১৭ অক্টোবর ২০১৮
ডেস্ক রিপোর্ট : জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্বোচ্চার হয়ে উঠেছেন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতারা। প্রায় প্রতিদিনই তাদের মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে নতুন নতুন অভিযোগ অনুযোগ। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। যে কারনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে স্পর্শকাতর সময়ে এসব অভিযোগ অনুযোগ যেন তীরের মত বিদ্ধ হচ্ছে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর বুকে। বিশেষ করে ড. জাফর ইকবালকে নিয়ে মন্তব্য ও রাজাকার পরিবারের সদস্য বলে চর্তুদিকে উঠা অভিযোগ তাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। তাছাড়াও অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগেরও কমতি নেই তার বিরুদ্ধে।
উন্নয়ন বঞ্চনা, ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন, তার পক্ষে না থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নানাভাবে নির্যাতন, জামাত কানেকশনসহ বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস। আর সবচেয়ে বড় ইস্যু মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানীদের পক্ষে তার পিতার অবস্থান। এসব কারণে তৃণমূলের ক্ষোভের মুখে আছেন সিলেট-৩ আসনের আওয়ামী লীগের এ সাংসদ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন এ আসনে নৌকা প্রতিকের মনোনয়ন প্রত্যাশিরা। তাদের সঙ্গি হয়েছেন সাংসদের বঞ্চনার শিকার হওয়া তৃণমূল আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ। এ কারণে ঘরে-বাইরে রোষানলে পড়ছেন ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ কয়েস।
২০০৮ সালে প্রায় ৯৮ হাজার ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৩ সালে বিনা ভোটে সংসদ সদস্য হয়ে যান। এই সময়ের মধ্যে সিলেট-৩ আসনে জনপ্রিয়তা অর্জন করার পরিবর্তে বদনাম কুড়িয়েছেন বেশি। ব্যক্তি মাহমুদ উস সামাদ শাহজালাল সার কারখানার কাজে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে মি. টেন পর্সেন্ট নামে পরিচিত পান বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। এসব অভিযোগের বাইরে ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে সুবিধাভোগীদের কাছে টানার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে প্রবল হয়ে ওঠেছে। এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজ না করিয়ে জনতার আস্থার জায়গা হারিয়েছেন এমপি সামাদ। আরো আলোচনায় আসেন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লেখক ড. জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে মিছিল করিয়ে এবং তাকে চাবুক দিয়ে পেঠানোর মন্তব্য করে। আর উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর সঙ্গ না দিয়ে জামাত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার গুরুতর অভিযোগের তকমা লাগিয়েছেন নেতাকর্মীরা।
একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় তার বিরুদ্ধে স্বোচ্ছার হয়ে ওঠেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে একাট্রা হয়েছেন নেতাকর্মী সমর্থকরা। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড রোববার সংবাদ সম্মেলন করে যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় রাজাকার হিসেবে তার পিতা দেলোয়ার হোসেনের নাম এনেছেন। রাজাকার সন্তান হিসেবে তাকে মনোনয়ন না দেওয়ার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। সোমবারও একই দাবিতে সংসাদ সম্মেলন করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু জাহিদ।
এব্যাপারে এ আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশি আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বলেন, মাহমুদ উস সামাদের বিরুদ্ধে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিক্ষোব্ধ। যে কারণে সভা, সমাবেশ, টেবিল টক এমনকি সংবাদ সম্মেলন করেও ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন শুধু তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে। জাফর ইকবাল মুক্তিযোদ্ধের স্বপক্ষের জনপ্রিয় একজন লেখক। স্বাধীনতার পরবর্তী সমযে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোনো এমপি এমন বক্তব্য দেননি।
অথচ মাহমুদ উস সামাদ তাঁকে চাবুক দিয়ে পেঠানোর কথা বলে দৃষ্টতা দেখিয়েছেন, মিছিল করিয়েছেন। দেশ যখন উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে, তখন তিনি এলাকায় উন্নয়ন না করিয়ে মানুষকে ভোগান্তিতে রেখেছেন। ফলে এলাকায় জনস্রোতি রয়েছে, বিনা ভোটে এমপি হওয়ায় জনগণের মূল্যায়ন তার কাছে নেই। তাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তিনি।
সিলেট-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ মনির হোসাইন বলেন, ভাল কাজ করলে মানুষ ভাল বলবে। হয়তো কিছু লোক সমালোচনা করবে। আর যদি ব্যাপক আকারে অভিযোগ ওঠে তাহলে এটা গুরুতর। এমপি সামাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু জাহিদ, আওয়ামী লীগ নেতা রইছ আলী ও ইউপি চেয়ারম্যান সাইস্তা মিয়াসহ সব নেতারা একাট্টা হয়ে অভিযোগ করছেন। এটা তাকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে অবশ্যই চিন্তা করা দরকার। তৃণমূল অভিযোগ করলে নিজের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, রাস্তাঘাট নিয়ে সারা দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। অথচ সিলেট-৩ আসনের এলাকাগুলোতে সেভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। রাস্তাঘাট ভাঙা। নেত্রীও এগুলো নিয়ে ভাববেন আশাবাদি তিনি। জনতার সুচিন্তার প্রতিফলন ঘটবে, মানুষ যাতে ভাল একজন লোক পায়। যে জনগণকে ভালবাসবে। এলাকার উন্নয়ন আন্তরিকভাবে করবে। শুধু বাংলাদেশের মানুষ না সারা বিশ্বের মানুষ শেখ হাসিনার প্রসংসা করছে। অথচ এর বিপরীত স্রোতে মাহমুদ উস সামাদ।
তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ সুরমা আমার বাড়ি, জন্ম এখানে। দেশের বাইরে লেখাপড়া করেছি। মদন মোহন কলেজের ভিসি ছিলাম এককালে। নিজেকে প্রস্তুত করেছি সেভাবে। এটা করার কার আমার স্বপ্ন সিলেট-৩ আসনের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাড়ানো। সচেতন মানুষ হিসেবে দেশরত্ম শেখ হাসিনার উন্নয়নের সারথি হতে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন মানুষের কল্যাণে। মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, সরকার এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজাকারের সন্তানদের কোনো ধরণের রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া হবে না। তাই এ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করার দরকার আছে বলে মনে করি না।
অভিযোগ প্রসঙ্গে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী বলেন, এই বিরোধিতাকারীরা ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমাকে ভোট দেয়নি। আগামীতেও ভোট দেবে না। তাদের আমার সঙ্গে দেখলে প্রকৃত নৌকা প্রেমী ভোটাররা আমার সঙ্গ ত্যাগ করবেন। আওয়ামী লীগ আমাকে মনোনয়ন দিলে এদের সমর্থন ও ভোট আমার কাম্য নয়। প্রতিবার নির্বাচনের আগে এসব মানুষ টাকা খাওয়ার জন্যে এমন অভিনয় করেন।
তিনি বলেন, আমার বাবা দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধের সংগঠক। অনেক মুক্তিযোদ্ধাও বাবার পরামর্শে যুদ্ধে গেছেন। স্বাধীনতার পর সিলেট-৩ আসনে তার চেয়ে বেশি উন্নয়ন কেউ করেনি বলেও দাবি করেন তিনি।