৩০ আগস্ট ২০১৮
এনামুল হক : একটি মেয়ে, একটি বোন, একজন নারী, একজন গৃহবধু, একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন শ্বাশুড়ি, জগতের চিরায়ত সিড়িতে নারীদের আমরা এরকম সম্পর্কে সম্বোধন করে থাকি। মূলত পারিবারিক সম্পর্কের আদলে শব্দ গুলো স্থান কাল পাত্র ব্যক্তি ভেদে ব্যবহৃত হয়।
সমাজের প্রচলিত একটা কথা রয়েছে যে, সংসারের মেয়েদের জন্য বাবা মার আদর সোহাগ সব সময় বেশি থাকে আবার বাবার জন্য মেয়েদের আদর ভালবাসা বেশি হয়। কারন সব বাবা মা ই জানেন একদিন তাদের আদরের সোহাগীনি এই ঘর ছেড়ে অন্যের ঘরে চলে যেতে হবে যে অনুভূতিটি একটি মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে তার ভিতরেও জন্ম নেয়।
বাস্তবতার নিরিখে সুস্থ মানসিকতা ও মানবিকতা নিয়ে সমাজের দিকে তাকালে এই মেয়েগুলোর কান্না আমাদেরও আবেগ তাড়িত করে । কারন আমরা সবাই কারোনা কারো ভাই কারো স্বামী কারো সন্তান ।
ধরুন- আপনি বিয়ে করে প্রিয়তমাকে নিয়ে নিজের স্বপ্ন গুলো মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজাচ্ছেন । ঠিক তখন এই মেয়েটির ভাই নিরবে তার বোনের জন্য চোখের পানি মুচছে। আবার অন্য কেউ যখন আপনার বোনকে নিয়ে স্বপ্ন সাজাতে ব্যস্ত রয়েছে তখন এই আপনিই আপনার বোনের জন্য নিরব জল মুছচেন। সেই অনুভূতি কি আমাদের ভিতরে এসেছে কখনো ? হয়তোবা হ্যাঁ অথবা না ।
নিজেকে দিয়েই উদাহরণ টানুন না। আমি যখন ২০১৫ সালের ২২ জুলাই বিয়ে করে জীবন সঙ্গীনিকে নিয়ে আসলাম সেদিন সেই মুহূর্তে তার ভাইদের অশ্রুসিক্ত চোখ আমার অনুভূতি তৈরি করে দিয়েছিল । কিন্তু সেই অনুভূতি নিমিষেই হারিয়ে গিয়েছিল কারন আমি তখন সারা জীবনের সাজানো স্বপ্ন নিয়ে বিভোর । কিন্তু ঐ সময় ঐ ভাই গুলি নিরবেই তাদের কলিজার টুকরা বোনের জন্য নিরবে চোখের জল মুছেননি ?
যে ঘরে জন্ম নিয়ে, বাবা মা ভাই বোনের আদর যত্ন ভালবাসায় বড় হয়ে চিরদিনের জন্য অন্যের ঘরে চলে আসার মুহূর্তটা বা এর পরবর্তী সময়ের কান্নাটি কি আমাদের হৃদয়ে কখনো নাড়া দিয়েছে ? মায়ের পাশে ছাড়া যে মেয়েটি ২২/২৩ বছর ঘুমাতেও পারেনি সেই মেয়েটি শুধু মায়ের পাশই নয় তার বাড়ি থেকে সারা জীবনেরজ জন্য চলে এসেছে আমার আপনার পাশে ! সেই অনুভূতি কি আমাদের ভিতরে কখনো কাজ করেছে ?
আমি এমনও দেখেছি – রাতে আমি যখন ঘুমে আমার জীবন সঙ্গীনি খাটের কোনে বসে মাকে ফোন করে অবুঝ শিশু যেমন মায়ের দুধ খেতে কান্না করে ঠিক তেমনি কান্না করতে। কিন্তু অনেক সময় আমি শুনেও না শুনার ভান করেছি । কখনো বিনয়ের সাথে কারন জিজ্ঞাসা করলে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত কন্ঠে তার আবেগ মাখা জবাব – “আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে, আম্মা আমাকে ছাড়া কেমনে থাকবেন, আমি ছাড়া দাদার নখ কে কেটে দিবে” ? আমরা পুরুষ – মেয়েদের অনুভূতি গুলো কি আমাদের কখনো ছুঁয়ে যায় ?
