১৭ অক্টোবর ২০১৮
মো. হাবীবুর রহমান সাদী : অনুষ্টিত হয়ে গেলো খানা তথ্যভান্ডার শুমারী। রাজশাহী,খুলনা এবং সিলেট বিভাগের সকল জেলায় ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত খানা তথ্যভান্ডার শুমারি পরিচালিত হয়। একযোগে পরিচালিত হওয়া এই শুমারীর একজন গণনাকারী হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে, দারুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আজ বইগুলো জমা দিয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। কৃতজ্ঞতা তাঁদের প্রতি যাঁরা আমাকে মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে মেশার দারুণ এই সুযোগটি তৈরি করে দিলেন। বাড়ী থেকে বাড়ী,মানুষ থেকে মানুষ সবার আলাদা আলাদা বায়োডাটা তৈরিতে সত্যি দারুণ এক অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়েছে।
বিকেল তখন পাঁচটা, একমনে উনাদের ঘরের সবার তালিকা করছি আর একের পর এক প্রশ্ন করছি। গৃহপ্রধান দাদী বললেন থাম,চা খেয়ে নে আগে। ক্লান্তি দুরীকরণে সেইসময় এরচেয়ে উপকারী কিছু মনে হয়নি। একটা জরুরী কলে, চায়ের কাপে যে ড্রাই কেক ভিজিয়েছিলাম তা আর মনেই নেই ।কেক তখন আমার চা খেয়ে কাপের তলায় লুকিয়ে পড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী দাদী বললেন চায়ের কাপে যে কেক ভিজানো হয়েছে এই কথাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য অন্তত একজন মানুষ দরকার। মুচকি হেসে বললাম সে গুরুভার না হয় দাদী আপনাদেরই দিলাম। এভাবেই চলতো দিনের কর্মসূচী। বেশ উপভোগ করেছিলাম দিনগুলিকে।
প্রত্যেক মানুষের নির্ভুল তথ্য লিপিবদ্ধ করতে আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র ঘাটতি শুধু আমারই নয় এলাকার গনণাকারীগণ এবং সুপারভাইজারের কোন অংশেই কমতি ছিলনা। জোনাল অফিসারের সার্বক্ষণিক তদারকি বাড়িয়েছিলো কাজের গতি। প্রতিদিন এতো মানুষকে কীভাবে ঠান্ডা মাথায় পরিচালনা করতে হয় তা ওমর ফারুক স্যারকে গভীরভাবে অনুধাবন করে শিখেছি।
সবচেয়ে বড়ো যে জিনিসটি প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয়েছে, শুমারীর সুবাদে নিজের এলাকার এক তৃতীয়াংশ বাসিন্দাদের প্রত্যেকটি ঘর,প্রত্যেকটি মানুষের সাথে নতুন করে আবার দেখা এবং কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো। ১ দিন আগে জন্ম নেওয়া নবজাতকটির মিষ্টি হাসিটাও মিস পড়েনি কাজটির সুবাদে,দেখা হয়েছিলো কথা হয়েছিলো বয়োবৃদ্ধদের সাথে বয়সের ভারে যারা কিনা আজ বিছানাবন্দী।
শুমারীর প্রত্যেকটি দিনগুলো বাবাকে নতুন করে আবার মনে করিয়ে দিতো আমাকে, যখন মানুষ বলতেন একদম বাবার মতো চেহারা,আর কথা বলার ধরণ ঠিক একই। এমন অনেককেই যাদেরকে আমিও চিনিনা,উনারাও আমাকে ঠিক চিনতে পারতেন না (বিশেষ করে মহিলাগণ) শুধু আমার চেহারা দেখেই বলে দিতেন আমি কার ছেলে। আশ্চর্যই হতাম না হতবাক হয়ে যেতাম। বাবার প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস আর শ্রদ্ধাবোধ জানা হতো গল্পে গল্পে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন কতো প্রবীণ চাচা-চাচী,বিশ্বাস করুন আমার মনে হয়েছিলো আমার জীবনে কোন পরিচয়পত্রের দরকার হবেনা, যে ছেলের মুখ দেখে সেই ছেলের ডিটেইলস এলাকার মানুষ এতো সুন্দর করে বলে দিতে পারেন সেই ছেলের আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়নি। মনে হচ্ছিল আমার মাঝেই আমার বাবার পরিচয় আর বাবার মাঝেই আমার পরিচয় নিহিত।
অন্য গণনাকারীরা যখন প্রতিদিন ২০ ঘর থেকে ২২ ঘর লিখে ইতি টানতো সেখানে আমার ১০-১২ ঘর হতো শুধুমাত্র মানুষের ভালোবাসাগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য। তারপরেও আলহামদুলিল্লাহ ২০ দিনের মধ্যে ১২ দিনেই আমার কাজ সম্পুর্ণ করতে পেরেছি খুব তৃপ্তিসহকারেই।
আর আপ্যায়ন পর্বটিও ছিলো আমার প্রতিদিনকার কাজের রুটিনের একটি অংশ। কেউ একজন যখন পান সুপারী হাতে তুলে দিতেন আমি সাথে সাথে পানটা মুখে পুরে দিতাম অথচ আমি পান একদম খাইনা। সেটাকে আমি পান নয় মানুষের ভালোবাসা আর দোয়া হিসেবেই আন্তরিকভাবেই নিতাম।
সবমিলিয়ে দিনগুলো বেশ মজার ছিলো,যারা আমাকে ভালোবেসে আমাকে দোয়া দিয়ে সর্বপ্রকার সহযোগিতা করেছেন সবার প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মোবারকবাদ রেখে ইতি টানছি,আল্লাহ হাফেজ।
(লেখক : গণনাকারী, খানা তথ্যভান্ডার শুমারি।)