১১ মে ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : গত বাজেটে বিদেশে পাচার করা অর্থ-সম্পদ নির্ধারিত অঙ্কের কর পরিশোধ করে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই দেশে আনার সুযোগ দেয় সরকার। এক বছরের জন্য দেওয়া এই সুযোগ শেষ হতে যাচ্ছে চলতি অর্থবছরের শেষ দিন ৩০ জুন। তবে এ সুযোগের আওতায় এ পর্যন্ত কোনো অর্থ দেশে ফেরত আসেনি। সবমিলিয়ে আসছে বাজেটে এ সুযোগ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ফলে আগামী বাজেটে এ সুযোগ বন্ধ হচ্ছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরানোর সুযোগসহ বাজেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন এনবিআর কর্মকর্তারা। বৈঠকে এনবিআর কর্মকর্তারা বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফেরানোর সুযোগে সাড়া মেলেনি জানিয়ে ফের সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাব করেন। এ ছাড়া বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর আরও বেশ কিছু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
বৈঠক থেকে প্রস্তাব হিসেবে যেগুলো চূড়ান্ত হয়েছে, সেগুলো ১৪ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে পাচারকৃত অর্থ কর পরিশোধ করে দেশে আনার সুযোগ ফের না দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটির ২০২২ সালের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে পাচার হচ্ছে ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এসব টাকা চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ডসহ ১০টি দেশে। পর্যালোচনায় মন্ত্রণালয় দেখতে পেয়েছে, বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধের মাধ্যমে বিনা প্রশ্নে ওইসব অর্থ-সম্পদ দেশে আনার যে সুযোগ সরকার দিয়েছিল, এখন পর্যন্ত পাচারকারীরা তা গ্রহণ করেনি।
গত বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এ সুযোগের আওতায় এ পর্যন্ত কোনো অর্থ-সম্পদ বিদেশ থেকে দেশে আনেনি কেউ। এসব কারণে আসছে বাজেটে এ সুযোগ রাখার যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তাদের এ মতামত সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে বলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। এসব কারণে পুনরায় এ সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে সরকার।
মাত্র ৭ শতাংশ করের মাধ্যমে পাচার করা অর্থ বিনা প্রশ্নে দেশে ফিরিয়ে আনতে ‘অফশোর ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’ বিধান এই প্রথম অর্থ আইনে যুক্ত করা হয়। গত বাজেটে এ ঘোষণার পর সুশীল সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
এ বিষয়ে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটে বলা হয়, ‘বিদেশে অবস্থিত যে কোনো সম্পদের ওপর কর পরিশোধ করা হলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ যে কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। বিদেশে অর্জিত স্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে এর ওপর ১৫ শতাংশ, বিদেশে থাকা অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে ১০ শতাংশ করা দিতে হবে। বাংলাদেশে পাঠানো (রেমিটকৃত) নগদ অর্থের ওপর ৭ শতাংশ হারে কর আরোপ হবে। আর এ সুবিধা ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।’
অর্থমন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের জুলাই থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত ওই প্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে কোনো অর্থ দেশে আসেনি। এছাড়া এ সুযোগ প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি অর্থমন্ত্রণালয় ও এনবিআরের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। আর পাচারকারীরাও এ সুযোগ নিচ্ছে না। এসব কারণে আগামী বাজেটে এমন সুযোগ বাতিল করতে চায় সরকার। সরকার এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। বাজেটে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
যদিও এ সুযোগ দেওয়ায় টাকা ফেরত আসবে বলে গত বছর বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ সুযোগ বহাল রাখলে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হবে। তারা অর্থ পাচারের পথ বেছে নেবে। কর দিতে নিরুৎসাহিত হবেন সৎ করদাতারা। আসন্ন বাজেটে এ সুযোগ রাখলে দুর্নীতি-অর্থপাচার নির্মূলের বদলে এ ধরনের অপরাধ পৃষ্ঠপোষকতা পাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বাজেটে এ সুযোগ দেওয়ার পর আমরা এর প্রতিবাদ করেছিলাম। এ বিষয়ে টিআইবি পূর্বের অবস্থানেই রয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থপাচার মনিটরিং সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিআইএফইউ) তাদের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, আমদানি-রপ্তানিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কারসাজি আর হুন্ডির আড়ালে অর্থপাচার করছে পাচারকারী সিন্ডিকেট।
আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটির তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। শুধু ২০১৫ সালে ১ বছরেই দেশ থেকে পাচার হয়ে যায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। পাচারকৃত টাকার পরিমাণ বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় পাচারকারী দেশ হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে বাংলাদেশ। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের সাড়ে ১৭ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে পাচার হচ্ছে বলে দাবি আন্তর্জাতিক সংস্থাটির।
যদিও বিদেশে টাকা পাচার রোধ, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে আর পাচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে একযোগে কাজ করছে বাংলাদেশের ৮টি সংস্থা।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খুব কমসংখ্যকই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নিয়েছে। পাচার হওয়া টাকা দেশে আনার বৈধতা দেওয়ার সুযোগ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক তিনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।’
আসন্ন ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা; যা মোট জিডিপির প্রায় ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিশাল আকারের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে পাঁচ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে এনবিআর, এনবিআরবহির্ভূত এবং করবহির্ভূত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা।