১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
শাহিদ হাতিমী : জাতীয় সংসদ থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংসদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করলেও পদত্যাগ করেন নি ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত গণফোরামের দুই এমপি। তারা হলেন মৌভীবাজার-২ আসনের এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও সিলেট-২ আসনের এমপি মোকাব্বাবির খান। তারা দুজন ফ্রন্টের অধীনে গনফোরামের দলীয় প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। মোকাব্বির খান গনফোরামের দলীয় প্রতীক সূর্য নিয়ে নিবাচন করলেও সুলতান মোহাম্মদ মনসুর নির্বাচন করেন বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এই দু’জনেই এক সময় আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। যার ফলে নির্বাচনের পর বিএনপিকে বাদ দিয়েই আগেভাবেই তারা শপথ গ্রহণ করে বিরোধী ফ্রন্টের হয়েও আওয়ামীলীগরে প্রতি আনুগত্য প্রকাশে কোনো কার্পন্য করেননি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগের প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখিয়ে তারা সংসদে নিজ নিজ প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। ফলে আওয়ামী লীগার না হয়েও এই দুই এমপি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার গুডবুকে স্থান করে নিয়েছেন। প্রতিদান স্বরূপ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা দুজন নৌকার মাঝি হতে পারেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষদের ধারণা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুব দূরে নয় । দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে তৎপর হয়ে উঠছেন সংসদ সদস্য পদের প্রাথীরা। তাই বিশেষজ্ঞ মহলের মতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সংসদকে আঁকড়ে ধরা এই দুই এমপি’র আগাম প্রার্থীতা নিয়ে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী ঝড়ো হাওয়া। গুঞ্জন শুরু হয়েছে এই দুই এমপি’র বর্তমান আসন নিয়ে। মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলকে ঘিরে চলছে জল্পনা-কল্পনা। কিন্তু আসনের বর্তমান এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আসন্ন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ইতোমেধ্যে প্রচার প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন।
আজকের সিলেট ডটকম’র সাথে আলাপকালে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার দৃঢ় প্রত্যয় ও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমি আওয়ামীলীগের কর্মী তাই আগামী নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর প্রতীক ‘নৌকা’ নিয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করব। তার বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে তিনি ইতোমধ্যে দলের উপর মহল থেকে গ্রীণ সিগনাল পেয়েছেন।
গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির খান এমপির সিলেট-২ আসনে সবেক এমপি জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে নিয়ে এই গুঞ্জন ঘণীভূত হচ্ছে। এই দুই আসনে নৌকায় উঠতে মরিয়া। এছাড়াও নতুন পুরাতন বেশ ক‘জন প্রার্থী। অবশ্য শেষমেশ এদের যে কেউই এ আসনে আসতে পারেন এমন ধারণা সরকারদলীয় নেতাকর্মীর। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হতে যুক্তরাজ্য থেকে উড়ে সিলেট এসেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে গ্রিন সিগনাল পেয়েছেন বলে তাঁর দাবি। আর এ দাবী সত্যি হয় এবং মেয়র নির্বাচনে যদি তিনি প্রার্থী হন তবে সিলেট-২ আসনের হিসেব থেকে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নাম বাদ যাবে।
স্থানীয় জনগণের অভিপ্রায়, মৌলভীবাজার-২ আসনটি গঠিত শুধু কুলাউড়া উপজেলা নিয়ে। আওয়ামী লীগসহ সব দলের প্রার্থীদের দল বদল কিংবা দল ছেড়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার রেকর্ড আছে এই আসনে। বিগত নির্বাচনে বর্তমান এমপি সুলতান মনসুর আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে প্রার্থী হলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্লোগান ও দোহাই দিয়ে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হন। প্রার্থীদের এমন পল্টি ও স্ববিরোধিতা নিয়ে ভোটাররাও অনেকটা অতিষ্ঠ। তাই আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি নতুন মুখ খোঁজলেও শেষ পর্যন্ত এই আসনে সরকার দল আওয়ামী লীগের টিকেট পেতে পারেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, এমন ধারণাকে উড়িয়ে দিতে পারছেন না রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-আংশিক বালাগঞ্জ) আসনে গত সংসদ নির্বাচনকালীন এমপি ছিলেন জাতীয় পার্টি (এরশাদ)’র ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া। নির্বাচনপূর্ব বিএনপি’র প্রার্থী তাহসীনা রুশদীর মনোনয়ন বাতিল হয়ে গেলে টিকে যান ঐক্যফ্রন্টের আওতাধীন গনফোরামের প্রার্থী মুকাব্বির খান। মুকাব্বরি খান যদিও সিলেট-২ আসনের বাসিন্দা নন, তবুও বিএনপি ও ইলিয়াস আলী সমর্থকদের নেকনজরে গণফোরামের প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যান। নির্বাচন পরবর্তীতে তিনিও সুলতান মোহাম্মদ মনসুরে ন্যায় জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে থাকেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন। তাই আসন্ন নির্বাচনে তিনি উপহার স্বরূপ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
তবে গত নির্বাচনে সংসদ সদস্য হলেও সিলেট-২ আসনের লোকজন নির্বাচনী এলাকায় তাঁর উপস্থিতি ও উন্নয়ন কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক সূত্র। অন্য আসনের বাসিন্দা হওয়ায় স্থানীয় জনসাধারণ ও নেতৃবৃন্দের সাথে যতটুকু মিশে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে নেওয়ার কথা ঠিক ততটুকু ঘনিষ্ঠতা বা সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন নি তিনি। আবার সিলেট-২ আসনের এমপি হওয়ায় নিজ এলাকা সিলেট-৩ আসনের মানুষের জন্য কিছু করতে পারেননি বলে তাঁর নিজ এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ পুঞ্জিভূত হচ্ছে। সঙ্গত কারণে এমপি হিসেবে নিজ এলাকার জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারেননি। যদিও নিজ এলাকার লোকজনের অতি আগ্রহ ছিল তার প্রতি। এবং তিনি নিজেও নিজ এলাকা (সিলেট ৩) আসনের জনগনের জন্য কাজ করতে আগ্রহী।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি মুকাব্বির খান আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক উপহার পচ্ছেন, এটা প্রায় নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে তিনি কোন আসনে প্রার্থী হবেন এটা নিয়ে রয়েছে সংশয়। গত জাতীয় নির্বাচনের বিএনপি প্রার্থী নিয়ে অঘটনের ফলে তিনি নির্বাচিত হলেও এবার হয়তো সেই অঘটন নাও ঘটতে পারে। তাই নিজ এলাকার জনগণের প্রতি জনগনের ভালোবাসা কুড়াতে সিলেট-২ এর বদলে নিজ এলাকা সিলেট-৩ এ নৌকার মাঝি হতে পারেন এমন সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দিতে পারছেন না নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
সংসদ সদস্য (সিলেট-২) মোকাব্বির খানের সাথে আজকের সিলেটের সাথে আলাপ কালেতিনি নিজ এলাকায় প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে প্রার্থী হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে কোন আসনে তাকে প্রাথী করা হবে অথবা কোন প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হবেন সেটা দলীয় সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, দলের সিদ্ধান্তই তার কাছে চুড়ান্ত।