৩ এপ্রিল ২০২৩


গলার কাঁটা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে প্রশাসনের শীর্ষ পদে। এ নিয়ে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা কাজ করছে। এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে একাধিক অতিরিক্ত ও উপ-সচিব জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, অবসরযোগ্য সচিবদের অনেককেই আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে একই পদে। এতে সচিব পদমর্যাদায় পদোন্নতি পেতে যাওয়া বা পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তারা বেকায়দায় পড়ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাকরির সাধারণ শর্ত অনুযায়ী আগামী আট মাসের মধ্যে ৩২ জন সচিবের অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে নির্বাচনকালীন এই সময়ে ওই ৩২ জন সচিবের বেশিরভাগকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। কেননা এই সচিবদের অভিজ্ঞতা নির্বাচনকালীন অনেক জটিল পরিস্থিতি উত্তোরণে সহায়ক হতে পারে, এমন ধারণা থেকেই তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনে রেখে দেওয়ার বিষয় ভাবা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।

জনপ্রশাসনে পর্যাপ্ত পদ না থাকলেও গত কয়েক বছরে বেশ কিছু কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফলে পদ না থাকায় পদোন্নতি পাওয়ার পরও অনেক কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ধরে এক ধাপ নিচের পদে কাজ করতে হচ্ছে। এ কারণে কাউকে কাউকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়মিতদের মধ্যে সচিব পদোন্নতি পাওয়ার মতো যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন। অথচ তাদের বাদ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। উপযুক্ত কর্মকর্তা না থাকলে তখন চুক্তিতে নিয়োগ দিলে প্রশ্ন উঠত না।

এ বিষয়ে কথা হয়েছে একাধিক সাবেক সচিব ও প্রশাসনের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তারাও অবসরযোগ্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছেন।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আবু আলম শহিদ খান বলেন, ‘আমি মনে করি, যারা পদোন্নতির যোগ্য, তাদের পদোন্নতি দেওয়া উচিত। পদোন্নতিযোগ্যদের বঞ্চিত করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে প্রশাসনে নানামুখী সমস্যা তৈরি হয়। পদোন্নতি প্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়তে থাকে।’ চাকরিরত অবস্থায় যৌক্তিক কারণ ছাড়া কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান ছিল বলেও জানান প্রশাসনের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

ঢালাওভাবে শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রশাসনে কর্মরত পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা নষ্ট করে বলেও মনে করেন আবু আলম শহিদ খান।

এদিকে আগামী ৮ মাসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ ৩২ জন সচিব অবসরে যাবেন। তাদের অনেককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে। এতে সরকারের আস্থাভাজন পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও দুশ্চিন্তার ছাপ পড়েছে। তারা এ বিষয়ে নানাভাবে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ প্রদর্শন করছেন অতিরিক্ত যোগ্যতাও।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান (সচিব) পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বর্তমানে ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের সচিব হিসেবে বিবেচনায় আনা হচ্ছে। এর ফাঁকেও প্রশাসনে শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ চলছে।

অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রশাসনে বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অবসরের বিষয় নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা দ্বিধাদ্বন্দে পড়েছেন। অভিজ্ঞতা দিয়ে বিভিন্ন জটিলতা ও পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সরকারকে এ পর্যন্ত টেনে নিয়ে আসা এসব কর্মকর্তাকে নির্বাচনের আগে নিষ্ক্রিয় দেখতে চায় না সরকার। এ কারণে অভিজ্ঞ ও সরকারের আস্থাভাজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকের রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই চুক্তির ধারাবাহিকতা থাকতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অতীতে কোনো প্রকল্প বা বিশেষ কারণে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে এক বছর চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হতো। কিন্তু এখন সেই অবস্থা নেই। বিশেষ যৌক্তিক কারণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একাধিক সচিবকে এক বা দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মেয়াদ শেষে হয়তো কারও কারও চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতাই প্রযোজ্য হচ্ছে।

অতীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পরিহার করার জন্য ২০১৪ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি আধা সরকারি পত্রও (ডিও লেটার) দিয়েছিলেন তিনি।

তাতে লিখেছিলেন, অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সরকার কাউকে যদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে, সেক্ষেত্রে ক্যাডারবহির্ভূত বিশেষ পদে তাদের নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এটি কার্যকর হলে নিয়মিত পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তারা শীর্ষ পদে আসীন হতে পারবেন। কোনো পক্ষের আর হতাশা ও ক্ষোভ থাকবে না। তবে তার এই প্রস্তাবটি কার্যকর রূপ পায়নি।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে ২০১৪ সালে দেওয়া পে-কমিশনের সুপারিশেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা হয়। সে সুপারিশও কার্যকর হয়নি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে শীর্ষ পদে সামরিক, বেসামরিক ও নাগরিকদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে কর্মরত ৮৫ কর্মকর্তা। এর মধ্যে চুক্তিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, সাবেক সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, সাবেক সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার, সাবেক সচিব সম্পদ বড়ুয়া; সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আখতার হোসেন, সাবেক সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, সাবেক সিনিয়র সচিব শেখ ইউসুফ হারুন, লোকমান হোসেন মিয়া, সাবেক সচিব ওয়াহিদুল ইসলাম খান, প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, মো. মোকাম্মেল হোসেন, কাজী ওয়াছি উদ্দিন, আনিছুর রহমান মিয়া, জয়নুল বারী প্রমুখ। এ ছাড়াও পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার (সচিব পদমর্যাদা) নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সচিব পর্যায়ে চুক্তিতে রয়েছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম ও মাশফী বিনতে শামস্, রাষ্ট্রদূত পদে মো. আবু জাফর, কামরুল আহসান, মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, শাহাবুদ্দিন আহমদ ও জাভেদ পাটোয়ারী।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যারা প্রশাসনে শীর্ষ পদে নিয়োগ পাবেন তাদের অনেকেই নির্বাচনের পরেও দায়িত্বে থাকবেন।

শেয়ার করুন