১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাইল হাওরের বাইক্কা বিলটি মৎস্য অভয়াশ্রম হলেও এখানে এখন আর আগের মতো পাখি দেখা যায়না। প্রকৃতি হারাতে বসেছে তার নিজস্ব সৌন্দর্য। কাক ডাকা ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত, আবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা নামার আগ মুহ‚র্ত পর্যন্ত দেখা যেতো পাখিদের নানা খেলা নেলা। কিন্তু দিনদিন এখানে পাখিদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে।
এই বিলের মূল আকর্ষণ ছিল নানান ধরনের পাখি। সব জায়গায় শীতের শেষে পরিযায়ী পাখিরা বেশির ভাগ চলে গেলেও এখানে সারা বছরই পাখি দেখা যেত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কারণে অতিথি পাখির সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। আর এ বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে আসা পর্যটকরাও আগের মত পাখি দেখতে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেকটা হতাশা নিয়েই।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো বাইক্কাবিলে হাতে গোনাকিছু দেশীয় পরিচিত পাখি বসে রয়েছে। কিছু পাখি আকাশে উড়ে বেড়িচ্ছে। সন্ধ্যা হওয়ার পর পর বাইক্কা বিলের পাশের গাছগুলোয় অনেক পাখির দেখা মিলে।
তবে এর সবই দেশি পাখি। পর্যটকদের জন্য এখানে বানানো ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পর্যটকরা পাখি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বাইক্কা বিলের আশে পাশে ছবি তুলে ফিরে যাচ্ছেন। এখানে বেড়িতে আসা পর্যটক আয় কর বিভাগে কমর্রত ফাহমিদা আলী জানান, পরিবারের সবাইকে নিয়ে পাখি দেখতে বাইক্কা বিলে এসেছিলাম। এখানে আসার উদ্দেশ্যই পাখি দেখা। এসে দেখি শুধু পানি, কোনো পাখি নেই।
গত কয়েক বছর আগেও এখানে এসে অনেক পাখি দেখেছিলাম। কিন্তু তিন বছর পরে এবার এসে এখানে দেখলাম পাখির সংখ্যা একবারেই কম। পাখি দেখতে না পেরে বাচ্চারা অনেকটাই হতাশ হয়েছে।
বাইক্কা বিলে ছবি তুলতে আসাওয়ার্ল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার রঞ্জিত জনি জানান, পাখির ছবি তুলার জন্য বাইক্কা বিল একটি ভালো জায়গা। এখানে প্রচুর পাখি পাওয়া যায়। রঙ-বে রঙের পাখির ছবি তুলতে সারাদেশ থেকেই এখানে ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলতে আসে। কিন্তু পরিতাপে রবিষয়, দিন দিন এই জায়গায় যেভাবে পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে এতে করে পর্যটকরাও এখানে আসা কমিয়ে দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট মহল এর কারণ খুঁজে বের করে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি মনে করেন তারা।
বাইক্কা বিলে পাখি কমে যাওয়ার নানা সমস্যা তুলে ধরে শ্রীমঙ্গলস্থ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক সজল দেব জানান, হাওরের পানিতে শিকারিরা জাল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় । হাওরে বাঁধ দিয়ে মেশিন লাগিয়ে পানি সেচা হয়। কারেন্ট জাল বিছিয়ে রাখা হয় পাখিদের ধরার জন্য। জালে একটি পাখি আটকা পড়লে অন্য পাখিরা ভয়ে এই স্থান গুলো ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাছাড়া বাইক্কা বিলে নৌকা নিয়ে প্রায়ই চলাচল করতে দেখা যায়। যা পাখির জন্য খুবই ভয়ানক বিষয়।
বিলের সৌন্দর্য পাখি ও প্রাণিসম্পদ রক্ষা করার স্বার্থে এখানে স্থায়ী ভাবে পুলিশ পোস্ট বসানো যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সেইভ আওয়ার আনপ্রটেক্ট লাইফ (সউল)-এর নির্বাহী পরিচালক জানান, বাইক্কা বিলে আসা পরিযায়ী পাখিরা একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বাইক্কা বিলকে বেছে নেয়। বাইক্কা বিল অভায়শ্রমের কচুরি পানা, নলখা গড়া ইত্যাদি হচ্ছে পাখিদের খাবার ও আশ্রয়স্থল। কিন্তু বছর কয়েকরধরে দেখা যাচ্ছে কিছুদিন পর পর বিল পরিষ্কারের নামে এগুলোকে অপসারণ করা হয়। খাদ্য ও বাসস্থানের সংকটের কারণেই ম‚লত পাখিরা এখানে আসা কমিয়ে দিয়েছে। বাইক্কা বিলের দুইপাশে যেভাবে ফিশারি ও ঘরবাড়ি নির্মাণ হচ্ছে এতে করে পাখিরা ভীত হচ্ছে। এ কারণে দিন দিন এখানে পাখির আনা গোনা কমে যাচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, বাইক্কা বিলে শীত কালে এখানে যে অতিথি পাখি আসে তাদের অভয়াশ্রমে যাতে কোন কারণে পাখিদের ম‚ল অভায়শ্রম রক্ষার জন্য আমরা প্রযোজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। এখানে যে প্রতিবন্ধকতা আছে সেগুলো অপসারণে আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।