৫ জানুয়ারি ২০২৩
নিজস্ব প্রতিবেদক : ঘন কুয়াশার সঙ্গে বইছে ঠাণ্ডা বাতাস। তীব্র শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেট। সকালে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে চারপাশ। আগামী ১০ দিন এভাবেই চলবে, তবে কমবে না তাপমাত্রা। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে থাকবে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। বৃহস্পতিবার সকালে এমন তথ্য জানিয়েছে সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার সকালেও কুয়াশার চাদরে আবৃত ছিল সিলেট। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে দেখা মিলেছে সূর্যের।
সিলেটে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, সিলেটে আগামী ১০ দিনে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রির নিচে নামার আশঙ্কা কম। এ সময়ের মধ্যে ঘন কুয়াশা থাকলেও তাপমাত্রা কমবে না। তিনি আরও বলেন, কুয়াশা থাকায় শীতের অনুভূতি বেশি থাকলেও তাপমাত্রা বাড়বে। দেরিতে হলেও আকাশে সূর্যের দেখা মিলবে।
সকালে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে সিলেট নগর ও আশপাশ। ঘন কুয়াশার কারণে মধ্যরাত থেকে সকাল অবধি শহর ও গ্রামের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। এ অবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শ্রমজীবী-কর্মজীবী গরিব অসহায় মানুষ। কুয়াশার প্রভাব বেশি লক্ষ করা গেছে সুরমা নদীসংলগ্ন এলাকাগুলোয়। লোকজন শীত নিবারণের জন্য ভারী কাপড় পড়ে যে যার গন্তব্যে ছুটছেন।
সিলেটে চা বাগানের শ্রমিকরা জানান, দুদিন ধরে কুয়াশা না থাকলেও মেঘলা পরিবেশ। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় ঠাণ্ডা বাতাস। এ বাতাসের কারণে শীতের মাত্রা বেড়ে যায়। রাতে মনে হয় তাপমাত্রা শূন্যতে চলে আসে। চা বাগানে কাজ করতে গেলে হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে কাজে বের হতে হয় আমাদের।
এছাড়া পাথর শ্রমিকরা জানান, ঠাণ্ডায় নদীর পানি বরফের মতো মনে হয়। তারপরও আমাদের পাথরই জীবিকা। তাই কাজে বের হয়েছি। কয়েক দিন ধরে নদীর ঠাণ্ডা পানিতে কাজ করে জ্বর-সর্দিতে ভুগেছি। কিন্তু পরিবারের কথা চিন্তা করে সকালেই পাথর তোলার সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। একই কথা জানান কয়েকজন দিন মজুর ও নারী পাথর শ্রমিক।
চিকিৎসকরা বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে রোগীর চাপ বেড়েছে। এমনিতে শীত মৌসুমে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় বাতাসে জীবাণুর পরিমাণ বেড়ে যায়। শীতজনিত রোগ হিসেবে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট বেশি হয়ে থাকে। আর শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা শীতজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। তাই এসময়টাতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে পারলে কিছুটা হলেও সুরক্ষা মিলবে।
সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, গত বছরের ৯ জানুয়ারি সিলেটে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এবার শীত শুরুর পর গত ডিসেম্বর ও চলতি বছরের ৪ দিনেও তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রিতে নামেনি। গতকাল বুধবার সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বেড়েছে ঠাণ্ডা জনিত রোগ
ঘন কুয়াশার সঙ্গে বইছে ঠাণ্ডা বাতাস। তীব্র শীতে কাপছে সিলেট। সকালে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে চারপাশ। শীতের প্রকোপে বাড়ায় বেড়েছে নানা শীতজনিত রোগ। জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ ঠাণ্ডাজনিত রোগ নিয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছেন রোগীরা। উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।
চিকিৎসকরা বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে রোগীর চাপ বেড়েছে। এমনিতে শীত মৌসুমে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় বাতাসে জীবাণুর পরিমাণ বেড়ে যায়। শীতজনিত রোগ হিসেবে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট বেশি হয়ে থাকে। আর শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা শীতজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। তাই এসময়টাতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে পারলে কিছুটা হলেও সুরক্ষা মিলবে।
মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজারে কুয়াশা কমলেও বেড়েছে শীতের তীব্রতা। বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের লোকজন। বিশেষ করে মৌলভীবাজারের চা বাগান এলাকার চা শ্রমিক ও হয়হয়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
বৃহস্পতিবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন ধরেই শ্রীমঙ্গলসহ মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে চলছে শীতের দাপট। প্রচণ্ড শীতে জবুথবু হয়ে পড়েছে জনজীবন। তবে আজ বেশি শীত অনুভূত হলেও কুয়াশার ঘনত্বও অনেকটা কমেছে।
তীব্র শীতে চা-শ্রমিক, হাওড়াঞ্চলের জেলে, কৃষক ও শ্রমজীবী লোকজন বিপাকে রয়েছেন। শীত উপেক্ষা করেই তাদের খুব সকালে কাজের তাগিদে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে। এছাড়া সিলেটে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও পড়েছেন শীতের কবলে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় পর্যটকরা হোটেল বা রিসোর্টের কক্ষেই বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন। বয়স্ক পর্যটকরা শীতের কারণে চলে গেছেন।
এদিকে, জেলার শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তাদের ব্যানারে গত কয়েক দিন ধরে জেলার বিভিন্ন স্থানে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমদ বলেন, শীতে কাবু পর্যটকরা তেমন বাইরে যাচ্ছেন না। বয়স্ক পর্যটকরা রিসোর্ট-হোটেল-মোটেল ছেড়ে চলে গেছেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সত্য নাইডু বলেন, চা-শ্রমিকদের কনকনে শীত উপেক্ষা করে কাজে যেতে হচ্ছে। শীত নিবারণের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষ কোনো শীতবস্ত্র বিতরণ করেননি। তাদের ঠান্ডাজনিত রোগবালাই লেগেই আছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, শ্রীমঙ্গলে আজ ১১ দশমিক ৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গত চারদিন ধরে আট থেকে ৯ ডিগ্রির মধ্য তাপমাত্রা ওঠানামা করেছে। তবে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঠান্ডা একটু কম অনুভূত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ
ভরা বোরো মৌসুমে হঠাৎ জেঁকে বসা তীব্র শীতে কাবু নিম্ন আয়ের মানুষ। পাঁচ দিন ধরে মেঘলা ভাব ও কুয়াশায় আচ্ছাদিত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল। রোদ না থাকায় সকাল থেকেই সন্ধ্যার পূর্বাবস্থা বিরাজ করছে প্রকৃতিজুড়ে।
রোদ নেই, বইছে মৃদু বাতাস। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ কাজে বের হতে পারছেন না। এছাড়া হাওরে বোরো ধানের চারা রোপণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক ও শ্রমিকেরা। গত সোমবার থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রোদের দেখা মেলে ঘণ্টাখানেক।
ফলে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় হাড়কাঁপানো শীতে কাঁপছে জেলার প্রত্যন্ত জনপদ। সোমবার সকালে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। এরপর ঠান্ডা বাতাস কমে গেলে শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকে। জেলার সীমান্ত এলাকার শীতের তীব্রতা বেশি দেখা গেছে। অনেকেই খড়কুটোতে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। অনেকেই গরম কাপড় কিনছেন। নিম্ন আয়ের মানুষ ফুটপাতে দোকান থেকে শীত নিবারণের জন্য সোয়েটার, জ্যাকেট কিনতে দেখা গেছে।
প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিশেষ করে ভরা বোরো মৌসুমের সময়ে হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের জেলার টাংগুয়ার, দেখার হাওর, মাটিয়ান, শনি, পাকনার হাওর, করচার হাওর, ছায়ার হাওর, হালির হাওর, নলুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে কৃষি শ্রমিকেরা কাজে নামতে পারেননি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরপাড়ের কৃষক সাকিব মিয়া জানান, শীত বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক দিন ধরে বেশি টাকা দিয়েও জমিনে কাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বোরো চাষাবাদে সাময়িক কষ্ট হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের বোরো চাষি জাহিদ মিয়া বলেন, গত কয়েকদিন ধরে হাড়কাঁপানো শীতে জীবন-জীবিকা কষ্টের হয়ে গেছে। শীতে বোরো জমিতে চারা রোপণ করতে পারছি না।
শ্রমিক আমিনুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন ধরে হাড়কাঁপানো শীতে ঘর থেকে বের হতেই কষ্ট হচ্ছে। তাই কাজে একদিন গিয়ে আর যাই না। শীত একটু কমলে আবারও কাজে যাব।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, চলতি বছর ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। হাওরে শীতের তীব্রতায় বোরো জমিতে চারা রোপণে কৃষক ও শ্রমিকরা কষ্ট করেই তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।