১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩


সাজানো আমদানিতে ১৪ বছর ধরে অর্থপাচার

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অংশীদার প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (এসএওসিএল) বিরুদ্ধে সাজানো আমদানির মাধ্যমে ৪৭২ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ১৪ বছর আগে এই টাকা পাচার করা হয় বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

এরই মধ্যে সম্প্রতি নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে তিন কোটি টাকার বেশি পাচারের অভিযোগ উঠেছে এসএওসিএলের বিরুদ্ধে। এ অর্থ পাচার করা হয়েছে লুব অয়েল আমদানির নামে। যা তদন্তে নেমেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচার করা হচ্ছে, ওই প্রতিষ্ঠানের এক পরিচালক এসএওসিএলেরও পরিচালক। ওই যোগসূত্র ধরেই অর্থপাচার হচ্ছিল নীরবে। তাদের এই পাচারকর্মে কাস্টমসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড ও গতিবিধি নজরদারি করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

জানা গেছে, আট বছর আগে ২০১৪ সালের এ ঘটনায় সম্প্রতি এসএওসিএলের ৪৭২ কোটি টাকার অনিয়ম তথা আত্মসাৎ তদন্ত করে তিন মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এরই মধ্যে নতুন করে প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ।

অভিযোগ উঠেছে, ঋণপত্র বা এলসির কম মূল্যের লুব অয়েল আমদানি করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পুরো টাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে পাচার করা হয়েছে। আমদানি ও রপ্তানিকারক উভয় প্রতিষ্ঠানেই পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন হারুন আল রশিদ নামের একই ব্যক্তি। তবে মুদ্রাপাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে এসএওসিএল বলছে, রাজস্ব কম দেওয়ার জন্যই আন্ডার ইনভয়েসিং করে পণ্য খালাস নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমসে দাখিল করা এক অভিযোগে দেখা যায়, এসএওসিএলের পক্ষে ওই এলসির কাগজপত্রে পরিচালক হিসেবে সই করেন হারুন আল রশিদ। অন্যদিকে যে প্রতিষ্ঠান থেকে লুব অয়েল কেনা হয়েছে সেই মেসার্স ক্যাল ট্রান্সপ্যাক এশিয়াটিক এলএলসির পরিচালকও হারুন আল রশিদ। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৭ ডলার ১৬ সেন্ট ব্যাংকটি চ্যানেলে পরিশোধ করা হলেও মূলত লুব আমদানি করা হয়েছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭ ডলার ৫৩ সেন্ট মূল্যমানের। বাকি ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৯ ডলার ৬২ সেন্ট মূল্যমান হিসেবে বাংলাদেশি টাকায় ৩ কোটি ২ লাখ ৭১ হাজার ৬৬৩ টাকা ৬২ পয়সা পাচার করা হয়েছিল। ওই চালানের লুব অয়েল খালাসের দায়িত্বে ছিল চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকার সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান এম আই চৌধুরী অ্যান্ড কোং (চিটিজি) লিমিটেড।

এক পর্যায়ে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামে চট্টগ্রাম কাস্টমস। তদন্তে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানতে পারে আইএফআইসি ব্যাংকের ০৮০১১৪০১৩৭১৭ নম্বর এলসির বিপরীতে ২০১৪ সালের ১৪ জুন বিল অব এন্ট্রির অনুকূলে (সি-৪৬১৯০) নেট ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৮২ কেজি ১৭০ গ্রাম লুব্রিকেটিং অয়েল আমদানি হয়েছে। বিল অব এন্ট্রি অনুযায়ী, আমদানি করা চালানের ইনভয়েস মূল্য ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭ ডলার ৫৩ সেন্ট। এক্ষেত্রে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৯ ডলার ৬২ সেন্ট মূল্যের কোনো পণ্য আমদানির তথ্য কাস্টমসের এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে পায়নি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

পরবর্তীকালে বিষয়টি জানতে আইএফআইসি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় চিঠি দেয় কাস্টমস। ওই চিঠির উত্তরে ০৮০১১৪০১৩৭১৭ নম্বর এলসির বিপরীতে পুরো অর্থই রপ্তানিকারকের ব্যাংকে ট্রান্সফার করে দেওয়ার তথ্য জানায় ব্যাংকটি। এরপর গত ৩১ জানুয়ারি এসএওসিএলে চিঠি দেয় কাস্টমস।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসএওসিএলে বিপিসির মালিকানা রয়েছে ৫০ শতাংশ। বাকি ৫০ শতাংশের মালিক এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি নামে প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদ এবং মিশু মিনহাজ। তাদের একজন নিয়মিতভাবে এসএওসিএলের ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজারি কমিটির (ম্যাক) প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিশু মিনহাজকে এসএওসিএলের পরিচালক করা হয় ২০১৩ সালের ৩ জানুয়ারি। ২০১৩ সালের ২ জুলাই রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতেও (আরজেএসসি) জমা দেওয়া তালিকায় তাকে এসএওসিএলের পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর আগে মঈন উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে এশিয়াটিক অয়েলের পক্ষে এসএওসিএলের পরিচালক ছিলেন হারুন আল রশিদ নামে এক ব্যক্তি।

কিন্তু হারুন আল রশিদকে একই সময়ের পরিচালক দেখিয়ে মেসার্স ক্যাল ট্রান্সপ্যাক এশিয়াটিক এলএলসি নামে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান থেকে লুব অয়েল আমদানির জন্য আইএফআইসি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় ঋণপত্র (এলসি) খুলে এসএওসিএল। ২০১৩ সালের ১৭ আগস্ট এলসি খোলার জন্য এসএওসিএলের পক্ষে আইএফআইসি ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে দেখা যায়, পরিচালক হিসেবে মঈন উদ্দিন আহমেদ ও হারুন আল রশিদ চিঠিতে সই করেছেন। পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের ৪ মার্চ আইএফআইসি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৭ ডলার ১৬ সেন্ট মূল্যমানের ঋণপত্রটি (০৮০১১৪০১৩৭১৭) খোলা হয়, যা ওই সময়ে বাংলাদেশি টাকায় (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা ৫ পয়সা হিসাবে) ৪ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৪ টাকা ৮৪ পয়সা প্রায়।

শেয়ার করুন