১৮ আগস্ট ২০২৩
শাবি সংবাদদাতা : ফেসবুকে পোস্ট করার জেরে মধ্যরাতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় দুই কর্মীকে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন ও প্রাণে ফেলার হুমকি দিয়ে হল ছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রলীগের একটি অংশের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে।
বুধবার দিবাগত রাত ১২ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন প্রাধ্যক্ষ আবু সাঈদ আরফিন খাঁন।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম সীমান্ত ও তার কয়েকজন সমর্থকদের বিরুদ্ধে বুধবার দুপুরে হল প্রাধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সৈকত রায়। একই ঘটনায় ভুক্তভোগী আরেক শিক্ষার্থী হলেন মেহেদী হাসান। তারা উভয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম এন্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
উভয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের ৪২০ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র। ভুক্তভোগীরা ছাত্রলীগ নেতার সীমান্তের অনুসারী বলে ক্যাম্পাসে পরিচিত।
তবে একই ঘটনায় ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেও ‘জুনিয়রদেরকে র্যাগিংয়ের’ পাল্টা অভযোগ দিয়েছেন সীমান্তের অন্য সমর্থকরা।
দুটি অভিযোগই লিখিতভাবে প্রাধ্যক্ষ আবু সাঈদ আরফিন খান পেয়েছেন; পুরো ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মেহেদী অভিযোগ করেন, গত ১৫ আগস্ট ছাত্রলীগের প্রোগ্রামের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের আয়োজিত আলোচনা সভা হয়। সেখানে ছাত্রলীগের ভাইয়েরা অনেকে বক্তব্য দেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যক্তিগণ ও শিক্ষকরাও বক্তব্য দেন।
সেখানে একজন স্যার বক্তেব্যে বলেন, ‘আমাদের আমেরিকা যাওয়ার দরকার নেই। পশ্চিমারা আমাদের শত্রু। আমরা দেশেই থাকতে পারব।’
‘‘সেই বক্তব্য আমি ঘাটাঘাটি করে দেখি, ‘যে স্যার এমন বক্তব্য দিয়েছে, ওনার ছেলেই আমেরিকার ওয়াশিংটনে আছে। পরে আমি বিষয়টি নিয়ে মজার ছলে ও ফেসবুকে কউকে মেনশন না করে পোস্ট দেই শুধু বিনোদনের জন্য। পোস্ট দেওয়ার ২০/২৫ মিনিট পড়ে আমার গ্রুপের সিনিয়র সীমান্ত ভাই নজরে আসলে বিষয়টি আমাকে বলেন, তখন আমি পোস্টটি মুছে দেই।”
পরে গত বুধবার রাতে ১১টা ৪০ এর দিকে গ্রুপে আমার সহপাঠী আর জুনিয়ররা এসে বলতেছে, ‘সিনিয়র ভাইয়েরা বলছে তোর সবকিছু নিয়ে হল ছেড়ে চলে চতে। প্রশাসনও বলছে তোরে গাড় ধাক্কা দিয়ে হল থেকে নামিয়ে দিতে।’ আমি বললাম, ‘প্রশাসন বললে তো নোটিশ দিবে।’
তখন তারা বলে, ‘তোকে নামাইতে আবার নোটিশ দিতে হবে কেন, তুই কে? তর বাপেও এখানে কিছু করতে পারবে না।’ পরে সীমান্ত ভাই বলতেছে, ‘প্রশাসন থেকে আমাকে কল দিল যে, ‘তোকে যেন এখনি হল থেকে বের করে দেই’। আমি সকালে যাবো বললে, তখনই সীমান্ত, রিফাত, রাহাত, তামিম, শিমুল, আসিফ, রাকিবুল, বাঁধন, হাবিবুর রহমান আসিফ, নিজাম, হোসেন সরকার ও মুবিন সিদ্দিক আমার কলার ধরে ঘুষি মারতে শুরু করে।
‘‘এক পর্যায়ে আমি মেঝেতে পরে গেলে আমাকে সবাই ফুটবলের মতো লাথি মারতে শুরু করে। পরে কলার ধরে রুম থেকে বের করে হলের বাইরের রাস্তায় নিয়ে আসে আমাকে। সেখানেও মারধর করে। বলে, ‘তুই এখান থেকে যদি এক পা ভিতরে যাস, তর অস্তিত্ব থাকবে না। তর লাশটাও পাবি না।’’
‘‘এরপর রাতেই হলের গেস্ট রুমে নিয়ে যান তারা। সেখানে মাহমুদুল স্যারের (সহকারী প্রাধ্যক্ষ) সঙ্গে ফোনে কথা বলে আমি আমার এক ব্যাচমেটের রুমে গিয়ে আশ্রয় নেই। তারপর সকালে সহকারী প্রাধ্যক্ষ স্যার আসলে স্যারকে বিষয়গুলো বুঝিয়ে বললে স্যার বললেন, লিখিত অভিযোগ দেওয়ার দরকার নেই। বিষয়টি আমি দেখব। তাই আমি লিখিত অভিযোগ দেইনি।’’
ভুক্তভোগী সৈকত রায় বলেন, সৈয়দ মুজতবা আলী হলের ৪২০ নম্বর কক্ষের বৈধ ছাত্র তিনি। তিনি, মেহেদী আরও দুইজন একই কক্ষে থাকেন।
প্রভোস্ট বরাবর লিখিত অভিযোগে সৈকত উল্লেখ করেন, গত রাত (বুধবার) আনুমানিক ১২টায় আজিজুল ইসলাম সীমান্তের ১২-১৫ জন অনুসারী তার রুমে এসে রুমের একজনের সঙ্গে (মেহেদী) তর্কে জড়ায় এবং তাকে মারধর করে।
‘‘এক পর্যায়ে মারধরকারীরা ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিতে চাইলে আমি বাঁধা দিলে কয়েকজন তাকেও মারধর করে। পরে বিষয়টি প্রভোস্ট স্যারকে মোবাইলে জানাতে চতুর্থ তলা থেকে তৃতীয় তলায় আসতেই সীমান্তের সঙ্গে দেখা হয়। তখন সীমান্ত ভাই আমাকে পেলে জানতে চায়“কই যাস? কাকে কল দিচ্ছোস?” আমি প্রভোস্ট স্যারকে ফোন দিচ্ছি জানালে সীমান্ত ভাই ফোন জোরপূর্বক কেড়ে নেয় এবং আমাকে টেনে ৪২০ নং রুমে নিয়ে গিয়ে মারধর করে, রুম অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করে।’’
এ সময় সেখানে ইংরেজি বিভাগের বাঁধন, ওমর ফারুক, রিফাত, নিজাম, লোকপ্রশাসন বিভাগের আসিফ, রাকিব, শিমুল, তারেক, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অনু, পলিটিক্যাল স্টাডিস বিভাগের তামিম এবং সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের আসিফুর আসিফ ছিলো।
সৈকত অভিযোগ করেন, ‘‘মারধরের সময় অনেকেই অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেছে। এ ছাড়া রুম থেকে বিছানাপত্র এবং বই বের করার সময় ওমর ফারুক আমার ড্রয়ারে হাত দিয়ে টাকা নিয়েছে বলে জানান সৈকত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে আমার ফোনে ফ্লাশ দিয়ে ফেরত দেন এবং সকল ডাটা এবং ডকুমেন্ট নষ্ট করে ফেলে। এ সময় সীমান্ত হুমকি দিয়ে বলে, ‘তোর ভাগ্য ভালো যে তোকে জানে মারিনি। আর এই সব যদি প্রশাসনের কানে যায় তাহলে জানে মেরে ফেলবো। পূর্বে অভিযোগ দিতে পারছিলি। এখন প্রশাসন আমাদের পক্ষে। দেখি কে তোকে হলে থাকতে দেয়।’
তিনি এখন গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সৈকত রায়।
এদিকে, একই ঘটনার ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে ‘র্যাগিংয়ের’ পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন সীমান্তের অন্য সমর্থকরা। এরা হলেন, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত, মুনির, ইংরেজী বিভাগের একই বর্ষের রাহাত, নিজাম ও সমাজকর্মের মুবিন সিদ্দিকী। প্রাধ্যক্ষকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তারা উল্লেখ করেন, তাদেরকে ৪২০ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে মেহেদী ও সৈকত শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করেন। বিষয়টি গ্রুপের সিনিয়ররা জানলে সবাইকে নিয়ে বসে এবং ৪২০ নম্বর কক্ষে তালা মেরে দেন।’
দুই শিক্ষার্থীর অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রলীগ নেতা সীমান্ত বলেন, রাতে হলে সিনিয়র- জুনিয়র ভুল বোঝাবোঝি হয়েছে এমনটা শোনার পরে আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি মিমাংসা করে দিয়েছি এবং হল প্রসাশনকে বিষয়টি জানিয়েছি। প্রশাসন বলেছেন, ‘তারা সবার সাথে কথা বলে বিষয়টি মিমাংসা করে দিবেন।’
দুইটি অভিযোগ পেয়েছেন জানিয়ে হল প্রাধ্যক্ষ আবু সাইদ আরফিন খাঁন বলেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখার জন্য তাকে প্রধান করে তিনি সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী প্রভোস্ট আব্দুল্লা আল ইসলাম ও সৈয়দ মুজতবা আলী হলের সহকারী প্রভোস্ট ওয়াছেক মিয়া। কমিটি খুব দ্রতই তদন্তের কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছেন হল প্রাধ্যক্ষ।