১১ মার্চ ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। প্রতিবছরের মতোই কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে এক মাস আগে থেকেই অকারণে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। এমন পরিস্থিতিতে বাজার দেখভালকারী সরকারি দপ্তরগুলো থেকে পাওয়া প্রতিবেদনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে মূল্যবৃদ্ধির কারসাজি ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সরকারের নির্দেশে নকড়া নজরদারিতে রেখেছে গোটা বাজার ব্যবস্থা।
এছাড়া রমজানের আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় ১৫টি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে সরকার। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ভোগ্যপণ্য আমদানির বিষয়টিও নজরদারিতে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বিভিন্ন সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুচরা বাজার থেকে শুরু করে দেশের পাইকারি মোকামগুলোয় অভিযান চালাবে, যাতে রমজানকে পুঁজি করে কারসাজির মাধ্যমে কেউ অতি মুনাফা লুটতে না পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রমজান ঘিরে বাজার পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিংয়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে সরকারের ১০টি সংস্থা মাঠে থাকবে। এছাড়া, যত পর্যায়ে পণ্য হাতবদল হয় তার কোনো পর্যায়েই যাতে পণ্য মজুত না হয় তা নজরদারি করা হচ্ছে। পাশাপাশি, যে বাজারে অনিয়ম পাওয়া যাবে সেই বাজারের কমিটি বাতিলসহ নানা রকম শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। মোট কথা রমজানপূর্ব বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে জিরো টলারেন্স নীতিতে এগোচ্ছে সরকার।
ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন স্তরে চালের যৌক্তিক মূল্য ঠিক করতেও কাজ করছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একটি যৌথ কমিটি। এসব কমিটিকে বাজারে পণ্যের দাম যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সে প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ আকারে পাঠানো হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ই পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে।
রজমান ঘিরে একমাস আগেই বাজারে অস্থিরতা শুরু হলে বিষয়টি সরকারের নজরে আসে। এরপর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশনসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও লাগাম টানতে পারেনি দ্রব্যমূল্যের। সিন্ডিকেটের কব্জা থেকে মুক্ত করতে পারেনি বাজারকে। ফলে ক্রেতা বা ভোক্তার দুর্ভোগ বাড়ছেই। একইসঙ্গে দিন দিন বাজারে বেড়েই চলছে উত্তাপ। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে দেওয়া প্রতিবেদনে বাজারে থাকা নীরব সিন্ডিকেটকে কড়া গোয়েন্দা নজরদারিতে রেখে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে এসব সংস্থাগুলো। তারা একাধিক গোপন রিপোর্টে সরকারকে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীলকারীদের শনাক্ত এবং রমজান ঘিরে বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে আঁকা নীলনকশা ভ-ুল করার এ সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে।
ওইসব গোপন রিপোর্টে বাজারের পরিস্থিতি, পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ থাকার পরও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে আকস্মাৎ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া ও কৃত্রিম সংকটের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া রমজানের আগেই রমজানকেন্দ্রিক পণ্য-দ্রব্য এবং চিনিসহ অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বৃদ্ধির অপকৌশল রুখতে আগাম প্রস্তুতি বা পদক্ষেপ নেওয়ারও জোর সুপারিশ করা হয়।
অন্যদিকে সরকারের নির্দেশ পেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখাসহ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা রমজানপূর্ব বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে সরকারকে গোপন প্রতিবেদন দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বাজারে সিন্ডিকেটের ভয়াবহ বিস্তার এবং ভোক্তার দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনেও বাজার তদারকি বৃদ্ধি এবং নজরদারির সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া, এবারের রমজান সরকারের এই মেয়াদের শেষ রমজান। এ কারণে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখাকে সরকার গুরুত্বসহ নিচ্ছে। যদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ^ মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে বিশ^ব্যাপী। এরপরও রমজানে মানুষকে একটু স্বস্তিতে রাখার বিষয়টি মাথায় রেখে দুই মাস আগে থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে এরইমধ্যে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) সব পক্ষ নিয়ে বৈঠক করেছে। এলসি খোলা নিয়ে যে জটিলতা ছিল তা সহজ করেছে সরকার। রমজান শুরু হওয়ার আগেই বাজারে রমজানে চাহিদা বাড়ে এমন পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের ডাল ও খেজুরের সরবরাহ যাতে ঠিক থাকে তার ওপর নজর রাখা হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘বাজারে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে তদারকি বৃদ্ধি করেছে। ইতোমধ্যেই ব্যবসায়ীসহ অংশীজনদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সভা হয়েছে। আরও কয়েকটি সভা হবে।’
রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে তারা আপ্রাণ চেষ্টা ও ফলপ্রসূ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান ভোক্তার অধিকার আদায়ে লড়াই করে সাম্প্রতি নজরে আসা সরকারি এ সংস্থাটির মহাপরিচালক সফিকুজ্জামান।
রোজার আগেই যেসব পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়া হচ্ছে
সরকার এ বছরও কয়েকটি পণ্যের দাম বেঁধে দিতে চাচ্ছে। সেগুলো হচ্ছে- ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, ছোলা, শুকনো মরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনে, জিরা, আদা ও তেজপাতা। ইতোমধ্যে সয়াবিন তেল, চিনির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে তার সুফল পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৭টি ভোগ্যপণ্যকে নিত্যপ্রয়োজনীয় মনে করা হলেও রোজা সামনে রেখে আপাতত ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ, ছোলা ও খেজুরের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ শুরু হয়েছে। ডলার জটিলতার কারণেই এ বছর আমদানি প্রক্রিয়ায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
শাস্তির ব্যবস্থা
এদিকে যত পর্যায়ে পণ্য হাতবদল হয় তার কোনো পর্যায়েই যাতে সেগুলো মজুত না হয় তা নজরদারি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নজরদারির কাজটি করা হচ্ছে। বাজার মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে এবার নতুন পদক্ষেপ হলো, যে বাজারে পণ্যের দাম লাগাম ছাড়া থাকবে সেই বাজার কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার কমিটি যেহেতু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নেয়, তাই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে দরকার হলে তাদের কমিটির অনুমোদন বাতিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। বাজার কমিটি সক্রিয় থাকলে সেই বাজারে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মজুত করা সম্ভব হবে না।
বাজার স্বাভাবিক রাখতে টিসিবি পণ্য
বাজারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ টিসিবির মাধ্যমে সুলভ মূল্যে বিপণন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এ বছরই প্রথমবার দেশের এক কোটি পরিবারের কাছে কার্ডের মাধ্যমে রমজানের নিত্যপণ্য পৌঁছে দেবে টিসিবি। এর মধ্যদিয়ে কমপক্ষে দেশের পাঁচ কোটি মানুষ উপকৃত হবেন।
তবে এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন, রমজানে কোনো পণ্যের ঘাটতি নাই। পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজার দর নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজার দরের ওপর। সেক্ষেত্রে দেশীয় বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে তা সময়ই বলে দেবে।