২৫ মে ২০১৮


৩৭ বছর ধরে বারান্দায় ক্লাস চলছে সিলেট শিশু একাডেমির

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার উর্বর জনপদ সিলেট। সুপ্রাচীনকাল থেকে সিলেট তার আপন সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারায় উৎকর্ষিত। সেই সংস্কৃতি চর্চায় জননীর মতো ভূমিকা রেখে চলেছে সিলেট জেলা শিশু একাডেমি। অথচ সাঁইত্রিশ বছরেও সংস্কৃতির বিকাশের মূল ভিত্তি এই শিশু একাডেমির নিজস্ব ভবন হয়নি। বারান্দায় কার্পেটের উপর বসে যুগের পর যুগ চলছে কোমলমতি শিশুদের শ্রেণি কার্যক্রম। এই প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতির বিকাশ ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই।

পড়াশোনার পাশাপাশি গান, নাচ, ছবি আঁকার মতো বিষয়গুলো থাকলে শিশুদের জন্য শিক্ষা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। শিশু একাডেমিতে এসব কিছুই আছে। এখানে সঙ্গীতের চর্চা হয়। শেখানো হয় ছবি আকাঁ। আবৃত্তি, নৃত্য, তবলা প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। তার সাথে যুক্ত হয়েছে শিশুদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। প্রতিবছর সবগুলো বিভাগ থেকে শিশুরা নিজেদের মেধা মনন দিয়ে অর্জন করছে নানা সাফল্য। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারা সিলেটের জন্য বয়ে আনছে গৌরব।

সিলেটের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে এই প্রতিষ্ঠানটি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখলেও সাঁইত্রিশ বছরেও তার কোনো নিজস্ব ঠিকানা হয়নি। কেবল বইখাতায় শিক্ষাকে চার দেয়ালে বন্দি রাখলে শিশু পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হতে পারবে না। সত্যিকারের বিকাশে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক চর্চা। সাংস্কৃতিক চর্চা শিশুর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটায়। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠলে শিশুর চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন ঘটে।

এরকম বহুমাত্রিক শিল্পচর্চা বিকাশের জন্য ১৯৮১ সালে সিলেট রিকাবী বাজারের পাশে শিশু একাডেমির যাত্রা শুরু হয়। দু’তলা বিশিষ্ট এই ভবনের নিচতলায় রয়েছে অডিটোরিয়াম। বর্তমানে যেটি কবি নজরুল অডিটোরিয়াম হিসেবে পরিচিত। উপরতলায়ও রয়েছে অডিটোরিয়ামের গ্যালারি। যে কোনো অনুষ্ঠান হলে দর্শকরা উপরতলায় উঠার জন্য পা দিয়ে যে জায়গাটি মাড়িয়ে হলে প্রবেশ করেন সেই ছোট্ট জায়গাটি জুটেছে শিশু একাডেমির শিশুদের কপালে। এই বারান্দাতে বসেই তারা ছবি আঁকে, গান গায়, আবৃত্তি করে, মেতে উঠে শিল্পচর্চায়।

আর এই চর্চার ভেতর দিয়ে তারা দেখে সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। তারা দেশ-বিদেশের নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ছিনিয়ে আনে সুনাম এবং সুখ্যাতি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু প্রজ্ঞাদীপ্ত মানুষ তৈরি করেছে এই সংস্থাটি। এই অবস্থায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হবার পর ২০১২ সালে শিল্পকলা একাডেমির ভাগ্য খুলে যায়। তাদের জন্য শাহী ঈদগাহ এলাকায় বরাদ্দ হয় নতুন জায়গায় বৃহৎ পরিসরে নতুন ভবন। তারপর থেকে শিল্পকলার নিজস্ব ঠিকানা হয়।

কিন্তু শিশু একাডেমির কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা এখনো রয়ে গেছে পুরনো ঠিকানায়। পুরনো বারান্দাকে ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে চলে তাদের শ্রেণি কার্যক্রম। এতে করে শিশুদের নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তার মধ্যে প্রতিবছর বাড়ছে শিক্ষার্থীর চাপ। এ নিয়ে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। বর্তমানে শিশু একাডেমিতে সব বিভাগ মিলিয়ে রয়েছে ১১২৫ জন শিক্ষার্থী। তার মধ্যে আবৃত্তি বিভাগে ২৪২ জন, নৃত্যে ১০০ জন, সঙ্গীতে ৩২২ জন, চিত্রাঙ্কনে ৪২৮ জন এবং তবলায় রয়েছের ৩৩ জন শিক্ষার্থী।

২০১৭ সালে শিক্ষার্থী ছিলো ১০৫৭ জন। অর্থাৎ প্রতিবছরই সকল বিভাগে বাড়ছে শিক্ষার্থী। ১১২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন ২২ জন। আছেন কর্মচারী আরো ও ৪ জন। জায়গা সংকুলানের কারণে শিক্ষার্থীদের মতো শিক্ষকদেরও পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। কখনো মেঝেতে, কখনো চেয়ারের উপর বসে তাদেরকে পাঠদান করাতে হচ্ছে।

অভিভাবক সঞ্জয় নাথ সঞ্জু জানান, অডিটোরিয়াম থাকায় প্রায় প্রতিদিন অনুষ্ঠান থাকে বিভিন্ন সংগঠনের। তখন নিচ এবং উপরতলায় থাকে অবাধে মানুষের আসা-যাওয়া। এই অবস্থার মধ্যে চলে শ্রেণি কার্যক্রম। এতে করে পাঠদানে মনোযোগ হারায় আমাদের সন্তানরা। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত স্থান রাখা খুবই প্রয়োজন। শিশু একাডেমির আবৃত্তি বিভাগের সিনিয়র প্রশিক্ষক জ্যোতি ভট্টাচার্য্য। যিনি প্রায় দুই যুগ ধরে শিশুদের কল্যাণে কাজ করছেন।

এ প্রসঙ্গে কথা হলেও তিনি জানান, বিষয়টি ভাবতেও কষ্ট হয়। এ অবস্থায় মূল্যবোধ নষ্ট হচ্ছে শিশুদের। তাদের ভালো রাখার দায়িত্ব আমাদের। বাংলাদেশের অন্য কোথাও এভাবে ক্লাস হয় কিনা আমার জানা নেই।

তিনি বলেন, এখানে বহুমাত্রিক শিল্পচর্চা হয়। এসব চর্চা আবার তাদের নৈতিক চর্চাকে সহায়তা করে। বারান্দার মেঝেতে বসে ক্লাস হবার ফলে অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয় তাদের মানসিক বিকাশ। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন হয়। তাদের জন্য চাই উন্মুক্ত জায়গা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, নাট্য ব্যক্তিত্ব ও অনুবাদক নিজাম উদ্দির লস্কর ময়না জানান, আমি দীর্ঘদিন শিশু একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলাম। ভাবতে অবাক লাগে এমন একটা সময়ে এসে এখনো আমাদের সন্তানরা বারান্দায় বসে ক্লাস করছে। অথচ এই শিশুদের উন্নত জীবন এবং সুষ্ঠু পরিবেশে তাদের বিকাশের ব্যাপারে সব দেশের সরকারই আন্তরিক।

তিনি বলেন, ভবনের ব্যাপারে বহু আলাপ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ বিষয়ে অবগত। তারপরও কেন যে হচ্ছে না, আমার বোধগম্য নয়। জেলা সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইদুর রহমান ভুইয়া বলেন, এ বিষয়ে কয়েকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু তবুও সাড়া পাচ্ছি না। জায়গার অভাবে প্রতিবছর মেধাবী শিশুদের ভর্তি করতে পারি না। বিষয়টা আমাকে আহত করে। তিনি বলেন, যে পরিবেশে শিশুরা সৃজনশীল চর্চা করবে সেই পরিবেশ শিশু একাডেমিতে নেই। একটি ভবন পেলে শিশু একাডেমিকে শিশুস্বর্গ বানানো সম্ভব।

এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অডিটোরিয়ামে প্রতিদিন অনুষ্ঠান হয়। তীব্র সাউন্ড দিয়ে চলা অনুষ্ঠানের ভেতর আমাদের শিশুদের ক্লাস নেয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক বলেন, আমাদের লজ্জা লাগে যখন দেখি সরকারি এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের ক্লাস চলে বারান্দায়। আর বারান্দার পাশেই রয়েছে শৌচাগার।

(আজকের সিলেট/২৫ মে/ডি/এসটি/ঘ.)

শেয়ার করুন