১৭ এপ্রিল ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : বঙ্গবাজার ও ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে আগুন লাগার পেছনে কোনো নাশকতার আলামত এখনও খুঁজে পায়নি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি। যদিও এসব আগুনের পেছনে আসলে কী আছে- তা খুঁজে বের করতে গত শনিবার ইতোমধ্যেই পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুন। তবে এ পর্যন্ত সেরকম কোনো তথ্যের খোঁজ পায়নি পুলিশ। উদঘাটন হয়নি আগুন লাগার কারণ।
বঙ্গবাজার ও নিউ সুপার মার্কেটে প্রায় একই সময় ভোরে আগুন লেগেছে। এসব কি কাকতালীয়, দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত- তা নিয়ে গোলক ধাঁধায় পড়েছে খোদ প্রশাসনও। তদন্তেও সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ তদন্ত শুরু হলেও কুলকিনারা হচ্ছে না।
তবে এসব আগুনের পেছনে কারও হাত নেই বা এসব আগুন নিছক দুর্ঘটনা বলে মানতে নারাজ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। তাদের সরল প্রশ্ন, ‘তাহলে ঈদের আগেই মার্কেটগুলো জ্বলছে কেন? এসব মার্কেট তো গত বছরও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কই, তখন তো পুড়ল না?’
এদিকে বঙ্গবাজারের বা নিউ সুপার মার্কেটের আগুনের পেছনে এ পর্যন্ত কোনো নাশকতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির একাধিক সদস্য। তবে এসব আগুনের পেছনে নাশকতা নেই বলে তারা নিশ্চিতও করছেন না। বলছেন, ‘তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে বলা যাবে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘রবিবার পর্যন্ত নাশকতার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।’
কেন আগুন লাগল, তা তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা ঢাকা টাইমসকে আরও বলেন, ‘তদন্ত শেষে আগুনের পেছনে কি আছে তা স্পষ্ট হবে। তখনই ধরা পড়বে, এটি নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা।’
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গবাজার ও নিউ সুপার মার্কেটে আগুনের খবর ফায়ার সার্ভিসকে যারা দিয়েছেন তাদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। কীভাবে কখন তারা আগুন দেখলেন- সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে একাধিকবার এসব প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। এছাড়া ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসি টিভির ফুটেজও ঘাটা হচ্ছে। এসব ফুটেজ থেকে নাশকতার কোনো তথ্য মিলতেও পারে, এই ধারণা থেকেই সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
২৭ ঘণ্টা পর নিভল নিউ সুপার মার্কেটের আগুন
রাজধানীর ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে লাগা আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপিত হয়েছে। গতকাল সকাল ৯টায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করে মার্কেটটি পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাজাহান শিকদার।
তিনি বলেন, ‘শনিবার সকালেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল। তারপর পুড়ে যাওয়া দোকানগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছিল। রবিবার সকাল ৯টায় আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়েছে। আমরা পুলিশের কাছে ভবন বুঝিয়ে দিয়েছি। এখন আর আগুনের কোনও আলামত নেই। আমরা আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করেছি।’
নিউমার্কেট খুলেছে, তদন্ত কমিটি গঠন
ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল নিউমার্কেট। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ মার্কেট খুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ডিপিডিসির সঙ্গে কথা বলে অনেক কষ্টের পর বেলা ১১টা থেকে নিউমার্কেটে বিদ্যুৎসংযোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর মার্কেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মার্কেট খুলে দেওয়ার পরপরই দোকানিরা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বলে সরজমিনে দেখা গেছে। তবে মানুষের হাঁটাচলার জায়গায় যারা মালামাল রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন, তাদের দোকানের বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা নিউমার্কেট এলাকার নিউ সুপার মার্কেটে সংগঠিত অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গতকাল করপোরেশনের সচিব আকরামুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। কমিটিকে আগামী ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ডিএসসিসির অঞ্চল-১ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মেরিনা নাজনীনকে আহ্বায়ক এবং প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা আকন্দ মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দীনকে সদস্য সচিব করে এই কমিটি গঠন করা হয়।
ঈদের আগেই শেষ সম্বলটুকু শেষ
রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেটে পুরো রমজান মাসে যে পরিমাণ বেচাকেনা হয়েছে, তার প্রায় সমান কেনাবেচা হয়েছে গত শুক্রবার। ঢাকায় বাইরে ঈদ করতে যাওয়া অনেকেই কেনাকাটার জন্য এই দিনটা রেখেছিলেন। ব্যবসায়ীরাও ভোর ৪টা পর্যন্ত জমিয়ে বিক্রি করেছেন। পরদিন শনিবার সরকারি ছুটির দিন থাকায় বেচাবিক্রি বেশি পরিমাণ হবে- এমন আশায় অনেক ব্যবসায়ী ক্যাশে টাকা রেখেই চলে যান বাসায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আকাশ ভেঙে পড়ে মাথায়। বিছানায় শুয়ে চোখ লেগে আসার আগেই অন্য ব্যবসায়ীদের ফোন পান তারা। শোনা যায়, কান্না আর চিৎকার। প্রায় একই সময় একই ধরনের ঘটনা ঘটে গত ৪ এপ্রিল বঙ্গবাজারে।
নিউ সুপার মার্কেটের তিন তলায় মিম এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্লাস্টিকসামগ্রীর দোকান ছিল মো. মিজানের। শুক্রবার রাত ৩টার দিকে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরেছিলেন তিনি। সেহরি খেয়ে ভোর হওয়ার আগেই খবর পান মার্কেটে আগুন লেগেছে। দ্রুত এসে দেখেন, তার দোকান আগুনে জ্বলছে।
তিনি বলেন, ‘তিন তলায় আমার প্লাস্টিকের গুদাম। ৪০ লাখ টাকার মালামাল ছিল, একটি সুতাও বের করতে পারিনি। আগুনে সব পুড়ে গেছে। ২০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ আছে, কর্মচারী আছে ১৩ জন। আমি কীভাবে কী করব! প্লাস্টিকের পানির বোতল, জগ, বাটি এসব আমার কাছ থেকে পাইকারি হিসেবে নেয় আশপাশের ব্যবসায়ীরা। ঈদের জন্য মাল তুলেছিলাম। ঈদের আগে একের পর এক ব্যবসায়ীদেরই এমন সর্বনাশ হচ্ছে কেন?’
প্রসঙ্গত, গত শনিবার ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেটে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিসের ৩০টি ইউনিট নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ২৭ ঘণ্টা পর গতকাল সকাল ৯টায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপন করতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। আর গত ৪ এপ্রিল ভোর ৬টা ১০ মিনিটে বঙ্গবাজারে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। পুড়ে ছাই হয়ে যায় গোটা মার্কেট। মুহূর্তেই পথে বসে যান ব্যবসায়ীরা। ঈদের আগেই শেষ হয়ে যায় তাদের শেষ সম্বলটুকু।