২৬ মে ২০১৮
মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : আজ শনিবার রমজান রহমতের ঝর্ণাধারার ৯ম দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রাত জেগে সালাত আদায় করবে, তার পূর্বের সব (সগিরা) গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বোখারি : ৩৭; মুসলিম : ৭৫৯)। বস্তুত ‘কিয়ামে রমজান’ রমজানের রাতে সালাতে দাঁড়ানোকে বোঝায়, সেটা প্রথম রাতে হোক বা শেষ রাতে। সুতরাং তারাবি সালাতও কিয়ামে রমজানের অন্তর্ভুক্ত। সেদিক বিবেচনায় তারাবি সালাতকে গুরুত্ব দেয়া এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সওয়াব, প্রতিদানের আশা ও আগ্রহ প্রকাশ করা প্রত্যেক মুমিন বান্দার কর্তব্য। এ সালাতুত তারাবি তো হাতেগোনা কয়েকটি রাত মাত্র। তাই সুযোগ চলে যাওয়ার আগেই বুদ্ধিমান ঈমানদার ব্যক্তিদের এ সুযোগ গ্রহণ করা উচিত।
তারাবি শব্দের অর্থ বিশ্রাম করা। এক সময় মুসল্লিরা এ সালাত বহু দীর্ঘায়িত করে আদায় করতেন। যখনই চার রাকাত সালাত শেষ করতেন, তখনই তারা একটু আরাম বা বিশ্রাম করে নিতেন। সর্বপ্রথম আল্লাহর নবী (সা.) মসজিদে নববিতে তারাবির সালাত সুন্নত হিসেবে চালু করেন। তারপর উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি এ সালাত ছেড়ে দেন। বোখারি ও মুসলিমে রয়েছে, আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের কোনো এক রাতে মসজিদে সালাত আদায় করলেন, লোকজনও তার সঙ্গে সালাত আদায় করলেন। পরবর্তী রাতেও তিনি সালাত আদায় করলেন, তাতে লোকজন আরও বৃদ্ধি পেল। তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে অনেক লোকের সমাগম হলো। কিন্তু সে রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত হলেন না। সকালে তিনি বললেন, তোমরা যা করেছ, তা আমি দেখেছি। কিন্তু তোমাদের ওপর এ সালাত ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি উপস্থিত হইনি। (বোখারি : ১১২৯; মুসলিম : ৭৬১)।
আবু যর গিফারি (রা.) বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে সিয়াম পালন করছিলাম। (এর মধ্যে) রমজানের সাত দিন বাকি থাকার আগ পর্যন্ত (প্রথম ২৩ দিন) তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করেননি। বাকি সাত দিনের প্রথম রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। তারপর ষষ্ঠ রাতে আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন না। পঞ্চম রাতের অর্ধাংশ পর্যন্ত ফের আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের বাকি অংশটুকুও যদি আপনি আমাদের নিয়ে নফল সালাত আদায় করতেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তরে বললেন, নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সালাত আদায় করবে, তার আমলনামায় সারা রাত সালাত আদায়ের সওয়াব লেখা হবে।’ (তিরমিজি : ৮০৬)।
বিতর সালাতসহ তারাবির সংখ্যা কত হয়, তা নিয়ে সালাফে সালেহিনের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে সালাফে সালেহিন তথা নেককার পূর্বসূরিরা তারাবির সালাত খুব লম্বা কেরাতে আদায় করতেন। যেমন সায়েব ইবন ইয়াযিদ (রা.) বলেন, ‘কারিরা প্রতি রাকাতে শত শত আয়াত পড়তেন। এমনকি আমরা দীর্ঘ রাকাতের কারণে লাঠির ওপর ভর দিয়ে সালাত আদায় করতাম।’ (মুয়াত্তা মালিক : ৩৮৯)। কিন্তু আজকের দিনের মানুষ এর বিপরীত করে। তারা অনেক দ্রæতগতিতে তারাবি সালাত আদায় করে। ফলে শান্তি ও ধীর-স্থিরতার সঙ্গে সালাত আদায় করা যায় না। অথচ ধীর-স্থিরতা ও শান্তির সঙ্গে সালাত আদায় করা সালাতের রোকনগুলোর একটি, যা ছাড়া সালাত বিশুদ্ধ হয় না। তারা এ গুরুত্বপূর্ণ রোকনটিকে নষ্ট করে এবং তারা তাদের পেছনের দুর্বল, অসুস্থ ও বৃদ্ধ বয়সী মুসল্লিদের কষ্ট দেয়। এতে নিজেদের ওপর জুলুম করে এবং অন্যদের ওপরও জুলুম করে থাকে। উলামায়ে কেরাম (রহ.) বলেন, মুকতাদিরা নামাজের সুন্নত আদায় করতে পারে না এমন দ্রæতগতিতে ইমামের সালাত পড়ানো মাকরুহ। তাহলে ওয়াজিব তরক করতে বাধ্য হয়, এমন দ্রæততা অবলম্বন করলে কীরূপ হবে! আমরা আল্লাহর কাছে এরূপ কাজ থেকে আশ্রয় চাই। তাই তারাবির সালাতের জামাত উপেক্ষা করা উচিত নয়। যতক্ষণ ইমাম তারাবি ও বিতর শেষ না করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে সালাত আদায়ের সওয়াব লাভ করতে হবে। কোনোক্রমেই ভিন্ন মতামতের দোহাই দিয়ে ইমামের সঙ্গে সালাত ত্যাগ করা ঠিক হবে না।