১৫ জানুয়ারি ২০২৩
নিজস্ব প্রতিবেদক : মুসলমান ধর্মালম্বিদের কাছে ওলিদের মাজার একটি পবিত্র স্থান। এর পবিত্র রক্ষা করা জরুরী। কিন্তু খোদ ওলিদের মাজার এলাকাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে জমজমাট জুয়ার আসর। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে থাকে জুয়াড়িদের আনাগোনা। ফলে বিনষ্ঠ হচ্ছে মাজার এলাকার পরিবেশ। এটি দক্ষিণ সুরমা থানার জিঞ্জির শাহ (র.) এর মাজার এলাকার কথা। শুধু জিঞ্জির শাহর মাজার এলাকায় নয় দক্ষিণ সুরমার আরো বেশ কয়েকটি স্পটে চলছে এই কর্মজজ্ঞ।
সংশ্লিস্ট সূত্রমতে, দীর্ঘদিন থেকে এসব অবৈধ জুয়ার আসর পরিচালিত হয়ে আসলেও পুলিশের কোন ধরণের কোন ভূমিকা নেই বললেই চলে। দক্ষিণ সুরমা থানা ও কদমতলী ফাঁড়ি পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চলছে জুয়ার রমরমার এমন ব্যবসা। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত চলে জুয়ার আসর। এতে করে দিনমজুরসহ সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধ করে দেয়ার জন্য স্থানীয়রা পুলিশ প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে একাধিকবার নালিশও করেন। কিন্তু পুলিশের কিছু আসাধু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে টেকনিক্যাল রোড সংলগ্ন রেলওয়ে কলোনীর বাসিন্দা আবুল কাশেম সহ তার সহযোগীরা তীর শিলং, জুয়ার বোর্ডসহ বিভিন্ন ধরণের অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত করে আসছে। রাত হলেও এখানে আনাগুনা শুরু হয় মাদক সেবীদের। আর তীর শিলং থেকে প্রাপ্ত অর্থ চলে যাচ্ছে ভারতে।
স্থানীয় বাসিন্ধারা জানান, মাজার এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী কাশেম ও জামালের নেতৃত্বে এখানে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী জুয়ার সিন্ডিকেট। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে চলে জমজমাট জুয়ার আসর। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয়। এছাড়াও এখান থেকে স্থানীয় পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও কিছু অসাধু সাংবাদিকদের নামে নিয়মিত টাকা আদায় করা হয়। যার ফলে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, জুয়াড়ী কাশেম ও জামাল কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই মাজার এলাকার পৃথক দুটি স্থানে স্থানীয় নেতা-খেতাদের ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছে তীর, জান্ডুমুন্ডু, তিন তাশ ও কাটাকাটি নামক জুয়ার আসর। প্রকাশ্যে এই জুয়ার আসর বসলেও নিরব ভূমিকা পালন করায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কোন সময় প্রশাসনের অভিযানে যায়, তখন অভিযানের আগেই খবর পৌঁছে যায় জুয়াড়িদের কাছে। আর খবর পেয়েই তারা পলিয়ে যায়। পুলিশ চলে আসার পর আবারো চলে তাদের আসর।
জানা গেছে, দক্ষিণ সুরমার শীর্ষ জুয়াড়ী কাশেম ও জামাল দীর্ঘ দিন থেকে এই স্থানে জুয়ার বোর্ড পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু স্থানীয় কিছু প্রতিবাদীরা এই জুয়ার বোর্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তার কোন সুফল পাচ্ছেন না। যার ফলে সে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সিলেট নগরীর নগরী অন্যান্য এলাকায় জুয়াড়িকে আটক করেছে পুলিশ। তবে রহস্যজনক কারনে এই এলাকার জুয়ার বোর্ড এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে।
