২২ জুলাই ২০১৮


‘পানিতেই’ ভাগ্য আরিফ কামরানের

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : সিলেটে সুপেয় পানির সংকট সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার আগ থেকেই। নগরীতে জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এ সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এখনো এই সংকট চলছেই। অপরদিকে বিগত সময়ে সিলেট নগরীর প্রধান সমস্যা হিসেবে জলাবদ্ধতাকেই দেখছেন নগরবাসী। নগর কর্তৃপক্ষও এই সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবুও এ সমস্যার সমাধান টানতে পারেননি সিসিকের ইতিহাসের নির্বাচিত দুই মেয়র।

সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর আমলে শুধুমাত্র নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এতো বড় বরাদ্দের পরও জলাবদ্ধতা দুর হয়নি সিলেট নগরী থেকে। একটু বৃষ্টির পানিতেই নগরীর অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে পানি রাস্তায় গড়ায়। জমে থাকা পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ভোগায় সাধারণ মানুষকে। জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট সমাধানে সিসিকের সব মেয়র প্রার্থীই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন সেই প্রথম সির্বাচন থেকে। কেউ নিয়েছিলেন শুধু উদ্যোগ। কেউ কিছুটা বাস্তবায়ন করেছেন। তবুও জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট রয়েই গেছে।

আগামী ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিসিকের ৪র্থ নির্বাচন। এবারও মেয়র প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি গুলোর মধ্যে অন্যতম সুপেয় পানির সংকট ও জলাবদ্ধতা নিরসন। এসব সমস্যার সমাধানে নজরকাড়া পরিকল্পনায় সাজিয়েছেন নিজেদের পোস্টার লিফলেটগুলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও লিখছেন নানা পরিকল্পনার কথা। মেয়র প্রার্থীদের কাছে নগরবাসীর অন্যতম চাওয়া জলাবদ্ধতা নিরসন ও সুপেয় পানির সমস্যা সমাধান। তাই এই পানি হয় ভাসাবে; না হয় ডুবাবে মেয়র প্রার্থীদের। যারা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন তাদেরকেই ভোট দেবেন নগরবাসী এমনা জানিয়েছেন ভোটাররা।

জানা গেছে, নগরীতে প্রতিদিন আট কোটি লিটারের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি লিটার পানি। এ হিসাবে দৈনিক পানির ঘাটতি থাকছে পাঁচ কোটি লিটার। কিন্তু সিলেট সিটি করপোরেশন এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে দিন দিন জনদুর্ভোগ বাড়ছে। এদিকে পানির চাহিদা পূরণে নগরীর কুশিঘাটে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের উদ্বোধন করেন সদ্য বিদায়ী মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সেখান থেকে প্রতিদিন ৬০ লক্ষ লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তাতেও ঘাটতি কাটছে না নগরবাসীর।

সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, মাথাপিছু ১০০ লিটার চাহিদা ধরলে প্রতিদিন নগরীতে পানির চাহিদা রয়েছে প্রায় আট কোটি লিটার। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় তিন থেকে সাড়ে কোটি লিটার। বাকি পাঁচ কোটি লিটার ঘাটতি থাকছে।

সূত্রমতে, ১৯১৮ সালে নগরীর তোপখানায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করে তৎকালীন সিলেট পৌরসভা। এ প্লান্টের মাধ্যমে সুরমা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে তা নগরবাসীর জন্য সরবরাহ করা হতো। পরবর্তীতে নগরীতে জনসংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও নতুন করে কোনো পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়নি। এছাড়া দীর্ঘদিন প্লান্টটি সংস্কার না করায় এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে নগরীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। সমস্যা সমাধানে ২০০২ সাল থেকে ২২টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলিত পানি ৩০টি পাম্পের মাধ্যমে নগরীতে সরবরাহ করা হয়।

কিন্তু চাহিদার তুলনায় ঘাটতির বড় ব্যবধান থাকায় অধিকাংশ এলাকাই সিটি করপোরেশনের পানি সুবিধার বাইরে থেকে যায়। এ অবস্থায় ২০০৭ সালে স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় নগরীর কুশিঘাটে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন পানি শোধনাগার প্লান্ট স্থাপন কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে প্লান্টের উদ্বোধন করেন সদ্য বিদায়ী মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ শোধনাগার প্লান্ট থেকে পানি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রতিদিন ২ কোটি ৮০ লাখ লিটার। কিন্তু বর্তমানে এ শোধানাগার প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ৬০ লক্ষ লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সরবরাহকৃত পানি বিশাল ঘাটতি পূরণে তেমন সহায়ক হতে পারেনি।

নগরবাসী জানান, সরকারের বরাদ্দের ২৩৬ কোটি টাকার কাজ করানোর পরে কিছু খাল উদ্ধার ছাড়া তেমন কোন উন্নয়ন কাজ চোখে পড়েনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার পাশে অনেক ড্রেনের কাজ শেষ না করেই উদ্বোধন করা হয়েছে। এতে আধা সমাপ্ত কাজে রাস্তায় যানজটের এবং আরো জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয় করেও সুফল না মেলায় অভিযোগের অভিযোগের কাঠগড়ায় সদ্য সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর দিকে।

সাধারণ ভোটারদের অভিযোগ, সরকারের এতো টাকা ব্যয় হয়েছে নালা-নর্দমা ও খাল থেকে মাটি উত্তোলন, প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ, খালের তলা পাকাকরণ, খননযন্ত্র ও মাটি সরানোর কাজে ট্রাক কেনায়। আর আরিফুল হক চৌধুরী ঘন ঘন ছড়া, নালা উদ্ধার অভিযান উদ্বোধনেই সময় ব্যয় করেছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের মতে, পরিকল্পিতভাবে ওই টাকা খরচ হয়নি। রুটিন কাজ করেই দায় সেরেছে সিটি করপোরেশন। জল দূর করার টাকা যেন জলেই গেছে। ফলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছেনা নগরবাসী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অল্প বর্ষনে সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, বারুতখানা, হাওয়াপাড়া, নাইওরপুল, মির্জাজাঙ্গাল, মনিপুরি রাজবাড়ি, দরগাহ গেট, সুবিদবাজার, বনকলাপাড়া, হাউজিং এস্টেট, জালালাবাদ, লোহারপাড়া, বাগবাড়ি, চারাদীঘিরপাড়, রায়হোসেন, কলবাখানী, কুয়ারপাড়, কাজলশাহ, পাঠানটুলা, খোজারখলা, ভার্থখলা, মেনিখলা, বারখলা, পাঠানপাড়াসহ অন্তত ৫০টি এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

বাসাবাড়িতে পানি ওঠার পাশাপাশি রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন স্কুলগামী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। কোথাও হাঁটুজল, আবার কোথাও কোমরপানি ভেঙে তাদের চলাচল করতে হয়। ২৩৬ কোটি টাকা খরচের পরও এতো ভোগান্তি নগরবাসীর!

নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, সকালে পানি এলে বিকালে আসে না। আবার বিকালে এলে সকালে থাকে না। অনেক সময় টানা কয়েক দিনও পানি পাওয়া যায় না।

নগরীর জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা জাফর ইকবাল বলেন, সিটি করপোরেশনের পানি বিকেল ৫টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আসে। গরম শুরু হওয়ায় এই সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও হয় বেশি। তাই চাহিদা মত পানি তোলা যায় না। ফলে পানির সংকট থেকেই যাচ্ছে।

হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে নানান পরিকল্পনার কথা বলেন প্রার্থীরা। নির্বাচিত হওয়ার পর সব ভূলে যান তারা। তিনি বলেন, আদর্শ নগরী গড়ার কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি আজোও। এ পর্যন্ত যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে; তা দলীয়করণের কারণে দুমড়েমুচরে যায়।

তিনি বলেন, সিসিকের মেয়র যে নির্বাচিত হয়, পূর্ণমেয়াদে তার দল ক্ষমতায় থাকে না। যার কারণে বিরোধী দলের মেয়র হওয়ায় উন্নয়নটা তেমনভাবে হচ্ছে না। তিনি বলেন, যেই ক্ষমতায় যাক; আমরা চাই নগরীর উন্নয়ন। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির সংকট গুরুত্বসহকারে নিরসন করতে হবে।

এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের পানি শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলী আকবর বলেন, নগরীতে প্রতিদিন আট কোটি লিটারের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি লিটার পানি।

তিনি বলেন, কুশিঘাট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ৬০ লক্ষ লিটার পনি সরবরাহ করা হচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের সদ্য বিদায়ী মেয়র ও সিসিক নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক বলেন, নগরবাসীর পানির সমস্যা সমাধানে আমিই প্রথম উদ্যোগ নেই। ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর কুশিঘাটে ওয়াটার ট্রিটম্যান্ট প্লান্ট আমার হাত ধরে পূর্ণতা পেয়েছে। হামলা-মামলা-কারাবাসের কারণে সময় কম পেয়েছি। এই সময়ের মধ্যে চেষ্ঠা করেছি নগরবাসীকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে। আগামীতে নির্বাচিত হলে আরো নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করব। এবং সময়ের ভেতরেই বাস্তবায়ন করব।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, নগরবাসীর বিশুদ্ধ পানির সংকট সমাধানে আমি যা করেছি আর কেউ তা করতে পারেনি। আমি অনেক প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিলাম। সময়ের কারণে কিছু কাজ শেষ হয়েছে পরবর্তী সময়ে। সিংহভাগ কাজ আমি করেছি। আগামীতে নির্বাচিত হলে সকলের মতামত নিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করব।

(আজকের সিলেট/২২ জুলাই/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন