১৯ জুলাই ২০১৭


গোয়াইনঘাটে সড়কের বেহাল দশা, প্রকট জনদুর্ভোগ

শেয়ার করুন

গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি : গোয়াইনঘাটের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিন থেকে রক্ষণাব্বেণ কিংবা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিম্নমানের কাজ করার কারণে উপজেলার সবকটি সড়ক, মহাসড়কে যান চলাচলে প্রতিনিয়ত প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে।

সবকটি সড়কে হাজার হাজার ছোট বড় গর্ত, খনাখন্দ এবং ভঙ্গুর প্রতিচ্ছবি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিন এই উপজেলার প্রকৃতি কন্যা জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল সোয়াম ফরেষ্ট, পান্তুমাই ও জাফলং ফাটাছড়া ঝর্ণা, জুগিরকান্দি জলারবন সহ সবকটি পর্যটন স্পর্টে প্রতিদিন ঘুরতে আসা হাজার হাজার পর্যটক দর্শনার্থি সহ উপজেলাবাসীকে ভোগতে হয় অবর্ণনিয় দুর্ভোগ।

সড়ক, মহাসড়ক সমূহের রক্ষনাব্বেণ, মেরামত না হওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে পর্যটক, যাত্রীবাহি বাস, পাথর ও মালবাহী ট্রাক সমূহ। এতে করে দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে পঙ্গুত্ববরণ এমনকি মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সড়ক সমূহের ভঙ্গুর, খনাখন্দ এবং গর্তময় অবস্থার কারণে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।

সরজমিন উপজেলার সবকটি সড়কে পরিদর্শন কালে এমন দুর্ভোগ ভোগান্তির চিত্র চোখে পড়ে। এসব যাতায়াত দুর্ভোগের শিকার যাত্রী পথচারীরা সওজ, এলজিইডি এবং সরকারের সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উধাসীনতায় ধিক্কার জানান।

গোয়াইনঘাট স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট ১৫২কিলোঃমিটার রাস্থা পাকা রয়েছে। সড়ক সমূহ হল, গোয়াইনঘাট-সালুটিকর ২৪, গোয়াইনঘাট-রাধানগর জাফলং ৯.১৫০, বঙ্গবীর-হাদারপার ০৭, পিরিজ-গোনারহাট ১৩.৫০, হাতিরপাড়া-মানিকগঞ্জ ফতেপুর ভায়া ডৌবাড়ী ১৩.৫০, লাফনাউট-বাঘের সড়ক ৭.১৬০, হরিপুর-ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ৯, আটলীহাই-নাইন্দাহাওর ৩.৫০, খাগাইল হায়দরী বাজার-তোয়াকুল বাজার ৩.৫০, গোয়াইনঘাট জি.সি-সালুটিকর বাজার, নন্দিরগাঁও ইউ.পি অফিস ভায়া জলুরমুখ বাজার রোড ৩.৫০ কিলোমিটারসহ ৪০টিরও বেশি তিন শ্রেণীর পাকা রাস্থা রয়েছে। যার মোট দৈর্ঘ্য ১৫২ কিলোমিটার।

সরজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, তিন শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ উপজেলার সবকটি রাস্থা ভাঙাচোরা, যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে সবগুলো রাস্থার এমন দশা ঘটেছে। কোন কোন রাস্থায় কাজ হলেও অত্যান্ত নিম্নমানের কাজ হওয়ায় রাস্থাগুলো সহজেই ভেঙ্গে গিয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার চালকরা এখন প্রধান প্রধান সড়ক ব্যতিরেখে ইউ/পি ও গ্রামীণ রাস্থা ব্যবহার করে জেলা সদরের সাথে যানচলাচল অব্যাহত রেখেছেন। গোয়াইনঘাট উপজেলার সদর থেকে সিলেট সদরের সাথে যোগাযোগের এখন একমাত্র রাস্থা হাতিরপাড়া-মানিকগঞ্জ ভায়া ডৌবাড়ী।

গোয়াইনঘাট সালুটিকর ২৪ কিলোমিটার রাস্থার মেরামত কাজ ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল উদ্বোধন করা হলেও আজ পর্যন্ত শিকিভাগ কাজও শেষ হয়নি উপরোন্তু সমস্থ রাস্থাঘাট এক সাথে ভেঙ্গে গর্ত করে ফেলা রাখায় যান চলাচলতো বিঘিœত হচ্ছেই জনসাধারণও রাস্থায় হাটতে পারছেন না। এলাকাবাসী রাস্থাটি দ্রুত সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলেও কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া উক্ত রাস্থায় অত্যান্ত নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে কাজ হচ্ছে এমন অভিযোগও জনসাধারণের রয়েছে। প্রতিদিন দেশের পদস্থ কর্মকর্তারা গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাস্থাঘাটের এত বেহাল দশা এটাকি কেউ দেখে না? পর্যটকরা রাস্থার কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন, তাদের দুর-দুরান্ত থেকে আনন্দ ভ্রমণের আশা যেন নিরানন্দে পরিণত হয়। আর এলাকাবাসীর এই দুর্ভোগ দেখার জন্য কেউ নেই।

একদিকে ভাঙ্গাচুরা রাস্থায় ঝুকিপূর্ণ ভাবে যাতায়াত অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়ায় তারা অতিষ্ঠ রয়েছেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের কাজের কারণে গোয়াইনঘাট-রাধানগর রাস্থা আলমনগর পর্যন্ত মেরামত কাজ শেষ হওয়ায় ০২ মাস না যেতেই খনাখন্দ গর্ত সৃষ্টির ফলে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। ফলে এই রাস্থা নিয়ে এলাকাবাসী সহ যারা আশাবাদী ছিলেন তারা সবাই হতাশ এবং ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

সরজমিনকালে দেখা যায়, সবকটি রাস্থাই যেন এতিমের ভাগ্যবরণ করছে। গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়কের নিয়াগুল এলাকায় দেখা যায় সড়কটির নিযুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মাটি মিশ্রিত পাথর এবং ডাস্টের পরিবর্তে বালু মিশ্রিত মাটি দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। কাজ চলাকালে নির্মাণ সামগ্রীর ছবি তুললে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিযুক্ত আবুল হোসেন নামক এসে ছবি তোলার কারণ জানতে চান।

রাস্থা মেরামতে অনিয়ম দুর্র্নীতির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং উপজেলা প্রকৌশলীর উপর দায় চাপিয়ে বলেন, উনাদের তদারকিতে কাজ করছি।

এব্যাপারে কথা হলে গোয়াইনঘাটের নিয়াগুলের বাসিন্দা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, গোয়াইনঘাট-সালুটিকর পর্যন্ত সড়কটির বেহাল দশা যেন কারোও চোখে পড়ছে না। মেরামতের নামে জনদুর্ভোগ বাড়ানো হয়েছে। ঠিকাদার ১দিন কাজ করলে ১মাস কাজ বন্ধ রাখে। এভাবে কাজ করলে কয় বৎসরে এই সড়ক যাতায়াত উপযোগী হবে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

গুরুকচি এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রনেতা জানান, উপজেলা প্রকৌশলী এবং তাদের নিযুক্ত কর্তাব্যক্তিদের মোটা অংকের বখরা দিয়ে খুশি করে এমন মহা দুর্নীতি বাস্থবায়িত হচ্ছে। কলেজ ছাত্র শাহিন আহমদ বলেন, গোয়াইনঘাট থেকে ০২ কিলোমিটার দূরত্বে গোয়াইনঘাট কলেজের অবস্থান। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সমস্থ রাস্থাটি একসাথে ভেঙ্গে ফেলে রাখার কারণে যানবাহন জনচলাচল চরম ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছেন এলাকাবাসী। রাস্থা বেহাল দশার কারণে কলেজে অধ্যয়নরত সহস্রাধিক শিক্ষার্থী সহ উপজেলাবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

৭নং নন্দিরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এস. কামরুল হাসান আমিরুল জানান, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সালুটিকর গোয়াইনঘাট সড়কের কাজ পাওয়ার পর কাজের মেয়াদও গত জুনে শেষ হয়ে গেছে। অথচ এই সময়ে ৩৫ ভাগ কাজও সম্পন্ন হয়নি। যা করা হয়েছে তা অত্যান্ত নিম্নমাণের এবং সিংহভাগই ভেঙ্গে গেছে। আমার ইউনিয়নের উপর দিয়ে উক্ত রাস্থার ৩ কিলোমিটার মেরামত করা হয়েছে, তাও আবার ভেঙ্গে গিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। রাস্থা মেরামতের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উক্ত রাস্থায় আর.সি.সি’র ঢালাই সমূহ উপড়ে ফেলার কারণে বৃষ্টিতে সড়কের ভাল স্থানটাও ভেঙ্গে গিয়ে পথচারী যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। প্রায়ই যানবাহন দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

এব্যাপারে কথা হলে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রকৌশলী ফখরুল ইসলাম জানান, উপজেলার সবকটি সড়কের সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট দফতরকে অবহিত করা হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে উপজেলার রাস্থা সমূহ বিনষ্টের কারণ।

গোয়াইনঘাট-সালুটিকর রাস্থার অবস্থা জানতে চাইলে তিনি জানান, মেয়াদ শেষ হয়েছে, মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও করা হয়েছে, আশা করা যায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঐ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উক্ত রাস্থার কাজ করা হবে।

 

(আজকের সিলেট/১৯ জুলাই/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন