১৬ জুন ২০২০


এক কোয়ালিটি রাজনীতিবিদ এখন কেবল ইতিহাস

শেয়ার করুন

বাঁচলেন না কামরান

আহমেদ পাবেল :: বাঁচলেন না কামরান। মৃত্যুর স্বাধ তাকেও গ্রহন করতে হলো। এটাই নিয়ম, ব্যতয় ঘটেনি আজও। কিন্তু কৃতিতে তিনি এক মহাকৃতিমান। আমজনতার প্রিয় নাম ছিল বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। বিনয়ের এক অনুসরনীয় চারিত্রিক ব্যৈশিষ্ট্য ছিল তার চরিত্রে। মানুষকে আপন করে নেয়ার মোহনীয়তা সত্যিকারের নগরপিতার আসনে বলেছিলেন যেন আমৃত্যু। প্রবাসী অধ্যষিত সিলেট শহরে জনপ্রতিনিধির ছিলেন তিনি, মহানগরে পরিণত হ্ওয়ার পর প্রথম মেয়র হ্ওয়ার গৌরবময় ইতিহাস তারই। যতদনি থাকবে, সিলেট, দেশ, বিশে^ও মানচিত্র ততদিনই সেই ইতিহাসে স্মরনীয় হয়ে থাকবেন তিনি। জীবন চলার পথে নানা বাকে চড়াই উৎরায়ের শেষ ছিল না তার। সবই সামলিয়ে নিয়েছেন ধৈর্য্য ও বিচক্ষণ স্বভাব দিয়ে। আগ্রাসী মানসিকতার বদলে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে কূটনীতিক চালে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য শক্তি ছিল তার। সেকারনে তৃণমুল থেকে শিখরে, কোন শাখা-প্রশাখাই দীপ্তমান জীবনে বাড় পড়েনি তার। কেবল মানুষের প্রতি ভালবাসাতে, মহিয়ান হয়েছেন তিনি। এক এগারো পরবর্তী দুঃসময়েও নানা ষড়যন্ত্র সিলেটের মানুষের ভালবাসা থেকে দুরে রাখা যায়নি তাকে। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র থাকাবস্থায়ই ১৯৭২ সালে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান নির্বাচিত হন সিলেট পৌরসভার কমিশনার। এলাকাবাসীর অনুরোধে অল্প বয়সে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিজয়্ও ছিনিয়ে নেন তিনি। যেন এক জাত জনসেবক হয়েই জন্ম হয়েছিল তার। কিন্তু তার মরহুম পিতা এমনটি চাননি কামরানের বেলায়। কিন্তু এলাকার লোকজন বিশ্বাস করতেন সুখে-দুঃখে এই ছেলেটিকে কাছে পাবেন তারা, সেকারনে জেদ ধরেন কামরানকে নিয়ে। তাদের সে বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি কামরান। জনপ্রতিনিধির অগ্নিপরীক্ষায় বিরাবরই উতরে গেছেন সিলেটবাসীর ভালোবাসায় তিনি। বদর উদ্দিন আহমদ মেয়রের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি টানা ৩বার সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। সর্বশেষ সম্মেলনে মহানগরের সভাপতি থেকে সরে গেলেও স্থান পান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৮১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটিতে। একজন সদস্য হিসেবে কেন্দ্র আওয়ামীলীগে নেতৃত্বেও সংযোগ ঘটে তার। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের হাত ধরে আ’লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া কামরান ছিলেন শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও। ছাত্র অবস্থাতেই রাজনীতির মাঠে পা রাখেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। ১৯৬৮-৬৯ এর উত্তাল সময়ে কামরানের মিছিল যাওয়ার শুরু। সরকারি চাকরিজীবী বাবা-প্রথমে আপত্তি করলেও এক সময় মেনে নেন বাধ্য হয়ে। কারন মানুষ আর রাজপথের জন্যই যেন তার পূত্রের জন্ম। কামরানের মাঝে রাজনৈতিক চেতনার সূচনা ঘটে মূলত ১৯৬৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায়। সে সময় দেশ-মাতৃকাকে অরক্ষিত মনে হয়েছিল তার। বৈষম্য পীড়া দিত তখন থেকেই। ১৯৬৯ সালে সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ নামে একটি বিষয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে উঠলে স্কুল ছাত্র কামরানও শামিল ছিলেন সে আন্দোলনে। স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই গায়ে মুজিব কোটে মুজীব হয়েছিলেন তিনি। মুজিবভক্ত নানী দিয়েছিলেন কোটের সেই টাকা। সে সময় কোট তৈরিতে খরচ হয়েছিলো ১১৫ টাকা। ১০০ টাকার কাপড় আর সেলাই বাবদ ১৫ টাকা। বন্দর বাজারের শাহ আবু তোরাব জামে মসজিদ সংলগ্ন একটি টেইলার্স থেকে তৈরি করিয়েছিলেন কোটটি। ১৯৫৩ সালে জন্ম হয়েছিল বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের। বাবার লিখে রাখা নোটটি হারিয়ে যাওয়ায় জানা হয়নি সঠিক তারিখটি তার জন্মের। এখন বছরের প্রথম দিনই পালন করতেন নিজের জন্মদিন। জিন্দাবাজার দুর্গাকুমার পাঠশালায় তার পড়াশোনার প্রথম পাঠ। এরপর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পাট শেষ করেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময়ই ৬৪২ ভোট পেয়ে তৎকালিন সিলেট পৌরসভার ৩নং তোপখানা ওয়ার্ড থেকে দেশের সর্বকনিষ্ঠ পৌর কমিশনার নির্বাচিত হন তিনি। কমিশনারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই কামরান এমসি কলেজে ভর্তি হন বিএ-তে। কলেজের