২ এপ্রিল ২০১৮
নিজস্ব প্রতিবেদক : গত বছরের ১ এপ্রিল মীরাবাজারের খারপাড়ার বাসাটি ভাড়া নেন রোকেয়া বেগম। ঠিক এক বছর পর ১ এপ্রিল এই বাসা থেকে ছেলেসহ তার লাশ উদ্ধার করা হয়। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় তথ্য ফরমে রোকেয়া বেগম (৪০), রবিউল ইসলাম রুকন (১৭) ও জান্নাতুল ফেরদৌস রাইসা রাইস (৩) সহ লোকন মিয়া (৩৪) নামে একজনের নাম লেখা হয়। তবে লোকন মিয়ার পরিচয় বা তাদের সাথে কি সর্ম্পক ছিল তার কোন তথ্য নেই ফরমে। এমনকি রোববার ওই বাসায় লোকন মিয়ার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এমনকি বাসার মালিক বা রোকেয়ার পরিবারের সদস্যরাও জানেন না কে এই লোকন মিয়া।
এদিকে, এঘটনায় রবিবার রাতে সিলেট কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ২৬ জনকে আসামী করে এ মামলা দায়ের করেন নিহত রোকেয়া বেগমের ভাই জাকির হোসেন।
মামলার এজাহারে কোনো আসামীর নাম উল্লেখ করা না হলেও, গত কয়েকদিন আগে রোকেয়ার বাসায় হামলা, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া এবং তাকে মারধরের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ হামলা ও মারধরের ঘটনা উল্লেখ করে এর সাথে জড়িত শিপলু, তানিম ও সুমনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে একথাও উল্লেখ আছে এ ঘটনার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
রোকেয়া বেগমের ছোট ভাই জাকির হোসেন বলেন, লোকন মিয়া নামে কাউকে আমি চিনিন না। এমনকি আমাদের পরিবারে এ নামের কেউ নেই।
এদিকে, রোকেয়ার মেয়ে রাইসা জানিয়েছে, তারা মা ও ভাইকে হত্যা করেছে তানিয়া নামের একজন। কে এই তানিয়া তাও রোববার রাত পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
ওই বাসার মালিক সালমান হোসেন জানান, রোকেয়া বেগমের বাসায় একটি মেয়ে কাজ করতো। তবে তার নাম আমরা জানি না।
নগরীর মিরাবাজারে খারপাড়ার মিতালী আবাসিক এলাকার ১৫/জে নম্বর বাসা থেকে রোববার দুপুর ১২টার দিকে রোকেয়া বেগম (৪০) ও রবিউল ইসলাম রুকন (১৭)-এর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় ওই বাসা থেকে রোকেয়া বেগমের পাঁচ বছরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস রাইসা রাইস কে উদ্ধার করা হয় ।
যে বাসায় খুন হন রোকেয়া বেগম তার পাশের বাসায়ই ভাড়া থাকেন শেফালি বেগম। রোববার সকালে রোকেয়া বেগমের ভাই জাকির হোসেন চিৎকার শুনে বাসা থেকে বের হন শেফালি। গিয়ে তিনি দেখেন- জানালার পাশে জাকির কান্না করছেন।
শেফালী বলেন, ”ভিতরে ছোট্ট মেয়েটি এক রুম থেকে আরেক রুমে দৌড়াচ্ছে আর কান্না করছে। মামাকে দেখার পর মেয়েটা (রাইসা) সাহস পায়। বলতে থাকে- ‘তানিয়া ভাইয়ারে মারছে, আম্মারেও মারছে, আম্মার গলা কাটছে, তাড়াতাড়ি ডাক্তারো নিয়া যাও। আমার গলায়ও ধরছে।’ বলে কাদঁতে থাকে।”
শেফালি বেগম বলেন, ‘ভিতরে বাচ্চাটা কান্না করতেছে। খালি জানালাটা ভাঙ্গতাম পারছি না। ইগুরে আল্লায় বাচাইয়া রাকছুইন মনে হয় স্বাক্ষী দিত করি। ই বাচ্চাটার গলাত ইলা ধরছে, খাল উঠি গেছে, দাগ পরি গেছে।’
খারপাড়া এলাকার শারমিন স্টোরের মালিক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘রোকেয়া বেগমের ছেলে রোকন মিরাবাজার এলাকার শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সে খুব ভালো ছেলে। তবে প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সে আমার দোকান থেকে বেনসন সিগারেট নিয়ে যেতো। আমি তাকে কখনও সিগারেট খেতে দেখিনি। দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে সে সরাসরি বাসায় চলে যেতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘শনিবার (৩১ মার্চ) রাত ১০টার দিকে সে দোকান থেকে বেনসন সিগারেট নিয়ে যায়। আর রবিবার (১ এপ্রিল) খবর পেয়েছি, রোকন ও তার মাকে কারা বাসার ভেতরে খুন করে রেখে গেছে।’
