২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩
ডেস্ক রিপোর্ট : প্রাকৃতিক ভূমিকম্পের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল পুণ্যভূমি সিলেট। বিশেষজ্ঞরা অঞ্চলটিকে ভূমিকম্পের ‘ডেঞ্জার জোন’ বলে মনে করেন। বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ডেঞ্জার জোন বলা হয় সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকার ডাউকি ফল্টকে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরে সংগঠিত ভূমিকম্পের অন্তত ২০টির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের মধ্যেই। যার অধিকাংশ হচ্ছে সিলেট অঞ্চলে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বারবার ভূমিকম্প হওয়ার অর্থ এখানকার চ্যুতির লাইনগুলো সক্রিয় আছে।
সর্বশেষ ত্রিশদিনের ব্যবধানে তিনবার কেঁপেছে সিলেট। দফায় দফায় ছোট ছোট এসব কম্পনকে বড় ভূমিকম্পের আভাস হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ এ ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের তথ্যমতে সিসিকে প্রায় ৪২ হাজার ভবন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এসব ভবনের ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ-ই ভূমিকম্পের কথা চিন্তা না করে তৈরি করা হয়েছে। তারা বলছেন, ৭ মাত্রার ভূকম্পন হলে নগরীর ৮০ ভাগ বহুতল ভবন ভেঙে পড়তে পারে। অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশন কেবল তর্জনগর্জনেই সীমাবদ্ধ রেখেছে ঝুঁকি মোকাবেলার বিষয়টি। সিসিক বলছে, অর্থসংকটে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন জরিপ বা পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। ভূমিকম্প অনুভূত হলেই এ নিয়ে কিছুদিন কথা হয়। এরপর আবার সব থেমে যায়।
এ নিয়ে কথা বললে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) পরিবেশ ও পুর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম জানান, ভূমিকম্পের কথা চিন্তা না করেই সিলেট নগরীর ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভবন তৈরি করা হয়েছে। সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৮০ শতাংশ বহুতল ভবন ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন যে ভেঙে ফেলতে হবে তা নয়, রেক্টোফিটিংও করা যেতে পারে। সাপোর্টিং পাওয়ার দিয়ে ভূমিকম্প প্রতিরোধক হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।’
২০২১ ও ২২ সালে সিলেটে কয়েক দফা ভূমিকম্পের পর ঝুঁকি মোকাবেলায় কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয় নি। এর মধ্যে কিছু ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিতও করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলো ভাঙতে পারে নি সিটি করপোরেশন। ২০২১ সালের মে মাসে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া সিলেটের বেশ কয়েকটি ভবন ও বিপণিবিতান বন্ধ করে দেয় সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। তবে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ফের সেগুলো খুলে দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবন বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছিলাম। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে এগুলো সংস্কার করার জন্যও মালিকপক্ষকে বলেছিলাম। কিন্তু তারা তা শোনেন নি। আবার ভবনগুলো ভাঙতে গেলে তারা আদালতে মামলা করে বসেন।
নগরের ৪২ হাজার ভবনে ভূমিকম্পের সহনীয়তা নিয়ে প্রকৌশলগত বিস্তারিত মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপও করি। ওই প্রতিষ্ঠানটি চারতলা একটি ভবন মূল্যায়নের জন্য ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ফি চায়। সেই হিসেবে সব মিলিয়ে নগরীর ৪০ থেকে ৪২ হাজার ভবন পরীক্ষা করাতে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার প্রয়োজন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এই খাতে এত বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করার মতো তহবিল নেই। তাই এখনও আমরা এ ব্যাপারে কোনো চুক্তি করতে পারিনি।
সিলেটে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম ভূঞা বলেন, সিলেটের বেশিভাগ ভবন অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। নগরীর অলিগলিও সরু। পাড়ার ভেতরে অগ্নিকাণ্ড হলে ঢোকা-ই যায় না। আর ভূমিকম্প হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে সেটি অকল্পনীয়। আমাদেরই এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন।