১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
শিপন চন্দ জয় : ‘হে কবি! নীরব কেন-ফাগুন যে এসেছে ধরায়, বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়’ কবির নির্লিপ্ততা ভাঙতেই যেনো পাতার আড়ালে লুকিয়ে কুহু স্বরে ফাগুনের মাতাল আবেশ ছড়াতে শুরু করেছে কোকিল। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে গাছ। প্রকৃতির এই বদলের রঙ লেগেছে ফুলের দোকানগুলোতেও। তাই ব্যস্ত সময় পার করছে সিলেটের ফুল ব্যবসায়ীরা। জমে উঠেছে ফুলের ব্যবসাও।
আজ ঋতুরাজ বসন্ত বরণ ও ভালোবাসা দিবস। আজ আনন্দে মাতবে তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মানুষ। বাসন্তী রঙের শাড়িতে সাজবে তরুণীরা। মাথায় গুজবে বাহারি ফুল। আর কয়েকদিন পর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদদের স্মরণে সবার হাতে থাকবে ফুল।
তাই নগরীতে লেগেছে উৎসবের রঙ। আর উৎসবেরই কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ‘ফুল’। নানান রঙ, নাম ও সুগন্ধের ফুল। হাজার বছর ধরে ভালোবাসা আর পবিত্রতার প্রতীক হিসেবেই যার পরিচিতি। তাইতো বছরের আনন্দোৎসবগুলো সামনে রেখে প্রতীক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় ফুলের চাহিদা সারা বছরের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। রমরমা হয়ে ওঠে ফুলের বাজার।
বাসন্তী ও ভালোবাসা দিবসে আগেই নগরীর ফুলের দোকানগুলোতে বাহারি ফুল বিকিকিনিতে ব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে।
সকাল থেকেই ফুল কিনতে দেখা গেছে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুল বেচাকেনা সরব ছিল দোকানগুলো। তবে স্বাভাবিকের তুলনায় ফুলের দাম অনেক বেশি বলে দাবি ক্রেতাদের। নগরীর চৌহাট্টায় প্রতিটি ফুলের দোকানে ভিড়ে দেখা গেছে।
ফুল কিনতে আসা জেরিন ইসলাম বলেন, বসন্তবরণ উপলক্ষ্যে ফুল কিনতে এসে রীতিমতো অবাক হয়েছি। গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি দাম ফুলের। যে গোলাপ ফুলের দাম ২০ টাকা ছিল, সেটির দাম চাওয়া হয়েছে ৪০ টাকা।
একই অভিযোগ মদনমোহন কলেজের ছাত্র রাফিউল ইসলাম সজীবেরও। তিনি বলেন, এবার ফুলের বাজার গরম। প্রতিটি ফুলেরই দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে গোলাপের দাম দ্বিগুণের বেশি। গত বছর যে ফুল ২০ টাকা দিয়ে কিনেছি এবার এর দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এবারে ফুলের বাজারে টিউলিপ ও লিলি ফুলও দেখেছি।
দাম নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও সোমবার দিনভর নগরীর ফুলের দোকানগুলোতে ছিল তরুণ-তরুণীদের ভিড়। বিক্রি ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। আজ মঙ্গলবার বাসন্তী ও ভালোবাসা দিবসে আরো ভালো বিক্রি হওয়ার আশা তাদের।
চৌহাট্টা এলাকার চামেলী পুষ্পালয় অ্যান্ড সাজ ঘরের স্বত্বাধিকারী সুজিত কুমার সরকার বলেন, ‘পাইকারি বাজারে দাম বেশি হওয়ায় এবার গোলাপের দাম একটু বেশি। তবে বছরের এই সময়টায় এমনিতেই ফুলের দাম চড়া থাকে।’
বনফুল পুষ্প কেন্দ্রের বুরহান উদ্দিন বলেন, ‘ফুল বিক্রি ভালোই হচ্ছে। রজনীগন্ধার কলির মালা ও মাথার রিং, গোলাপ ফুলের চাহিদা বেশি থাকে। ইদানীং একগুচ্ছ জারবেরা কিনতেও ফুল প্রেমীদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
ফুল ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ দিবস বাদ দিলে বিক্রির হিসেবে পুরো সপ্তাহ দুই ভাগে বিভক্ত। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সপ্তাহের এই তিনদিন ফুলের চাহিদা বেশি থাকে বলে জানালেন নগরীর সবচেয়ে পুরনো ফুলের দোকান মাধবী পুষ্প কেন্দ্রের মো. ফজলুল।
তিনি জানান, এই দিনগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি হয়। তবে সপ্তাহের বাকি চারদিন অর্থাৎ শনি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত চাহিদা থাকে তুলনামূলক কম।
বুধ থেকে শুক্রবার বিয়ের অনুষ্ঠান থাকে বলেই এসময় ফুলের চাহিদা বেশি থাকে বলে জানান বিক্রেতারা। তারা বলেন, ফুল বিক্রি ছাড়াও এদিনগুলোতে গায়ে হলুদ, মেহদী সন্ধ্যা, বরের গাড়ি এবং স্টেজ সাজাতে প্রচুর পরিমাণে ফুল ব্যবহার হয়।
বাসন্তী উৎসব ও ভালোবাসা ছাড়া সবচেয়ে বেশি ফুলের চাহিদা থাকে বিজয় দিবস, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবসের মতো বিভিন্ন সরকারি দিবসে। এসব দিবসে ফুলের দোকানগুলোতে বিক্রির পরিমাণ থাকে ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।
জানা গেছে, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ফুল ব্যবসার সাথে জড়িত এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ষাটের উপর। দীর্ঘদিন থেকে সিলেটে ফুলের ব্যবসার প্রসার ঘটলেও ফুল ব্যবসায়ীদের কোন সংগঠন গড়ে উঠেনি এখনও। নগরীর জেল রোড এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পাইকারি ফুলের দোকান।
আশা পুষ্প কেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সালাম বললেন, ‘আমার এখান থেকে পাইকারি দরে ফুল কিনে নিয়ে ব্যবসা করেন নগরীর অনেকেই। এর বাইরেও জেলার বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা থেকে অনেকেই ফুল নিতে আসেন। সিলেট জেলায় ফুলের দোকান কতটি এটা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া অনেকে বাসায় বসেই অর্ডার নিয়ে ফুল সরবরাহ করেন। তাদের সংখ্যাও একেবারেই কম নয়।’