আমার জীবনে সবচেয়ে বড় অনুভূতি হয় ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর । আমার একমাত্র ছোট বোনটিকে বিয়ে দিয়ে । যখন বোনটিকে ঘর থেকে বিদায় জানাই তখন আমার কাঁধে ভর করে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে কিন্তু আমি নিজেকে কন্ট্রোল করে তাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করি। “বেয়াক্কল এভাবে কাঁদে না, আমরা কি মরে গেছি, এরকম নানা শান্তনার বাণী শুনিয়ে সেন্টারে পাঠিয়ে দেই” । কিন্তু ঘরে ফিরে আমি হাউমাউ করে চিৎকার করে কেঁদে উঠি । যখন সেন্টার থেকে বোনটিকে বরের গাড়িতে তুলে দেই তখন তার বরের হাত ধরে আব্বা একটি কথাই বলেছিলেন -“বাবারে আমার কলিজার ধন মেয়েটিকে কখনো কষ্ট দিওনা, যদি কোন অন্যায় করে আমাকে জানাইও” । কথাটা বলেই আব্বা হু হু করে কেঁদে উঠেছিলেন । সে সময় আব্বার চোখের পানি আমাদেরও ছুঁয়ে যায় ।
গাড়িটি যখন সামনে এগিয়ে চলেছে তখন গাড়ির পানে চেয়ে নিরবেই চোখের পানি গাল গড়িয়ে পাঞ্জাবি ভিজেছে। হঠাত্ একবন্ধু পিঠে হাত রেখে বলল তুই এমন করলে হবে কি করে । তুই তো সবার বড় ।
কিন্তু কি করে বুঝাই- আমার একমাত্র বোন। যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছি। যখন আমি মাত্র ৫ হাজার টাকা ইনকাম করতাম তখন আট হাজার টাকা দামের লেহেঙ্গা পরিয়েছি। এরপর অন্তত তিন মাস ঠিক মতো ঘুমাতেও পারিনি। বাসায় গেলেই মনে হতো ঘরে কি যেন নেই শুধু খালি খালি লাগে !
কিছুদিন আগে প্রতিথযশা একজন সাংবাদিক এর একটি ফেসবুক পোষ্ট্ পড়ে আরেকটি নতুন অনুভূতি জন্ম হয়ে গেলো আমার।
তিনি লিখলেন – তার ক্লাস নাইন পড়োয়া মেয়েটি দিন দিন বেড়ে উঠছে, বাড়ন্ত শরীর । দেখতে দেখতে বিয়ে শাদী দেওয়ার সময় চলে আসবে । আদরের মেয়েটি ছাড়া তিনি কি থাকতে পারবেন ? আর মেয়েটিই বা কিভাবে থাকবে। খেলা ফুর্তি আর আনন্দের ছলে কথা গুলি বললেও কিশোরী মেয়েটি তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে । গলার নিচে মাথা রেখে বলে বাবা আমি ক্ক্কনো বিয়ে করবনা। তুমি ছাড়া আমি এক মুহূর্ত ও থাকতে পারবনা। তখন তিনি মেয়েটির পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে ঠিক আছেরে মা বলে হাসি মুখে শান্তনা দিয়েছিলেন । কিন্তু সেই হাসিটি কি আসল হাসি ? না না আসল হাসি নয়। কারন তিনি বাবা।
হয়তো অনেকের কাছেই আমার এই লেখাটি পড়ে অনেকের কাছে ভিন্ন অনুভূতি জন্ম নিতে পারে। তবে এই সংক্ষিপ্ত অনুভূতি লিখতে গিয়ে আমাকে কয়েকবার রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে হয়েছে । কারন আমিও যে এখন একজন বাবা। আমার মেয়েটির বয়স মাত্র ১৮ মাস। আমি যদি আজকের চোখকে ১৮/২০ বছর পরের চোখে দেখি তখন সেই বিশ বছর পরের অনুভূতি টা আমাকে আজও নাড়া দিতে পারে। কারন আমি যে বাবা । বাবা না হলে সন্তানের সেই ভালবাসা অনুভব করা যায় না। আমার নানা আমার আম্মাকে বলেছিলেন – মেয়েরা বাবার ঘর থেকে বের হয় লাল শাড়ি পরে আর স্বামীর ঘর থেকে বের হয় সাদা শাড়ি (কাফন) পড়ে। গতদিন নিকটাত্মীয়ের বিয়েতে গিয়ে সেই অনুভূতি আবার জাগ্রত হলো ।
একটি মেয়ে জন্মের পর থেকে কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে শুধু কান্নাই যেন তার সম্বল। তবে এই কান্নার মাঝেও হাসি খুশি আনন্দ সুন্দর জীবন দিয়ে জীবনটাকে আনন্দময় করে তুলতে সহযোগিতা করতে পারি আমরা পুরুষরা।
মেয়ে বা নারীদের মাংশ পেশিকে শুধু উপভোগ্য নয় তাদের আমরা মানুষ হিসেবে ভাবি। প্রতিটি মেয়ের নিরব কান্না যেন আমাদের পথ চলাকে দৃড় মনোবল আর ভালবাসার পরম পরশে গড়ে তুলে।
(লেখক : সাংবাদিক।)