১২ অক্টোবর ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে নতুন ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা কাদের ওপর জারি করা হয়েছে তা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে, ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ শুরু করায় তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজনীতিতে। মাঠে সরকার ও সরকারবিরোধী দলগুলো পাল্টা-পাল্টি বক্তব্য দিলেও ভেতরে ভেতরে ভিন্ন চিত্র দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভিসানীতির প্রয়োগের পর আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ভিসানীতির ফলে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, তারা নির্বাচন প্রতিহত করার লক্ষ্যে সহিংসতা চালালে ভিসা বিধিনিষেধে পড়বেন। আর বিএনপি বলছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি আওয়ামী লীগের জন্য খুবই লজ্জাজনক। দেশবাসীর পাশাপাশি বিদেশিরাও দেখেছে এ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না।
কূটনীতিকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি নির্বিশেষে বাংলাদেশের জন্য ভিসানীতি কোনো সুখবর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ বাণিজ্য সম্পর্ক, বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স ঘিরে সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই দেশটি থেকে এমন নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক নয়।
তবে, ভিসা নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক উইংয়ের সদস্য শামা ওবায়েদ বলেন, ‘দেশে নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, তারা কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। তারপর এখন যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি প্রয়োগ করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের এই সরকারের ওপর কোনো আস্থা নেই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকরা বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের গভীরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র মূলত নাখোশ। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি করার প্রক্রিয়া থেকেই মূলত আমেরিকা বাংলাদেশের ওপর ভিসানীতি আরোপ করেছে। এখানে উদ্দেশ্যটি রাজনৈতিক নয়, ভূ-রাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রাখা হচ্ছে প্রকৃত উদ্দেশ্য। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত বারবার বলছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু আয়োজন করতে হবে। সরকারও প্রতিউত্তরে বলছে, যেকোনো মূল্যে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে তারা বদ্ধপরিকর।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতিতে সরকার প্রধান ও সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতিতে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক শেখ হাসিনার চোখেমুখে। উন্মাদ হয়ে গেছেন তারা। এরা এখন লুটের টাকা কীভাবে রক্ষা করবে তা নিয়ে চিন্তায় আছেন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি আওয়ামী লীগের জন্য খুবই লজ্জাজনক। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করে বর্তমান সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকার তাদের অধীনে আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে হবে বলে বিদেশিদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু দেশবাসীর পাশাপাশি বিদেশিরাও দেখেছে এ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আগামী নির্বাচন সামনে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ভিসানীতিকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি ক্ষমতাসীনদের ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে বড় ধরনের সিগন্যাল। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ভোট রিগিং হচ্ছে, ভোটের দিন ছাড়াও প্রতিদিন ভোট রিগিং হয় বাংলাদেশে। এটা বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাকে আমরা স্বাগত জানাই। ভিসানীতিতে একেবারে সরাসরি যাদের কথা বলেছে এবং তাদেরকে যে ম্যানশন করেছে- এটা একটা বড় পদক্ষেপ। এটা তাদের (ক্ষমতাসীন দল) জন্য বড় মেসেজ।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘ভিসানীতি প্রয়োগই শেষ কথা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে তখন তা দিন দিন কঠোর হয়। তাই ভিসানীতি প্রয়োগই শেষ কথা নয়। এরপর আরও বড় ধরনের পদক্ষেপও আসতে পারে। তখন দেশে নানা ধরনের সংকট তৈরি হবে। অর্থনৈতিকভাবে দৈন্যদশার মধ্যে পড়বে দেশ। দুঃখজনক বিষয়ক হলো, সরকারের যে কোনো উপায়ে ক্ষতায় থাকার স্বৈরাচারী মনোভাব সারা দেশের মানুষকে ভোগাতে শুরু করেছে।’
মার্কিন ভিসানীতি ঘোষণার পরই বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি কার্যক্রম শুরু হচ্ছে- সম্প্রতি এমন ঘোষণায় নেতাকর্মীরা আরো বেশি চাঙ্গা হয়েছে।’
