২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
খলিলুর রহমান : সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনের এখনো প্রায় অর্ধবছর বাকি। আগামী মে পরবর্তী জুন মাসে হয়তো নির্বাচন হতে পারে। কারণ এরই মধ্যে বর্তমান পরিষদের মেয়াদ উর্ত্তীণ হয়ে যাবে। সিলেট সিটি নির্বাচন অনেকটা দুরে থাকলেও এর মধ্যেই মেয়র পদে প্রার্থীতা নিয়ে শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ। বিএনপি দলীয় বর্তমান মেয়র আসন্ন নির্বাচনে পুনরায় প্রার্থী হবেন কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। দলীয়ভাবে বিএনপির প্রার্থী দেওয়া হবে কি না এ নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। তাই আপাতত সরকার ও সরকারের সহযোগী দলের মধ্যেই চলছে প্রার্থীতা নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বদ্বিতা, তোড়জোড়, প্রচারণা ও মেরুকরণ।
ফলে গত জানুয়ারি মাস থেকেই সরগরম হয়ে ওঠেছে নগরীর নির্বাচনী মাঠ। ইতিমধ্যে নগর ছেয়ে গেছে পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডে। সরকার দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে নিজেদের অনুকুলে বাড়ানোর চেষ্টা করছেন জনসম্পৃক্ততা। মসজিদে মসজিদে ও পাড়া মহল্লায় গিয়ে করছেন নামাজ আদায় ও দোয়া কামনা। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানেও বাড়ছে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি ও অনুদান। গণমাধ্যমও তাদের নিয়ে পার করছে ব্যস্ততম সময়।
সরকার দলের অন্তত একডজন নেতার বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে নগর একবারে সয়লাব। নিজেদের সমর্থকদের দিয়েও তারা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচারণা। পাশপাশি মনোনয়ন লাভে কেন্দ্রে লবিংও চলছে সমানতালে। ফলে তফশিলের আগেই নগরজুড়ে বাজতে শুরু করেছে নির্বাচনী লড়াইয়ের ঢাকঢোল ও দামামা।
এখন পর্যন্ত মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে যারা আলোচনায় এসেছেন তারা হলেন- যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বালাগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিসিকের প্রথম মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান তনয় ডা. আরমান আহমদ শিপলু, মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এটিএম হাসান জেবুল, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ, কেন্দ্র্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক পিপি এডভোকেট মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ, মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য প্রিন্স সদরুজ্জামান চৌধুরী, বাফুফের কার্যনির্বাহী সদস্য ও সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগ নেতা মাহি উদ্দিন আহমদ সেলিম এবং যুবলীগ নেতা লয়লুছ আহমদ চৌধুরী।
তারা সকলেই পৃথক পৃথক প্রার্থীতা ঘোষনা করে নগরজুড়ে চষে বেড়াতে শুরু করেছেন। দোয়া ও আশীর্বাদ চাইছেন দলের নেতাকর্মীসহ শুভাকাঙ্খী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে। করব জিয়ারত, ওলি-ওলিয়ার মাজার জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে যোগ দিয়েও সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছেন তারা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী দিনের স্মাট নগরী গড়ার শ্লোগানেই মুখরিত এখন নগরের পাড়া-মহল্লা ও রাস্তাঘাট।
আওয়ামী লীগ ছাড়াও সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এর প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন সিলেট মহানগর জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম বাবুল ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী নেতা মাহবুবুর রহমান। তবে সিলেট জাতীয় পার্টি সভা করে নজরুল ইসলাম বাবুলকে দলীয় মনোনয়ন দিতে কেন্দ্রের কাছে দাবি জানিয়েছে।
আসন্ন সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি-জামায়াত বা অন্য বড় কোনো রাজনৈতিক দল থেকে প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ হওয়ায় সরকার দল আওয়ামী লীগের মধ্যেই মূলত চলছে মনোনয়ন প্রত্যাশা নিয়ে ডামাঢোল প্রচারনা ও দৌঁড়ঝাপ। গত জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখ থেকে শুরু হওয়া প্রচারণার ধারাবাহিকতায় মাঠ ছাড়ছেন না দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থীই।
মনোনয়ন প্রত্যাশী যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে প্রচারণা চালাচ্ছেন, এমনটা বলে বেড়ালেও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করেন এধরণের কোনো নির্দেশনা এখনো দেননি দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে দলীয় ভাবে প্রার্থী চুড়ান্তের বিষয়ে কেন্দ্র থেকে কোন নির্দেশনা আসেনি বলে বিবৃতিও দিয়েছে মহানগর আওয়ামীলীগ। নির্বাচনের দিনক্ষণ এগিয়ে আসলে দলের হাইকমান্ড অবশ্য একজনকে বাছাই করে মনোনয়ন দেবেন। আর এ মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশায় ডজনখানেক প্রার্থী নিজেদের জানান দিয়ে চলেছেন। তবে গত এক মাসের প্রচার- প্রচারণায় তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে চলে এসেছে বড় ধরণের একটা মেরুকরণ।
ডজনখানেক প্রার্থী প্রচারণায় মাঠে থাকলেও মনোনয়ন প্রত্যাশী দুজনের অনুকুলেই চলে এসেছেন তৃণমূল নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। আর তারা হচ্ছেন প্রয়াত মেয়র কামরানের পুত্র মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আরমান আহমদ শিপলু ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথের আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। বস্তুত এ দুজনের মধ্যেই চলছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মেরুকরণ।
তবে এ দু’জনের মধ্যে কামরান পুত্র ডা. আরমান আহমদ শিপলুর প্রভাব নগরজীবনে অনেক বেশি। নগরবাসীর সুদিনে ও দুর্দিনে প্রয়াত মেয়র কামরানের সরব উপস্থিতি ছিল প্রায় চারদশক ধরে। ছাত্রজীবন ১৯৭৩ সাল থেকেই প্রয়াত মেয়র কামরান ছিলেন একাধারে নগরবাসীর জনপ্রতিনিধি। একাধারে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন নগর বাসীর নির্বাচিত তিন তিনবারের কমিশনার/কাউন্সিলর, ৩ বারের সিলেট পৌরভা চেয়ারম্যান ও একাধারে তিনবারের সিলেট সিটি মেয়র। তাই নগরবাসীর সেবা ও সরকার দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কামরান পরবিারের বিকল্প নেই। সেই হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী কামরান পুত্র আরমানকে তার পিতার চেয়ারে দেখতে চান।
অন্যদিকে, ধনে জনে ও দলীয় কর্মকান্ডে বলীয়ান প্রার্থী আনোয়রুজ্জামান চৌধুরীর অনেকটা পরিচিতি থাকলে মূলত তিনি নগরের বাইরের বাসিন্দা হওয়াতে জনসমর্থনে অনেকটা পিছিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে নেতাকর্মীরা মনে করছেন নগর আওয়ামীলীগের তৃণমূলের কর্মীরা।