রোকেয়া বেগমের বাসার মালিক সালমান হোসেন বলেন, ‘মাসে ১৩ হাজার টাকায় আমার বাসার নিচলতলার বাম পাশের অংশটি ভাড়া দিই। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় রোকেয়া নামের ওই নারী জানান, তিনি পার্লার চালান। তার পার্লার নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় রয়েছে।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনতলা ভবনের নিচতলায় চার কক্ষের একটি বাসায় থাকতেন রোকেয়া। বাসার বাম দিকের কক্ষে থাকতো রোকন এবং ডান দিকের শেষের প্রান্তের কক্ষে থাকতেন রোকেয়া বেগম। রোকেয়া বেগমের কক্ষে পুরুষের যাতায়াত ছিল, এমন কিছু আলামত পেয়েছে পুলিশ। বিছানার পাশের একটি টেবিলে বেনসন সিগারেটের দু’টি প্যাকেটও পাওয়া গেছে।’
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পরিতোষ ঘোষ জানান,”শুক্রবার বিকেলেই এ হত্যাকান্ডটি ঘটে থাকতে পারে বলে আমরা ধারনা করছি। রোকেয়া বেগমের শরীরের বেশ কয়েকটি স্থানে ছুরিকাঘাতের দাগ পাওয়া গেছে। এদিকে ছেলে রুকনকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করছি।”
তিনি আরো জানান, “মেয়ে রাইসাকেও তারা সম্ভবত মারার চেষ্টা করে পরে মৃত ভেবে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।” মূল ঘটনা তদন্তের পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলেও জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।
রোকেয়া বেগমের ছোট বোনের স্বামী ফারুক আহমেদ বলেন, শুক্রবারে বিকাল চারটার দিকে আপার সাথে আমার ফোনে কথা বলার সময় বলছেন, গত কয়েকদিন আগে একটা গেঞ্জাম হয়েছে বাসায়। সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে আপা ভয়ে কিছু বলে নাই। তিনি শুধু বলেন, সবাইরে জানানো হলে আমার ছেলের উপর অত্যাচার করবে তারা। আপা বলেন, তোমার বাড়িতে জায়গা আছে আমারে একটা রুম বানিয়ে দাও থাকার জন্য। আমি বলেছি- কিভাবে কি করা লাগবে আমি তোমাকে রাতে জানাবো। রাত আটটার দিকে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কল করলে তার ফোন বন্ধ পাই। ওই দিন ঝড়ের কারনে বিদ্যুৎ ছিলো না তাই মনে করেছি মোবাইলে হয়ত চার্জ নাই। পরেরদিন বিদ্যুৎ না থাকার কারনে আমার মোবাইলেও চার্জ ছিল না। শনিবার রাতে ৯টার দিকে আবারো কলরলে তার মোবাইল বন্ধ পাই। এরপর সকালে জাকির ভাই এসে এই ঘটনা দেখতে পান।
কোতোয়ালি থানার ওসি গোউসুল হোসেন বলেন, উদ্ধারকৃত রাইসা বর্তমানে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি আছে। রাইসার জবানবন্দিতে আসা তানিয়া সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোন তথ্য নেই বলে জানান তিনি। তবে তদন্তপূর্বক এ সর্ম্পকে বিস্তারিত বলা যাবে।
পারিবারিক সূত্র জানা যায়, রোকেয়া বেগমের সাথে স্বামী হেলাল আহমদের অনেকদিন ধরেই বনিবনা হচ্ছিলো না। হেলাল অপর স্ত্রী পান্না বেগম ও তাদের ৯বছরের একটি পুত্র সন্তানকে নিয়ে নগরীর বারুতখানা এলাকার একটি বাসায় ভাড়া থাকেন।
রোববার বিকেলে ওই বাসায় গিয়ে পান্না বেগমের সাথে কথা বললে, তিনি বলেন- আমাদের সাথে রোকেয়া বেগমের কোন যোগাযোগ নেই।
(আজকের সিলেট/২ এপ্রিল/ডি/কেআর/ঘ.)