এদিকে ভিসানীতির প্রয়োগের পর আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ভিসানীতির ফলে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, তারা নির্বাচন প্রতিহত করার লক্ষ্যে সহিংসতা চালালে ভিসা বিধি-নিষেধে পড়বেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপ শুরুর পর এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ‘মার্কিন ভিসানীতি নতুন কিছু নয়, এ নিয়ে শঙ্কিত নয় সরকার। যুক্তরাষ্ট্র সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ভিসানীতি প্রয়োগ করবে এমনটা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘ভিসানীতি প্রয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ চিন্তিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক দেশ, তেমনি আমরাও। বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) অবশ্যই অন্যদের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু আমরা এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমরা জানি, কীভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হয়। সামনের বছর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয় তার জন্য বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে ওয়াশিংটন।’
তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি নিয়ে কারো উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। যারা নির্বাচনে বাধা দেবে, তাদের ক্ষেত্রেই এই নীতি প্রযোজ্য হবে। নীতিমালা নিয়ে বিএনপি অনেক কথা বলবে। সংবাদপত্রেও অনেক কথা হবে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎই সেটির প্রমাণ। তাদের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতা এবং বহুমাত্রিক সম্পর্ক দিন দিন দৃঢ় হচ্ছে।’
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘মার্কিন ভিসানীতি বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে আমি বলেছি, মার্কিন ভিসানীতি অবশ্যই আমাদের জন্য অপমানজনক। তবে আমরা এই ভিসানীতি নিয়ে বিচলিত নই।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘ভিসানীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যাপার। তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এখানে আমাদের কিছু বলার নেই। কাকে ভিসা দেবে কাকে দেবে না, সেটা তাদের নিজস্ব এখতিয়ার। সেখানে আমাদের কিছু বলার নেই।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ভিসানীতি নিয়ে বর্তমান সরকার পরোয়া করে না। শান্তিপূর্ণ অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চায় আওয়ামী লীগ সরকার। অবাধ শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন যারা চায়, তাদের ভিসানীতি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। যারা নির্বাচন চায় না, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তাদের আন্দোলনের বারোটা বেজে গেছে, তারা এখন হতাশা থেকে সবকিছুতেই ইস্যু কিংবা আনন্দ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ভিসানীতির বাস্তবায়নের বাস্তবতা দেখা যাবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কে নিষেধাজ্ঞা দিল আর কে দিল না, তাতে কিছু যায় আসে না। আমার ছেলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে। সে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, বিয়ে করেছে, তার মেয়ে আছে, সম্পত্তি আছে, বাড়িঘর আছে। যদি বাতিল করে, করবে। তাতে কিছু আসে যায় না। আমাদের বাংলাদেশ তো আছেই। যারা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তাদের নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভিসানীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে টার্গেট করলে কিছু বলার নেই। কারও শক্তিতে বিশ্বাস করে ক্ষমতায় আসিনি। জনগণের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় এসেছি এবং আছি। মার্কিন ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণায় বিরোধীদের কথাও বলা হয়েছে। এবার তারা (বিএনপি) জ্বালাও-পোড়াও করতে পারবে না। এতে জনগণের জীবন বাঁচবে।’
উল্লেখ্য, গত ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি ও বিরোধী দলের যেসব সদস্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে খাটো করার চেষ্টা করছে, তাদের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ দেওয়া হলো। বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে, ওই ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
ভিসা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর গত ২৪ মে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেন, ‘বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়তার লক্ষ্যে নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে-এমন বর্তমান ও সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা, সরকার ও বিরোধী রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিচার বিভাগের সদস্য, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার অর্থ হলো-ভোট কারচুপি, ভোটারকে ভয়ভীতি দেখানো, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বাধাদান, রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজ, মিডিয়াকে মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া। এসব কর্মকাণ্ডের জন্যও ভিসানীতির প্রয়োগ হতে পারে।