৯ এপ্রিল ২০২৩
শাহিদ হাতিমী : আজ ১৭ রামাজান। ঈমানী চেতনায় শান দেওয়ার দিন। প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে আজকের দিনে ঐতিহাসিক বদর দিবস সংঘটিত হয়েছিল। মানবেতিহাসের বিস্ময়কর এক যুদ্ধের নাম বদর। এটা ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ। প্রতিবছর সতেরো রামাজানে আমরা ফিরে যাই অতীতে। আমাদের চোখে ভাসে ঐতিহাসিক বদর প্রান্তর। আমরা দেখতে পাই ৩১৩ জন সাহাবীর সৈনিক জীবন। রাসুলুল্লাহ সা. এর অনন্য রণকৌশল। মহান আল্লাহর অপার নুসরাত।
৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তথা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রামাজানে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক এক যুদ্ধ। প্রতিপক্ষ ছিল মক্কার মুশরিক ও মদিনার মুসলিমগণ। এতে মুসলমানদের সেনা সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। এই যুদ্ধে মুসলমানরা সংখ্যায় কম হয়েও কাফিরদের বিশাল বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করেন। কুরআনুল কারিমে এই যুদ্ধকে সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী যুদ্ধ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আজকের (১৭ রমজান, ২ হিজরী, ১৩মার্চ, ৬২৪ খৃষ্টাব্দ) এ দিবস অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রথম বিজয়ের দিন। পৃথিবীতে ইসলাম থাকবে কিনা? মুসলমানরা পৃথিবীর নেতৃত্ব দেবে নাকি কাফিররা নেতৃত্ব দেবে তা নির্ধারিত হয়েছিল এ দিনে । হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রামাযান মাসের এই দিনে বদর প্রান্তরে ইসলামের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধে মহান রাব্বুল আলামীনের সরাসরি সাহায্য দানের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজয় হয় । তাই এ দিবসকে ইয়াওমুল ফুরকান (সত্য মিথ্যার পার্থক্যের দিন) বলা হয় ।
আরবের বদর নামক স্থানে কাফেরদের সাথে মুসলমানদের প্রথম সংঘটিত যুদ্ধে কুরাইশ-কাফের বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করে এবং তারা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায় । ৭০ জন কাফের নিহত ও ৭০ জন বন্দি হয়। অপরদিকে মুসলমানদের মধ্য হতে ১৪ জন শহীদ হন। বদর যুদ্ধের মাধ্যমে সত্য মিথ্যার পার্থক্য সুনিশ্চিত হয়েছে । যুদ্ধের পূর্বে ৬২৩ থেকে ৬২৪ সালের মধ্যে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে বেশ কিছু খন্ডযুদ্ধ হয়। বদর ছিল দুই বাহিনীর মধ্যে প্রথম বড় আকারের যুদ্ধ। যুদ্ধে সুসংগঠিত মুসলিমরা মক্কার সৈনিকদের সারি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়। যুদ্ধে মুসলিমদের প্রধান প্রতিপক্ষ আবু জাহল নিহত হয়। মুসলিমদের বিজয়ে অন্যদের কাছে বার্তা পৌছায় যে মুসলিমরা আরবে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং এর ফলে নেতা হিসেবে মুহাম্মাদ সা. এর অবস্থান দৃঢ় হয়। যুদ্ধে অল্পসংখ্যক মুসলিম সৈন্যবাহিনী বেশি সংখ্যক কাফের সৈন্যবাহিনীর ওপর বিজয় অর্জন করেছিল। সূরা আল ইমরানের ১৩ নং আয়াতে আল্লাহ উভয় দলের পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে “এদের মধ্যকার একটি দল আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে আর অপর দল ছিল কাফির।”
বস্তুত মহানবী সা. যুদ্ধপ্রবণ মানুষ ছিলেন না। কিন্তু তৎকালীন অমুসলিম শক্তির নানামুখী ষড়যন্ত্র, নির্যাতন আর ইসলামকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়ার অপপ্রয়াস মোকাবিলায় রাসুলে পাক সা.-এর হাতে যুদ্ধ ব্যতীত কোনো বিকল্প ছিল না। তাওহিদ ও রেসালতের প্রতি আনুগত্যকারী মুহাজির ও আনসারদের সমন্বয়ে অসম সাহসী সাহাবায়ে কেরামের এক প্রত্যয়দীপ্ত বাহিনী বিশ্বনবীর সা. নেতৃত্বে নজিরবিহীন বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন বদর প্রান্তরে। মহানবী সা. ও সাহাবায়ে কেরামের সাথী হয়েছিল মহান আল্লাহপাক প্রদত্ত রহমত, মদদ ও সুসংবাদ সংবলিত বার্তাবলির অমোঘ শক্তিমত্তা। পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন- ‘ওয়ালাকাদ নাসারাকুমুল্লাহু বিবাদরিন ওয়া আন্তুম আযিল্লা’। অর্থাৎ সুনিশ্চিতভাবেই মহান আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন বদরের যুদ্ধে, যেখানে তোমরা ছিলে ক্ষীণ-শক্তির দুর্বল এক পক্ষ।
মুসলমানদের সংখ্যা, যুদ্ধাস্ত্র, সমর উপকরণ, শক্তিমত্তা ও সমর-কৌশলের চাইতেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান প্রভুর সাহায্য ও রহমতের বিষয়; যার ওপর প্রতিটি মুমিন সর্বাবস্থায় ভরসা করবে, নির্ভরতা পাবে। আল্লাহপাক সে জন্যই বলেছেন, ‘ওয়া কানা হাক্কান আলাইনা নাসরুল মুমিনিন’। অর্থাৎ মোমেনদের সহযোগিতা প্রদান করা আমি আল্লাহর জন্য অবশ্য কর্তব্য।
মূলত রামাজান নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার মাস। রামাজানে সাহাবায়ে কেরামগণ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করার পাশাপাশি নফসপূঁজারি তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে যেভাবে নিজেদেরকে আত্মনিয়োজিত করেছেন, ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী মুসলমান হিসেবে কবুল করে নিয়েছেন। আমাদের উচিত তাদের অনুসরণ করা। যদি আমরা সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শে উজ্জীবিত হতে পারি, অনুসরণ করতে পারি তবেই আমরা ইহ-পরকালে সফলতা লাভ করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।
(লেখক : জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, আজকের সিলেট ডটকম)