৯ অক্টোবর ২০১৮


আদী পেশা আইনজীবী রনজিৎ

শেয়ার করুন

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : শহরের মাছুলিয়া এলাকার বাসিন্দা রনজিৎ পাল পেশায় একজন আইনজীবী। তিনি ঢাকা বারে প্রাকটিস করেন। বাপ-দাদার আমল থেকে তার পরিবারের সদস্যরা মৃত শিল্পের সাথে জড়িত। এ হিসেবে তিনি ছোট বেলা থেকেই মৃত শিল্পের সাথে জড়িয়ে পড়েন। পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যান। ২০০৭ সালে তিনি এলএলবি সম্পন্ন করে আইন পেশার সাথে জড়িত হন। পাশাপাশি মৃত শিল্পের মাটির জিনিসপত্র তৈরির কাজ করেন। ভাস্কর্য ও স্ট্যাচু নির্মাণ কাজও করে তিনি। মৃত শিল্পের কাজ করে তিনি সফলতা পেয়েছেন ব্যাপক। সেক্ষেত্রে শুক্রবার ও শনিবারকে তিনি এ পেশার কাজের দিন হিসেবে বেঁচে নিয়েছেন।

প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে বাড়িতে এসে শুক্রবার ও শনিবার প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শারদীয় দুর্গোৎসবে প্রতিমার চাহিদা বেশি থাকায় তিনি প্রতিমা নির্মাণকাজে বেশি সময় ব্যয় করেন।

অ্যাডভোকেট রনজিৎ পাল জানান, আমার দাদা মৃত শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। দাদার পর বাবা, কাকাসহ পরিবারের অন্যান্য লোকজন এ পেশায় জড়িত হন। পারিবারিকভাবে আমি ছোট বেলায়ই এ পেশার সাথে জড়িত হয়ে পড়ি। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যেতে থাকি। মৃত শিল্পে আমি যেমন সফলতা পেয়েছি, তেমনি লেখাপড়ায়ও সফলতা পেয়েছি। তিনি বলেন, আমার লক্ষ ছিল আইনজীবী হবো সেটা হয়েছি। প্রতি বছর দুর্গোৎসবে হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরী বাজার পূজা মন্ডপসহ বড় বড় পূজা মন্ডপে প্রতিমা তৈরি করে থাকেন তিনি। প্রত্যেকটি প্রতিমার নির্মাণ মজুরি ২০/২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু ৫০/৬০ হাজার টাকাও নেন তিনি।

এ বছর দুর্গোৎসব শুরু হওয়ার ২/৩ মাস আগে থেকেই তিনি প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। তার প্রতিমাগুলো দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হওয়ায় চাহিদা থাকে বেশি। পুজোর সময় তিনি সারাদিন মূর্তি তৈরির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাকে সহযোগিতা করার জন্য এ সময় ৪/৫ জন দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক রাখা হয়।

অ্যাডভোকেট রনজিৎ পাল বলেন, প্রতিমা নির্মাণ কাজে তাকে তার স্ত্রীও সহযোগিতা করেন। তার স্ত্রী শিক্ষিত। প্রতিমা তৈরিতে মাটি, বন, কাঠসহ ক্যামিকেল জাতীয় পণ্য ব্যবহার করা হয়।

রনজিৎ পাল বলেন, কোন পেশাকেই ছোট হিসেবে দেখা সঠিক নয়। আইনজীবী হয়ে বাপ-দাদার সেই পেশাকে আত্মমর্যাদার পেশা হিসেবে দেখছেন তিনি।

তিনি জানান, বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃত শিল্প বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায়। এখন আর পাল বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁচা মাটির সুধা গন্ধ পাওয়া যায়না। প্লাস্টিকের তৈরী আসবাবপত্রের কারণে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাংলার পুরোনো এই শিল্প।

বেকার হয়ে পড়ছে প্রায় সকল মৃতশিল্পী কারিগর। মাটির আসবাব পত্রের চাহিদা না থাকা ও কুমার মাটি সংকটের কারণেই বর্তমানে মাথা তুলতে পারছে না এই শিল্প। মাটি দিয়ে তৈরি নানা জিনিস পত্রের মধ্যে হাড়ি, কড়াই, কলস, ভাঁড়, টালি, খেলনা, পুতুল, ফুলদানি, ছাঁইদানি ইত্যাদি বাংলার পুরোনো ঐতিহ্য বহন করে। পাল বা কুমাররা মাটি দিয়ে শৈল্পিক হাতে তৈরী করেন বিভিন্ন রকম মাটির হাড়ি-পাতিল, মাছ ধোয়া ঢোলা, কলস, পনুয়া, কসুরী, ছোট বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রকার খেলনা যেমন- পুতুল, নৌকা, বালতি, গামলা, জগ, কাড়াই, চুলা, টাকা জমানোর ব্যাংক ইত্যাদি। এগুলো বাড়িতে বাড়িতে ফেরি করে ও বিভিন্ন হাটে নিয়ে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত কুমাররা। এখন তা আর তেমন একটা চোখে পড়ে না।

পালদের পূর্ব পুরুষরাও এ শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। কিন্তু এ পেশা দিয়ে এখন আর সংসার চালানো যায় না বলে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। তাদের তৈরি এ সব জিনিস এখন আর তেমন একটা ব্যাবহার করা হয় না। হিন্দুদের পূজা কিংবা বিয়েতে এখনো মাটির তৈরী কলস, বাটি ইত্যাদির ব্যবহার হলেও সেটা অতি নগণ্য। বর্তমানে পহেলা বৈশাখসহ গ্রামীণ মেলায় মাটির তৈরি বিভিন্ন খেলনা পুতুলসহ কিছু জিনিস বিক্রি হয়। অনেকেই মাঝে মাঝে শখের বসে যৎসামান্য জিনিস ক্রয় করে থাকে। এক সময় এসব আসবাবপত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কদর ও চাহিদা ছিল। মাটির তৈরী গাছ রোপণের টবের বেশ চাহিদা থাকলেও এখন অনেকটাই কমে গেছে। যা দেশের নার্সারীসহ বিভিন্ন বাড়ির শোভা বর্ধনের কাজে ব্যবহৃত হত।

প্রতিটি টব তখন ১০-১৫ টাকায় বিক্রয় করা হলেও বর্তমানে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প মূল্যে তা বিক্রি করতে পারছে না তারা। এছাড়া এখন প্লাস্টিক সহ বিভিন্ন আয়রন জাতীয় জিনিসের তৈরি টব পাওয়া যায় বলে এখন মাটির তৈরী টবের চাহিদা কমে গেছে। এখন এ স্থান দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানীর প্লাস্টিকের পাত্র। মাটির তৈরি থালা আকৃতির বাসন যা আগে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এর মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এখন আর তা ব্যবহার হচ্ছে না। এসব কারণে প্রায় সার বছরই কুমারদেরকে বসে থাকতে হয়। বাজারে প্লাস্টিকের তৈরী পণ্যের কারণেই মূলত এই শিল্প বিলুপ্তির পথে। যদি সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয় তাহলে হয়তো আবার এ শিল্পে প্রাণ ফিরে আসবে। তা না হলো এই শিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো যাবে না।

শেয়ার করুন