২০ ডিসেম্বর ২০২৩


নির্বাচন ঘিরে শক্ত অবস্থানে নেই প্রগতিশীল দলগুলো

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী- প্রধান এই রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিগত বছরগুলোতে রাজপথে সরব ছিল বামপন্থা ও গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি। বর্তমানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লেও রাজপথে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না বাম, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারার এই রাজনৈতিক দলগুলো। মোটাদাগে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশে রয়েছেন তারা। একদিকে আওয়ামী লীগের বাইরে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে না আসায় রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে মাঠের রাজনীতিতে মেধাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কেন পিছিয়ে পড়ছে, উঠেছে সে প্রশ্নও।

সংবিধানের বাইরে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনের সুযোগ নেই- আওয়ামী লীগ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এই যৌক্তিকতা উপেক্ষা করে প্রতিবাদ কর্মসূচি বহাল রেখেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। নির্দলীয় সরকারের দাবি সামনে রেখে শুধু বিএনপি বা জামায়াত নয়, নির্বাচন বর্জন করেছে সিপিবি ও বাসদসহ ৬টি বামদলের জোট ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ ও গণসংহতি আন্দোলনসহ ৬টি দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’।

একইসঙ্গে ভোটাধিকার, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মতপ্রকাশের অধিকারের দাবিতেও আন্দোলন চলমান রেখেছে বড়-ছোট সকল বিরোধী দল। সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের অধিকার, বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে হয়রানি প্রতিরোধ এবং সকল দমনপীড়নের বিরুদ্ধেও বিরোধী দলগুলোর সহাবস্থান ও একই বার্তা লক্ষ্যণীয়। তবুও একই মিছিল ও সমাবেশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে না বাম, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারার বিরোধী দলগুলোকে।

তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতাদের একই দাবিতে রাজপথে সরব থাকতে দেখা গেলেও বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে পৃথক অবস্থান ও আন্দোলনের বিষয়ে ঢাকা টাইমস প্রশ্ন রেখেছে এই দুটি রাজনৈতিক জোটের অন্যতম নেতৃত্বের কাছে।

এই প্রসঙ্গে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী এবং গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা জোনায়েদ সাকি মনে করেন, একদলীয় শাসনব্যবস্থার মধ্য থেকে বাম গণতান্ত্রিক জোটের দ্বিদলীয়বৃত্তকে (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) সামনে রেখে রাজনৈতিক কার্যক্রম তাদের রণকৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত।

এদিকে মোটেই ভুল কৌশল নয় উল্লেখ করে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী সরকারের (আওয়ামী লীগ) পতন ঘটিয়ে আরেকটি কর্তৃত্ববাদী সরকার (বিএনপি) ফিরিয়ে আনার সহযোগী না হয়ে, নিজেদের মতাদর্শিক রাজনীতিতেই একনিষ্ঠ অবস্থান ধরে রাখা জরুরি।

গণতন্ত্র মঞ্চ এরইমধ্যে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যোগসূত্র রেখেই আন্দোলনের নীতি নির্ধারণ করেছে দাবি করে বামপন্থি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘একসময় বামপন্থি নেতা রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর সঙ্গেও ছিলাম। তারাও বলেছিলেন আগে এই সাম্প্রদায়িকতার পতন ঘটাই। এক ধরনের দুঃশাসন এবং সাম্প্রদায়িকতার পরাজয় ঘটিয়ে আরেকটি ফ্যাসিস্টকে ক্ষমতায় দেখতে চাই না। যে ফ্যাসিস্টের চেহারাও সামনে উন্মোচিত হবে।’

অন্যদিকে বামজোটের এই রাজনৈতিক কৌশল আওয়ামী লীগের বর্তমান ‘ফ্যাসিস্ট শক্তিকেই’ পরোক্ষভাবে টিকে থাকতে সহায়তা করে বলে দাবি করেছেন জোনায়েদ সাকি।

বাম গণতান্ত্রিক জোট ও গণতন্ত্র মঞ্চের রাজনৈতিক অবস্থান
দুঃশাসন, জুলুম-লুটপাট প্রতিহত করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে রাজধানীর পল্টন থেকে আটটি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’। তবে ২০২২ সালে ‘গণসংহতি আন্দোলন’ ও ‘বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি’ এই জোট থেকে বেরিয়ে যায়। একই বছরের আগস্টে ৭টি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘গণতন্ত্র মঞ্চ।’

ভাঙনের পর ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ ও ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ উভয় জোটেই ৬টি করে রাজনৈতিক দল রয়েছে। বাম গণতান্ত্রিক জোটে রয়েছে- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টি।

সম্প্রতি ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ থেকে গণঅধিকার পরিষদ বেরিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে রয়েছে গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও ভাসানী অনুসারী পরিষদ।

রাজনৈতিক মতাদর্শের মতভেদের কারণেই এই ভাঙন ঘটেছে বলে স্পষ্ট করেছেন বামপন্থা ও গণতান্ত্রিক ধারার শীর্ষ নেতারা। এই ভাঙনের আগে সরকার পতনের দাবিতে ২০১৮ সালে এবং পরবর্তী সময়েও রাজপথে সক্রিয় ছিল ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ ও জোটের অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। তবে ৫ বছর পেরিয়েও বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে বিএনপি ব্যতীত অন্য বিরোধী দলগুলো রাজপথে কঠোর অবস্থান নিতে সক্ষম হয়নি।

রাজপথে সক্রিয় থাকার প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বাম গণতান্ত্রিক জোট ও গণতন্ত্র মঞ্চের প্রথম সারির নেতারা।

দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনাই প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট দ্বিদলীয়বৃত্তে আটকে আছে। ফ্যাসিস্ট সরকারকে মোকাবিলায় বাম গণতান্ত্রিক জোট যেভাবে দ্বিদলীয়বৃত্তকে সামনে নিয়ে এগোচ্ছে এতে ফ্যাসিস্ট শক্তিকেই পরোক্ষভাবে টিকে থাকতে সহায়তা করে। বরং এই মুহূর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং জনগণের মুক্তির পক্ষে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি’।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্স ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বর্তমান শাসনব্যবস্থা একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী- এক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। এটি ফ্যাসিস্ট সরকারের নব্যরূপ। তবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিমালা একই, কোনো পার্থক্য নেই। এদেশে পালাক্রমে এই দুটি দল কম বা বেশি, দুঃশাসন ও স্বৈরতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে রাজনীতি করছে। গণতন্ত্র মঞ্চ সে ধারার সঙ্গে রাজনীতি করলে সেটা তাদের চয়েজ (অবস্থান)। যার যার অবস্থান নিয়ে আমাদের প্রশ্ন নেই।’

সারাদেশের কৃষক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রকৃত মুক্তির প্রশ্নে গণসংগ্রাম গড়ে তোলাই বামপন্থিদের প্রধান কাজ বলে জানিয়েছেন রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি একইসঙ্গে সমালোচনা স্বীকার করে বলেন, ‘সেটা আমরা এখনো পারিনি। কিন্তু স্বৈরতন্ত্র বা সাম্প্রদায়িকতা পরাজিত করতে গিয়ে যদি আরেকটি একই শক্তির সাথে হাত মেলাই, তাহলে আসল উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। একটি দুঃশাসন ছুঁড়ে ফেলে আরেকটি দুঃশাসনের ক্ষমতায় এলে, মানুষের কোনো মুক্তি ঘটে না। একটি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাজিত করে, অন্য সাম্প্রদায়িকতাকে ক্ষমতায় চাই না’ বলেও স্পষ্ট করেছেন বাম জোটের সমন্বয়ক।

১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উদাহরণ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘৯০-এ একদফা আসার আগে শ্রমিক অধিকার, নারী অধিকার ও বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন দফা ছিল। পরে এরশাদ পতনের একদফা স্লোগান ওঠে। এরশাদ চলে গেল কিন্তু অন্যান্য সকল অধিকার অর্জন ও দফা বাস্তবায়নে গণঅভ্যুত্থানকারীরা আর কাজ করল না। মুক্তির সংগ্রাম ছিনিয়ে নিল বুর্জোয়ারা। এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের এগোনো উচিত।’

বাম জোটের এই রাজনৈতিক অবস্থান ও চলমান আন্দোলনকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে আহ্বান চলমান আছে বলে জানিয়েছেন গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা জোনায়েদ সাকি।

বিকল্প শক্তির প্রত্যাশা
বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে তরুণ প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিকল্প শক্তি’ গড়ার প্রত্যাশা ছিল বলে জানিয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভাজনের রাজনীতির ফাঁদে পড়ে গেছে বাম, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো।

তবে জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক শক্তি গড়ে তুলতে গণতান্ত্রিক স্পেস থাকতে হবে। এই বাস্তবতায় বিকল্প বা জনগণের শক্তির দাঁড়ানোর জায়গা নেই। একইসঙ্গে এই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার মাঝেই বৃহত্তর ঐক্য ও জনগণের বিকল্প শক্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি।’

‘ভয় এবং লোভের এই শাসনব্যবস্থা হটানোর লড়াইয়ে যত সময়ই লাগুক নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই করতে হবে। আর নয় সাময়িক লাভ হতে পারে কিন্তু মানুষের মুক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই কে কোথায় আহ্বান জানালো তার চেয়ে বড় কথা রাজপথে থেকে যে যার যার আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। বামপন্থিদের বিশ্বাসযোগ্যতা বুর্জোয়াদের কাছে বর্গা দেওয়া হবে না’ বলে স্পষ্ট করেছেন রুহিন হোসেন প্রিন্স।

ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এরা আগের মতো ঐক্যবদ্ধ নয়। বাম জোট থেকে ভেঙে দুই খণ্ড হয়ে গেছে। একটি হচ্ছে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’, আরেকটি ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। এতগুলো বামপন্থি দল থাকারও দরকার ছিল না, আবার ভাগ হয়ে যাবে সেটারও দরকার ছিল না। এরা একসঙ্গে থাকা অবস্থায় শক্তি বেশি ছিল। এরা কেউই সেভাবে জনগণের কাছে যেতে পারছে না, জনগণের আকাক্সক্ষা তুলে ধরতে পারছে না।’

ঐক্যবদ্ধ থাকতে না পারার কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রথমত, এসব রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য স্থির নয়। দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করতে না পারা এবং তৃতীয়ত, গোটা বিশ্বেই পুঁজিবাদের উত্থান।

এই রাজনৈতিক চিন্তক বলেন, ‘তাদের অন্তত একটা কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ থাকার দরকার ছিল। যেটা তারা গ্রহণ করতে পারে নাই। এই দায় তাদেরই। একইসঙ্গে সংকটটা সারা পৃথিবীতেই। রক্ষণশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীলরাই এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জনগণের বিক্ষোভ ধারণ করার সক্ষমতা নেই বাকিদের। গোটা বিশ্বেই পুঁজিবাদের উত্থান ও পেশিশক্তি বেড়ে যাওয়ায় বামপন্থিরা তেমন অবস্থান গড়ে তুলতে পারছেন না।’

ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে রাজনীতির মাঝে জনগণের বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠা সম্ভব নয় বলেও মত দিয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

শেয়ার করুন