৩১ জানুয়ারি ২০২৩


দুই একর জুড়ে বটগাছ, ডালপালা কাটতে ক্ষমা চেয়ে করা হয় পূজা!

শেয়ার করুন

মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি : কেউ বলেন শতবর্ষী, আবার কেউ বলেন ৩০০ বছরের পুরোনো। বয়স যতই হোক না কেন, প্রকাণ্ড বটগাছটি দেখে মুগ্ধ হননি এমন লোকের সংখ্যা কম। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সুরমা চা বাগানের ১০ নম্বর সেকশনে পুরোনো এ বটগাছটি প্রায় পৌনে দুই একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।

সরেজমিনে দেখা যায়, উঁচু নিচু টিলার বুক জুড়ে সারি সারি সবুজ চা গাছ। এর মধ্যে বাগানের নাচঘরের পাশে বিশালাকৃতির এ বটগাছের ডালপালাগুলো সৃষ্টি করেছে এক অন্যরকম সৌন্দর্য্য। প্রায় অর্ধশতাধিক দেড়শ থেকে দুইশ হাত লম্বা ডালপালা ছাতার মত মেলে রয়েছে। গাছের অন্তত প্রকান্ড ২০ টি ডাল যাতে মাটিতে শুয়ে না পড়ে এ জন্য প্রায় ৫ ফুট উঁচুতে গাছের গুঁড়ি দিয়ে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। এর পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে দুর্গামন্দির ও শিবমন্দির।

স্থানীয়রা জানান, প্রাচীন এই বটগাছ ভ্রমণ পিপাসুদের আগ্রহের স্থানে পরিণত হয়েছে। যারা এখানে আসেন তারাই মুগ্ধ হন। নানা প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য এ বটগাছ। প্রায়শই পাখির কলকাকলিতে ভরে ওঠে। চা বাগানে ভ্রমণের পাশাপাশি প্রতিবছর দেশ বিদেশের বহু মানুষ এই বটগাছটি দেখতে আসেন। তারা গাছের ছবি ও ভিডিও করে নিয়ে যান। বাগানের পঞ্চায়েত কমিটি মন্দির ও বটগাছের দেখভাল করেন। তবে গাছটি কবে জন্মেছে এ বিষয়ে বাগানে বসবাসরত তরুণ বৃদ্ধ কেউই সঠিক তথ্য জানেন না।

এ বিষয়ে ধারণা করে একজন চা শ্রমিকের ছেলে রঞ্জন সবর (৩৫) বলেন, ‘বটগাছটির বয়স কমপক্ষে ৩০০ বছর হবে।’ চা বাগানের প্রবীণ চা শ্রমিক সংশোধন সবর (৭৫) ও প্রদীপ সাওতাল(৭০) নামে দুজনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাঁরা জানান, তাদের পূর্ব পুরুষদের মুখে শুনেছেন ১২৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৯৬ সালে ভারতের আসাম থেকে আসা মকর তন্তবায় নামে বৃক্ষপ্রেমী চা শ্রমিক রেজি প্রজাতির একটি বটগাছ রোপণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ওই গাছটির পাশেই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠে আরেকটি বট গাছ। কালের পরিক্রমায় ওই বট গাছটি রোপণ করা বটগাছটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে এ বিশালাকার ধারণ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে সুরমা চা বাগানের ১০ নম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিৎ মুন্ডার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, এই গাছটিকে ঘিরে প্রথমে পজ্ঞতত্ব পূজা হতো। স্বাধীনতার আগে থেকেই মাঘের শেষে দিকে নারায়ণ পূজা ও ফালগুন মাসে শিবচতুর্দশী পূজা হয় গাছটির তলায়।

এ সব পূজায় জগদীশপুর, নয়াপাড়া বৈকন্টপুর, দেউন্দি, লস্করপুর, চাকলা, সাতছড়িসহ জেলার বিভিন্ন চা বাগানের দশ বারো হাজার সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী চা শ্রমিকেরা অংশ নেন। তরুণ চা শ্রমিক নেতা রঞ্জন সবর আরও বলেন, এই গাছের কোন ডালপালা কখনো কাটা হয় না। প্রায় দুই যুগ আগে নারায়ণ মন্দির তৈরির সময় বটগাছের কিছু ডাল কাটা পড়ে। এ জন্য পূজা অর্চনা করে বটগাছের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়। মন্দির ও বটগাছের নিরাপত্তা জন্য চারদিকে দেয়াল করা হয়েছে। দেয়ালের ভেতরে এই গাছের ডালপাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। ঝরে যাওয়া পাতা মন্দিরের পাশে এক জায়গায় স্তুুুপ করে রাখা হয়। সেখানেই এগুলো পচে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।

শেয়ার করুন