১৭ জানুয়ারি ২০১৯

শাবি প্রতিনিধি : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি (জিইবি) বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান প্রতীকের আত্মহত্যার ঘটনায় তার পরিবারকে দুষলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। প্রতীকের মৃত্যুর জন্য বিভাগের শিক্ষকদের দায়ী করে প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় বোন শান্তা তাওহিদা পোস্ট দেওয়ায় ও টেলিভিশনে বক্তব্য দেওয়ায় সমালোচনা করেছেন ভিসি।
বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মেন্টাল ডিসঅর্ডার একটি রোগ। এই রোগের চিকিৎসা করতে হবে। সবচেয়ে বড় সাপোর্ট আসতে হবে পরিবার থেকে। আমাদের তো অবশ্যই দায়-দায়িত্ব আছে, আমরা দেখবো। তার পরিবার থেকে কোন উদ্যোগ নেয়নি। এই শিক্ষার্থীর ফেসবুকের পোস্ট দেখেছি, সে গত দুই বছর ধরে মেন্টাল ডিসঅর্ডারে ভুগতেছিল। সে দুইজন সাইকোলজির ডাক্তার দেখিয়েছে এবং সে ঔষধ নিচ্ছে। প্রতিরাতে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমাতে হচ্ছে তার। তার পড়াশোনার দিকে মন নাই। মায়ের সাপোর্ট সে পায়, বাবা খুব শক্ত উনি কোন সাপোর্ট দিচ্ছেন না এসব লেখিছে সে।’
এসময় ভিসি আরো বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তান, শিক্ষকরা কোনো দিনই চাইবে না একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করুক, জীবন ধ্বংস হয়ে যাক। আমরা শিক্ষক সবাই কমিটেড, আমরা ছাত্রদেরকে মানুষ করবো, তাদের যেকোন সমস্যায় আমরা পাশে দাঁড়াবো। কিন্তু ঢালাওভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে টেলিভিশনে ও সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেওয়া ঠিক না। আমাদের কোনো সমস্যা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু ঢালাওভাবে দোষারোপ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবর্মূতি নষ্ট হচ্ছে। শাবিপ্রবি পুরো বাংলাদেশের মধ্যে যেখানে স্বমহিমায় উজ্জ্বল বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র হনন করায় নিন্দা করি ও ঘৃণা জানাই।
তিনি আরো বলেন, ছয় মাস যাবৎ সে নিরবে নিবৃতে একাকি থাকতো। মারা যাওয়ার পর আমরা সবাই হাসপাতালে ছিলাম। একজন ছাড়া তার কোনো বন্ধু বান্ধব দেখতে যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে তাকে সাপোর্ট দেওয়া হয়নি বরং সে কেন থিসিস পায়নি এ নিয়ে অভিযোগ করেছে। যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে সেই শিক্ষক তার গবেষণার জন্য বিশ্বে সমাদৃত। এছাড়া প্রতীক শিক্ষক হতে চেয়েছিল কিন্তু আমরা অনার্স পাস কাউকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করতে পারি না। তার তো অন্যান্য ডিগ্রিগুলো লাগবে।
বিভিন্ন ধরনের অবান্তর, ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে প্রতীকের বড় বোন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার বিভাগের শিক্ষক শান্তা তাওহিদা প্রতীক মারা যাওয়ার পরপরই এ নিয়ে বিভাগের শিক্ষকদের দোষারোপ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন। এই পোস্টগুলোতে তিনি অনার্সে ১ম শ্রেণীতে ১ম হওয়া স্বত্বেও প্রতীককে মাস্টার্সে সুপারভাইজার না দেয়া এবং বিভিন্ন কোর্সে কম নাম্বার দেয়ার অভিযোগ করেন এবং এর কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা প্ররোচিত হয়েছে বলে পরিবার দাবি করছে।
তাঁর বোন শান্তা তাওহিদা এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের জিইবি বিভাগে অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে শিক্ষকদের চক্রান্তের শিকার। তাইফুর রহমান প্রতীক-নামটি আমাদের পরিবারে এখন শুধুই স্মৃতি। একজন হতভাগা বোন চোখের জলে ভেসে আজ আপনাদের কাছে তার ভাইয়ের আত্মহত্যার দিকে যারা ঠেলে দিয়েছে তার বিচার চাই। কারণ আমি চাই না আমার মত কেউ ভাই হারাক…।’ এছাড়া, জিইবি ডিপার্টমেন্ট আমার ভাইয়ের সাথে একাডেমিক যে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে প্রশাসন তার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিক এটি আমাদের পরিবারের দাবি। আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে অনুরোধ যেন আমার ভাই তার যথাযথ বিচার পায়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সূত্রে জানা যায়, অনার্সে ১ম হওয়া ঐ শিক্ষার্থী মাস্টার্সে যৌথভাবে ৭ম স্থান অধিকার করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিজিপিএ ৪ স্কেলের মধ্যে অনার্সে তিনি ৩.৮২ পান। আর মাস্টার্স ১ম সেমিস্টারে তার রেজাল্ট ৩.৫৮ ও ২য় সেমিস্টারে তার রেজাল্ট হয় ৩.০৮ এবং তার মাস্টার্সের সম্মিলিত রেজাল্ট দাঁড়ায় ৩.৩৩।
এদিকে প্রতীকের মৃত্যুর ঘটনায় শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার এন্ড মিনারেল সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দীনকে প্রধান করে এই কমিটি করা হয়।
কমিটির অন্য দুইজন সদস্য হলেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো আনোয়ারুল ইসলাম ও সহকারী প্রক্টর মো. সামিউল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার বিকেলে নগরীর কাজলশাহ এলাকার একটি বাসা থেকে পুলিশ প্রতীকের লাশ উদ্ধার করে। এদিকে এই ঘটনায় প্রতীকের বাবা তাওহিদুজ জামান সিলেটের কোতোয়ালি থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন বলে জানান যায়।