সবাই তখন আলাদা চোখে দেখতেন তাকে। শিক্ষকরাও মজা করে তাকে ডাকতেন ‘কমিশনার সাব’ বলে । এতে লজ্জায় কামরানের ফর্সা মুখ লালচে হয়ে যেত। কাঁধে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব থাকায় প্রায়ই ক্লাস কামাই যেতো। এদিকে এমসি কলেজে আবার উপস্থিতির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি একটু বেশিই। পড়াশোনা এবং জনসেবা দু’কূল রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে কলেজ পাল্টাতে হয় কামরানকে। স্নাতক অধ্যায়ে সিলেট মদন মোহন কলেজের পা রাখেন তিনি। জীবনে সাফল্য ধরা দিয়েছে বারেবার তার। ১৯৭২ সালে কামরান প্রথম যখন পৌরসভার কমিশনার হন তখন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন বাবরুল হোসেন বাবুল। এর পরের বার পৌর চেয়ারম্যান হন অ্যাডভোকেট আফম কামাাল। পরবর্তীতে পৌরসভা ও সিটি নির্বাচনে এ দুই চেয়ারম্যানই পরাজিত হন কামরানের কাছে। ১৯৭২ সাল থেকেই কামরান সিলেট পৌরসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েন। মাঝে শুধু একবার বিদেশ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। পারিবারিক কাজে বছরখানেকেরও বেশি সময় কাতাওে পাড়ি দেন কামরান। এক এগারো পরবর্তী জরুরি অবস্থা চলাকালীন সময়টি জীবনখাতায় উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল কামরানের। দুই দফায় ১৮ মাস কারাবন্দি হন তিনি। কারাগারের শেকল জীবনেই কঠিনতম এবং মধুরতম অভিজ্ঞতার পূর্ণ হয় তার জীবন। ক্ষমতাসীনরা তাকে কারাগারে আটকে রাখলেও তার প্রতি মানুষের ভালোবাসায় ধরাতে পারেনি চিড়। জেলে বসেই ২০০৮ সালের সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। নির্বাচনের দিন কুমিল্লা কারাগারে বন্দি তিনি । এ নির্বাচনে ৮০ ভাগ ভোটই জমা পড়েছিল কামরানের বাক্সে। করপোরেশনের সকল ভোটকেন্দ্রে বিজয়ী হয়ে নজির সৃষ্টি করেন তিনি । এমনকি নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সকল প্রার্থীর বাতিল হয়েছিল জামানতও । দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন কীর্তি তারই। কিন্তু সিসিকের তৃতীয় ও চতুর্থ নির্বাচনে বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যেতে হয় নির্বাচনী এ দৈত্যকে। ২০১৩ সালে সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে আরিফের কাছে পরাজয়ের পর কামরান আশাহত হলেও যাননি ভেঙে। দলীয় রাজনীতিতে ছিলেন সক্রিয় তিনি । তার বাসার দরজা সবশ্রেণির মানুষের জন্য সবসময় ছিল উন্মুক্ত। নগরীতে কোথায় কোন সমস্যা, তা অবহিত হলে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করে তা সমাধানে অস্থির হয়ে যেতেন তিনি। মহানগরের রাজনীতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে কামরান দলীয় প্রার্থীদের জন্য চষে বেড়িয়েছেন গোটা সিলেট বিভাগ। কারন সাধারন মানুষের নিকট পছন্দের এক আইডল ছিলেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সিসিকের চতুর্থ নির্বাচনেও পরাজয় বরণ করেন কামরান। তবে দল কিংবা নেতা-কর্মীদের জন্য আগের অবস্থান থেকে সরে যাননি তিনি । পরাজয় তার জন্য বেদনার হলেও দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি। অসুস্থ হওয়ার আগে করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান কামরান। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অসহায় মানুষের সহায়তায় ছুটে যান । স্ত্রী, দ্ইু ছেলে, এক মেয়ে আর দুই নাতনী নিয়ে ছিল কামরানের সংসার ছিল। ব্যস্ত এক রাজনীতিবিদ কামরান এক সময় সংস্কৃতিচর্চায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। সুযোগ পেলেই গলা ছেড়ে সংগীতের সুর তুলতেন আপন মনে। শিশু কিশোর সংগঠন চাঁদের হাটের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তিনি। শৈশবে ক্রিকেট-ফুটবলও ছাড়্্ওা প্রতি বছর এখনও ব্যাটমিন্টন হাতে দুরন্ত ছিলেন। শৈশব ও কৈশোরে কামরানের নিত্য সঙ্গি ছিল বাইসাইকেল। ছোটবেলায় ঘুড়ি ওড়ানোতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। কিন্ত অজন্যের অধ্যায় সমাপ্ত করে দিয়েছে চির বিদায়। যার নাম মৃত্যু। অমোঘ সেই সত্য কামরানকে নিয়ে গেছে পরপারে।। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এর মধ্যে দিয়ে বিচ্ছেদ ঘটলো স্থানীয় রাজনীতিতে এক অমূল্য বটবৃক্ষের, এক কোয়ালীটি রাজনীতিকের। সময়ের শ্রেষ্ট সন্তানের। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা এক শোক বিবৃতিতে বলেন, স্বীয় কর্মের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতা কামরান গণমানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তাই এখন নিরন্ত প্রত্যাশা সকলের, সব মানুষের।

শেয়ার করুন