেও বিভিন্ন রোগব্যাধি তার মধ্যে জন্মায়। আর এসব গরুর মাংস খেলে মানবদেহে কিডনি, লিভার, ও হৃদপিন্ডসহ শরীরে নানাবিধ সমস্যা এবং ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন ভয়াবহতা জেনেও গরু মৌসুমি খামারি ও গৃহস্থরা এসব নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার করে আসছেন।

কিছু অসৎ কৃষক ও খামার মালিক গরুকে এই নিষিদ্ধ ঘোষিত স্টেরয়েড গ্রুপের ক্ষতিকারক ঔষুধ ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। এ নিষিদ্ধ ঘোষিত ওষুধ গরুকে খাওয়ানো বন্ধ না করলে জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। বিভিন্ন হাটবাজারের ওষুধের দোকানে ভারতীয় স্টেরয়েড পেরিঅ্যাকটিন, ডেক্সামেথাসনসহ দেশীয় ডেকাসন, এডাম-৩৩, বেটামেথাসন, ডেক্সানসহ অর্ধশতাধিক ব্রান্ডের এ ঔষুধ বিক্রি হচ্ছে।

বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার কথিপয় পশু চিকিৎসক, এক শ্রেণির অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের যোগসাজেসে গরু মোটাতাজাকরেণে চোরাই পথে আসা ভারতীয় এসব ভ্যাকসিন বা ওষুধ চুক্তির মাধ্যমে দিয়ে থাকে। গরু মোটাতাজা হওয়ার পরিমাণে অথবা বিক্রয় মূল্যের উপর নির্ধারণ করে এসব অসাধু চিকিৎসক ও ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের চুক্তি অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করা হয়। আবার এক শ্রেণির হাতুড়ে পশুচিকিৎসকরা সারা বছর প্রবাসী অধ্যুষিত বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরে না থাকলেও প্রতিবছর কুরবানির ঈদের তিন-চার পূর্বে এলাকায় এসে গ্রামে-গ্রামে গিয়ে নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রি করতে দেখা যায়। গ্রামের সহজ-সরল লোকজনও কোনো কিছু না বুঝে হাতুড়ে পশু চিকিৎসক ও অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের খপ্পড়ে পরে অধিক লাভের আশায় গরু মোটাতাজাকরণে নিষিদ্ধ ওষুধ খাওয়াচ্ছেন।

গৃহস্থদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, আগেকার দিনে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে গ্রাম্য পশুচিকিৎসকরা (বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী) সিলেট অঞ্চলে এসে গ্রামে-গ্রামে গৃহস্থদের বাড়ীতে-বাড়ীতে গিয়ে গবাদি পশুর চিকিৎসা দিতেন। এসব গ্রাম্য পশু চিকিৎসকদের সিলেটি ভাষায় ‘গোয়াল’ বা ‘গোয়ালা’ বলা হত। তাঁরা বছরে একবার আসতেন শুধুমাত্র শীত মৌসুমে। একজন চিকিৎসক একটি গৃহস্থ বাড়িতে যুগ যুগ চিকিৎসা দিতেন। গৃহস্থ বাড়িতে যারা নিয়মিত চিকিৎসা দিতেন তাদেরকে ‘বন্ধাজি’ বলা হত। অর্থাৎ, বন্ধাজিরা ঐ গৃহস্থবাড়ির পশুগুলোকে প্রতি বছরই চিকিৎসা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে সময়ে চিকিৎসা পদ্ধতিও ছিল ভিন্ন। চিকিৎসকরা শরিষার তৈল এবং লবন মিশিয়ে রোগাক্রান্ত পশুর মুখ পরিষ্কার করে দিতেন। পশুকে খাওয়ানোর জন্য দেয়া হত হাতে তৈরি গাছের লতা পাতা দিয়ে বানানো বড়ি বা ওষুধ। এরকম চিকিৎসা পদ্ধতিতে পশুগুলো অনেক মোটাতাজা হতো।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের সিনিয়র চিকিৎসক জানান, স্টেরয়েড গ্রুপের এ সকল ঔষুধ সেবনের কারণে পশু দ্রুত মোটাতাজা হলেও কম সময়ে রোগাক্রান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এর ফলে এসব ঔষুধ সেবনকারী পশুগুলোর কম সময়ে কিডনি, যকৃত, ফুসফুস, কলিজা ও মাংস নষ্ট হয়ে যায়। এসব পশুর মাংস মানুষের জন্যও নিরাপদ নয় এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বালাগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল আলম খান বলেন, আমাদের তালিকাভুক্ত পশুর খামারগুলোতে নিয়মিত নজরদারি রয়েছে। এছাড়া মেডিকেল টিম গঠনের মাধ্যমে পশুর হাটগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

ওসমানীনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শহিদুল ইসলাম বলেন, নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রি না করার জন্য ওসমানীনগরের ফার্মেসিগুলোতে প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এরপরও কেউ যদি নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রি বা ব্যবহার করে থাকে, তাহলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলার পশুর হাটগুলোতেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

 

(আজকের সিলেট/২৪ আগষ্ট/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন