৮ মে ২০২৩
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : গত কয়েক বছর পর এবারই হাওরাঞ্চলে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ধান পেয়েছেন কৃষক। তাই হাওর জুড়েই অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দিন-রাতে ধান কাটা, মাড়াই, সিদ্ধ দেওয়া আর শুকানোর কাজেই ব্যস্ত কৃষাণ-কৃষাণী ও তাদের পরিবারের লোকজন। আর শুকানে হলেই বস্তায় ভরে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে গোলায় তুলতে।
শনি হাওর পাড়ের জয়নগর গ্রামের পাশে প্রখর রোদের মধ্যে ধান শুকানোর খলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক সাদেক আলী। কথা হয় তার সাথে। তিনি জানান, চার ভাইয়ের যৌথ পরিবার। মাসহ পরিবারের সংখ্যা ২০ জন, সবাই যোগ দিয়েছে কাজে। পরিবারের মধ্যে বড় ভাইয়ের তিন মেয়ে ও এক ছেলে কলেজে পড়ে। আর বাকিরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। বছরে পরিবারের খাবারের জন্য ১২০-১৩০ মণ ধানের প্রয়োজন পড়ে। জমি আছে ১৬ কিয়ার (৩০ শতাংশে এক কিয়ার)।
তিনি আরও জানান, গত বছর ২৮,২৯ চাষাবাদ করেছিলাম ১৬ কিয়ার (৩০ শতাংশে এক কিয়ার) জমিতে। শিলা বৃষ্টি আর বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হলেও প্রতি কিয়ারে ৬ মণ করে সর্ব শেষে মোট ৭০ মণ ধান পেয়েছিলেন। আমাদের কৃষকদের অবস্থা হল বেশী ধান উৎপাদন হলে কৃষকরা ধনী আর ক্ষতিতে এক বারে ফকির। কারণ এই ধানের উৎপাদনের ওপর আমাদের সারা বছরের খোড়াকসহ পরিবারের সকল খরচ সব এর থেকেই চলে।
সাদেক আলী জানায়, এ বছর তিনটি জাতের ধানের (ঝলক ১০ কিয়ার, সুরবী ৪ কিয়ার ব্যাক-২ চার কিয়ার) চাষাবাদ করেছি। এতে প্রায় ৩শ মণ ধান হয়েছে। যা গত দুই বছরের চেয়ে বেশি। এই পযর্ন্ত সম্পূর্ণ ধান কাটা শেষ হয়েছে। এখন রোদে শুকানোর কাজ করছেন। প্রতি বছরেই আগাম পাহাড়ি ঢলের পানি আসার আশঙ্কায় উৎদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়। এসময় কৃষকদের মধ্যে দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। কিন্তু এ বছর হয়েছে উল্টো এখনও পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। যার ফলে দুশ্চিন্তা মুক্ত এ বছরের এই সময়টা শেষ হচ্ছে। তবে হাওরের ঝাঙ্গালগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। পাকা করা হলে আমাদের চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধান পরিবহনে কষ্ট, সময় ও টাকার অপচয় কম হবে।
একই গ্রামের কৃষক আকবর আলী। তার পরিবার সদস্য ৬ জন। এক মেয়ে কলেজে পড়াশোনা করে। এ বছর ৬০ কিয়ার জমিতে ব্রি ২৮,২৯ ধানের চাষ করেছেন তিনি। এবার তার বেশি ক্ষতি হয়েছে। তার ২১ কিয়ার (৩০ শতাংশে এক কিয়ার) জমির ধান তিনি কাটেন নি কারণ জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায়। বাকি জমিতে ধান ভাল হয়েছে আর সেগুলোই কেটেছেন, মাড়াই আর শুকানোর কাজ করছেন তিনিসহ তার পরিবারের সদস্যরা মিলে।
আকবর আলীর ক্ষতি হলেও হাওরাঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ একবারেই কম। অন্যান্য কৃষকের এবার ফলন ভাল হয়েছে।
তাই সুখের কথা শুধু সাদেক আলীর নয় সুনামগঞ্জের চার লাখ কৃষক পরিবারের। এবার জেলার ১২টি উপজেলার ছোট বড় ১৫৪টি হাওরের চার লাখ কৃষক পরিবারে বৈশাখের আমেজ এবার মহা খুশিতে ব্যস্থায় সময় পার করছেন।
টাংগুয়ার হাওরপারের কৃষকরা জানান, গত ২০১৭-১৮ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর গত বছর ২০২২ সালের এপ্রিলেও পাহাড়ি ঢলে বেশ কয়েকটি হাওরে ফসল হানি ঘটে। এরপর জুন মাসের ভয়াবহ বন্যায় গোলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এবার কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই ধান গোলায় তুলতে পারছেন হাওরাঞ্চলে লাখ লাখ কৃষক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাওরাঞ্চলের হাওরগুলোতে বাম্পার ফলন হলেও দিন হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির ধান। বেশি লাভের আশায় কৃষকরা হাওরে দেশী জাতের ধানের চাষাবাদ করছেন না। ফলে দিন দিন হাইব্রিড জাতীয় ধানের দখলে যাচ্ছে জেলার ১৫৪টি ছোট বড় হাওর। এ কারণে হাওর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির সুস্বাদু ও মজাদার ধান (বেগুনবিচি, লাখাই, টেফি, লাট্টাশইল, গছি,বোরো,আছান, রাতা,বাশফুল প্রভৃতি)। এরপরও এই এক ফসলী ধানের উৎপাদন বেশি হলেই কৃষক মহা খুশি আর ধনী, আর ধানের ক্ষতি হলে ফকির।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১২টি উপজেলার ছোট বড় ১৫৪টি হাওর ও বিলে এবার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। চলতি বছর হাইব্রিড ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর, উচ্চ ফলনশীল এক লাখ ৬০ হাজার ৫৬৫ হেক্টর ও স্থানীয় এক হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এবার ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৩ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন আরও ১০ হাজার মেট্রিক টন বেশি হবে। ৩০ টাকা কেজি ধরে উৎপাদিত এই ধানের মূল্য ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এদিকে, হাওরে ধান কাটার জন্য শ্রমিকের সঙ্গে ৭৭৬টি হারভেস্টার রয়েছে। এ কারণে দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯০ ভাগ জমির (১ লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর) ধান কাটা হয়েছে। হাওরে ধান কাটা শেষ হতে আরও এক সাপ্তাহ লাগবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, হাওরে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রত্যাশার চেয়ে এবার বেশি ধান উৎপাদন হওয়ার কৃষকেরা মনে সুখে ধান গোলায় তুলে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। শুরু থেকে কৃষকদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।