৩ মার্চ ২০২৩
খলিলুর রহমান : অতিমাত্রায় ও বিভীষিকাময় শব্দদূষনের শিকার সিলেটের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষজন। শব্দদূষনে রাতদিন কানে তালা। রেগীদের নাভিস্বাস, ছাত্রছাত্রী এমনকি পরীক্ষার্থীদেরও সর্বনাশ। এ কারণেই শিশু কিশোর ও আবাল বৃদ্ধ বণিতা সবার মধ্যে বধিরতা। সবাই যেন কাটাচ্ছেন এক বিভীষিকাময় জীবন। শব্দদূষন সৃষ্টিকারীদের অবাধ স্বাধীনতা সিলেটের জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে দিলেও প্রয়োগ নেই বিধান ও আইনের।
শুধু যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ নয়, রাস্তায় উচ্চশব্দে মাইক বাজানো, কনসার্ট ও গজল মাহফিলের নামে পাড়া-মহল্লায় গভীর রাত অবধি উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে শব্দসন্ত্রাস, সাইলেন্সার খুলে সড়ক কাঁপিয়ে বিকট শব্দে কার-মোটরসাইকেল চালানো ইত্যাকার রকমফের শব্দদূষণের শিকার সিলেটের নাগরিক জীবন। বিভীষিকাময় এই জীবনযাত্রার মধ্য দিয়েই শুক্রবার (৩ মার্চ) সিলেটবাসী কাটিয়েছেন ‘বিশ্ব শ্রবণ দিবস’।
এ বছর দিবটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবার জন্য কানের ও শোনার যত্ন’। শব্দদূষণের মাত্রা স্থানভেদে কেমন হবে তার নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের হিসাব অনুযায়ী- কোনো এলাকায় ৬০ ডেসিবেল মাত্রার বেশি শব্দ হলে তা দূষণের পর্যায়ে পড়বে। শব্দদূষণের গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পরিবেশগতভাবে বিভিন্ন এলাকাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে; নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, শিল্প এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকা। এসব এলাকায় দিন ও রাতভেদে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শব্দদূষণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু এসবের কোনো কার্যকারিতা নেই আমাদের দেশে এবং বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে।
নির্ধারিত বিধি ও নীতিমালা অনুযায়ী- অফিসকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষে শব্দের মাত্রা হবে ৩০-৪০ ডেসিবেল, হাসপাতাল এলাকায় ২০-৩৫ ডেসিবেল, রেস্তোরাঁয় ৪০-৬০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা সহনীয়। ৬০ ডেসিবেলের বেশি শব্দে মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে এবং ১০০ ডেসিবেল শব্দে মানুষ চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। কিন্তু সিলেটে এ নিয়ম মেনে চলার কোনো বালাই নেই।
শব্দদূষণ রোধে সিলেটে মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন মহাসড়কে যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন খুলে নেওয়ার পাশাপাশি চালকদের জরিমানা করে ট্রাফিক পুলিশ, এই পর্যন্তই শেষ। কিন্তু প্রশাসন ও পুরিশ স্টেশনের নাকের ডগায় রাতভর উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে গানবাজনা, গজল ও মাহফিলের অনুমতি দিয়ে থাকে প্রশাসন। অনুমতির সাথে শব্দদূষনের বাধাবাধ্যকার কোনো শর্ত থাকে না। শব্দদূষনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতেও যেখা যায়নি প্রশাসনকে কর্তৃপক্ষকে।
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স’র উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের রাজপথে শব্দদূষণ এবং শব্দদূষণের কারণে রাজপথে কর্মরত পেশাজীবীদের শ্রবণ সমস্যা’ নিয়ে এক গবেষণা জরিপ করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে- সিলেটে দিনের বেশিরভাগ সময় সড়কে কাটানো ৩১ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে শব্দদূষণের কারণে। এর মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার পেশাগত দায়িত্ব পালনে সড়কে থাকা ট্রাফিক পুলিশের ৩১ শতাংশ এই সমস্যায় ভুগছেন। আর প্রায় ৪২ শতাংশ রিকশাচালকের শ্রবণজনিত সমস্যা রয়েছে এই শব্দদূষণের কারণে।
গবেষণা জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে- রিকশাচালক এবং ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াও ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক, ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ দোকানদার, ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বাস-ট্রাক চালক, ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাইভেটকারচালক এবং ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মোটরসাইকেল চালক শ্রবণজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
জরিপে অংশ নেওয়াদের প্রতি চারজনে একজন কানে কম শোনার সমস্যায় ভুগছেন বলে জরিপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রমের পরিচালক ডা. নুরুল হুদা নাঈম শব্দদূষণে শিশুদের বেশি ক্ষতি হয় উল্লেখ করে বলেন, শিশুদের ওপর শব্দদূষণের প্রভাব মারাত্মক। কারণ, তাদের মস্তিষ্ক গঠনের পথে থাকে। শব্দদূষণ এই গঠন বাধাগ্রস্ত করে। শিশুর শেখার ক্ষমতা কমে যায়। কথা বলতে দেরি হয়। আচরণেও প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া শব্দদূষণ বড়দের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩০ ভাগ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। শব্দদূষণের কারণে মানুষ অবসাদে ভোগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, সহিংসতার প্রবণতা বাড়ে।
বিশ্ব শ্রবণ দিবস-এ সিলেটবাসী শব্দদুষন নিরোধ আইন কার্যকর ও প্রয়োগ করার জন্য সরকার ও প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।