এসব জুয়ার বোর্ড ছাড়াও দক্ষিণ সুরমায় আরো বেশ কয়েকজন তীর শিলংয়ের এজেন্ট রয়েছে। তারা প্রতিদিনই শিলং তীরের টাকা কালেকশন করে ভারতে পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চাঁদনীঘাট মাছ বাজারে নজরুলের বোর্ড, রেলওয়ে স্টেশনের পাশে নছিবা খুতুন স্কুলের সামনে আল-আমিনের বোর্ড, সিলেট পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনের মেইন রাস্তার পাশে রেলওয়ের পরিত্যাক্ত বাথরুমমে মিন্টুর বোর্ড, কাজিরবাজার ব্রীজের দক্ষিণপাশে রেলক্রসিং সংলগ্ন ফারুকের বোর্ড, দক্ষিণ সুরমা পুলিশ ফাঁড়ির নামনে শতাব্দী রেষ্টুরেন্টের পাশে আক্তারের বোর্ড, কদমতলী বাসটার্মিনালে একটি টং দোকানে আপেলের বোর্ড, হবিগঞ্জ-সিলেট এক্সপ্রেস বাস কাউন্টারের সামনে আলমগীরের বোর্ড, কদমতলী ফল মার্কেটের ভিতরে সুরমানের বোর্ড। এসব স্থানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তীর শিলংয়ের জুয়ার বোর্ড থেকে নাম্বার বিক্রি করা হয়। এই নাম্বার বিক্রি থেকে প্রাপ্ত লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতিদিনই ভারতে পাচার হলেও পুলিশের ভূমিকা খুবই রহস্যজনক।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ, এসএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং দক্ষিণ সুরমা পুলিশ ফাঁড়ির নামে প্রতিদিন এই জুয়ার আসর থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমানের টাকা উঠানো হয়। ফলে কোন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত না হলে এখানে কোন অভিযান পরিচালনা করা হয়না। আর সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর নাম মাত্র চালানো অভিযানে তেমন কোন সাফল্যও আসেনা।
এদিকে, এসএমপির ডিবি পুলিশের নামে একজন কনস্টেবল টাকা কালেকশন করার ফলে এসব জুয়ার বোর্ডে ডিবি পুলিশের তেমন কোন অভিযান লক্ষ্য করা যায়নি। মাঝে মধ্যে ভাগভাটোয়ারায় বিড়ম্বনা হলে দু’একটি অভিযান চালানো হয়। বিষয়টি অত্যন্ত রহস্যজনক। সচেতম মহল মনে করছেন প্রশাসনের সংশিলষ্টদের ভাগভাটোয়ারা দিয়েই প্রকাশ্যে চলছে এসব অপকর্ম। এনিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের তৎপরতা না থাকায় এই এলাকাটি যেন জুয়াড়িদের অভয়ারণ্য। নেই কোন পুলিশী অভিযান। বিধায় এই জুয়ার আসরে পার্শ্ববর্তী এলাকাসহ দুর-দুরান্ত থেকে জুয়াড়ীরা জুয়া খেলতে আসে। জুয়াড়ীরা কোন প্রকার ভয়ভীতির তোয়াক্কা না করে নির্বিগ্নে প্রকাশ্যে দিনে ও রাতের অন্ধকারে লাইট জালিয়ে জুয়া খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। জুয়া খেলার পাশাপাশি বাংলা মদ, ফেন্সিডিল ও গাজার ব্যবস্থা থাকায় উঠতি বয়সের ছেলেরাও এখানে এসে ভীড় জমায়। ফলে এলাকায় চুরি, ছিনতাই বেড়েই চলছে। জুয়া খেলার নিয়ন্ত্রণ ও টাকা ভাগাভাগি নিয়ে প্রায়ই ঘটছে মারামারির ঘটনা।
এসব জুয়ার আসর এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, প্রকাশ্যে দিনদুপুরে এসব জুয়ার আসর বসলেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। জুয়ারীদের আনাগুনাতে আমরা রীতিমত ব্যবসাও করতে পারছিনা। বাঁধা দিয়ে উল্টো পুলিশ দিয়ে হয়রানীর ভয় দেখানো হয়। মাঝে মধ্যে পুলিশের কিছু এএসআই ও ডিবি পুলিশের কিছু সদস্যদের আনাগুনা দেখা যায়। এজন্য আমরা অনেকটা বাধ্য হয়েই জুয়ারীদের উৎপাত সহ্য করে যাচ্ছি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ সুরমা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আবুল হোসেন বলেন, জুয়ার বিষয়ে আমাদের অভিযান চলমান আছে। অভিযান পরিচালনা করে চলে আসার পর আবারো তারা খেলা শুরু করে। ফলে আমাদেরকেও জুয়া বন্ধে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এসএমপির দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, আমরা জুয়ার আসর বন্ধে সর্বোচ্ছ চেষ্ঠা করে যাচ্ছি। আবারো জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করব।