২৭ জানুয়ারি ২০১৮
অতিথি প্রতিবেদক : আগামী ৩০ জানুয়ারি সিলেট সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সিলেট পৌঁছার পর প্রথমে তিনি হজরত শাহজালাল ও হজরত শাহপরাণ (রহ.) মাজার জিয়ারত করবেন। পরে ঐতিহাসিক আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। এই জনসভা ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ।
প্রধানমন্ত্রী জনসভায় প্রায় দুই লাখ মানুষের উপস্থিতির আশায় নেতারা মাঠে নেমেছেন। জনসভা সফল করতে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দিনরাত দৌঁড়ঝাঁপ দিচ্ছেন। এমনকি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও প্রধানমন্ত্রীর এ সফর সফরকে সফল ও নির্বিঘ্ন করতে দফায় দফায় বৈঠক করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে পুরো নগর ততোই সরগরম হচ্ছে। সিলেট জেলার প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে এমনকি চা-বাগানসহ গ্রামগঞ্জে জনসভার প্রচার-প্রচারণা চলছে। সিলেট মহানগর ২৭টি ওয়ার্ডে আলাদা আলাদা বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আর শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষ্যে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে নেতাকর্মীরা লাগাচ্ছেন ব্যানার পোস্টার তোরণ আর বিলবোর্ড। ইতোমধ্যে পুরো নগরী প্রচারণার তোরণ, বিলবোর্ড, ব্যানার পোস্টারে ছয়লাভ।
আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, ‘দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে হয়েছে। আমার বিশ্বাস এবার বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সিলেট-ঢাকা মহাসড়ককে চারলেনে উন্নীতকরণ, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড প্রশস্থকরণ, রেলপথের উন্নয়ন এবং ওসমানী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম প্রসঙ্গে ঘোষণা দেবেন। সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের এ আশা এবার আলোরমুখ দেখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
দৃশ্যমান উন্নয়ন চান সিলেটবাসী :
উন্নয়নের পথ সিলেটে সূচনা হয়েছিল বিশ্ব বরণ্যে কূটনীতিক সাবেক স্পিকার মরহুম হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর হাত ধরে। উন্নয়ন স্বপ্ন সত্যিকার অর্থে রূপায়িত হয়েছিল তাঁর মাধ্যমেই। এরপর সিলেটের সামগ্রিক উন্নয়নের হাল ধরলেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান। উন্নয়নের বরপুত্র হিসাবে সমাদৃত হন তিনি। স্বপ্নের চাইতে উন্নয়নযজ্ঞ দেখতে লাগলো সিলেটবাসী। দলমতনির্বিশেষে তাঁর প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ল সিলেটসহ সারাদেশে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনপদ সিলেটের মাটি ও মানুষ সে উন্নয়নে সমৃদ্ধ হতে থাকল।
উন্নয়ন পরিকল্পনা এতোই বিস্তৃত ছিল যে, সময় ও সুযোগ ঘটলে সিলেটের উন্নয়ন মডেল হয়তো সারাদেশে জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠত। কিন্তু ৪ দলীয় জোট সরকারের পতন ও পরবর্তী ওয়ান ইলেভেন সরকারকালীন থমকে যায় উন্নয়ন চাকা। এরপর ১৪দলীয় জোট নির্বাচনে জয়লাভের মধ্যে দিয়ে সিলেটের হাল ধরেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি তার পূর্বসূরীদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তে মনোযোগী হয়ে উঠেন। তারপরও উন্নয়ন নিয়ে একাধিক যৌক্তিক দাবী রয়েছে সিলেটেবাসীর। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সেই দাবির ব্যাপারে বাস্তবমুখী সুরহা চান আপামর সিলেটের মানুষ।
প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটবাসী ইতিমধ্যে নিয়মতান্ত্রিক দাবি তুলে আদায় করেছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গতা। এখন লন্ডন থেকে সরাসরি সিলেটে আসতে পারছেন প্রবাসীরা। প্রতিদিন এ রুটে কয়েকশ’ যাত্রী চলাচল করেন। কিন্তু পুর্নাঙ্গ রূপ লাভ করলেও ওসমানী আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর এখনও সিলেটের মানুষের কাংখিত চাহিদা পূরণ করতে পারেনি।
অপর দিকে, সরকারের ঘোষণা রয়েছে- প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। কিন্তু সে আশা এখনও পূরণ হয়নি সিলেটবাসীর। ইতিমধ্যে রাজশাহী ও চট্টগ্রামবাসী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেও সিলেটে এখনও সিলেট মেডিকেল কলেজ ‘কলেজে’-ই গড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হলেও এখনো শুরু হয়নি কার্যক্রম।
সিলেটবাসীর অন্যতম দাবি, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। এজন্য সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেললাইনকে ডাবল লাইনে উন্নীত করণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ঘোষণা অনুযায়ী আখাউড়া এলাকায় বাইপাস নির্মান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি আর পূরণ হয়নি। বর্তমান সরকারের প্রস্তাবনায়ও সেটি রয়েছে। কিন্তু এখনও এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। টঙ্গি থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ডাবল লাইন স্থাপনের কাজ চললেও সিলেটে ডাবল লাইন নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এদিকে, ডাবল লাইন না হওয়ার কারণে সিলেট থেকে ঢাকা পর্যন্ত দ্রুততম ট্রেন সার্ভিস শুরু হয়নি। সিলেটবাসীও প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাবল লাইনের দাবি ইতোমধ্যে তুলেছেন।
এদিকে, ২০০৪ সালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ফোর লেন স্থাপনের ঘোষণা দিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দুই লাইনেই কাজ সমাপ্ত করা হয়। এর ফলে ফোর লেন নির্মাণের দাবি অপূরণই রয়ে গেছে। এই অবস্থায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও সিলেটে এ সড়কপথটি দুর্ঘটনার অন্যতম রুটে পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৬ সালে সিলেটে সফরকালে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী বছরের শুরু থেকে এর কাজ শুরু হতে পারে। কিন্তু আরো তা আলোর মুখ দেখেনি। এবার ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ফোর লেনে উন্নীত করার ঘোষণাটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই পেতে চান সিলেটের মানুষ।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সিলেট আগমন ঘিরে আগামী দু’দিনের মধ্যে পুরো শহর ছেয়ে গেছে ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড আর তোরণে। তাই গতকাল শুক্রবার সার্কিট হাউসের কাজ পরিদর্শন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরী, সহকারী কমিশনার কাজি আরিফুর রহমান, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে সালিক রুমাইয়া, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাসমা শারমিন।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী যে সকল এলাকায় যাবেন বিশেষ করে হযরত শাহজালাল (র.) মাজার, শাহপরান (র.) মাজারসহ অন্যান্য স্থান পরিদর্শণ করেছেন এসএসএফের অগ্রবর্তী দল। শাহপরান (র.) মাজার পরিদর্শণকালে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রিয় সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান উপস্থিত ছিলেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. রাহাত আনোয়ার বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষ্যে নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সার্বিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। সার্কিট হাউস, মাজার এলাকা এবং জনসভাস্থলও পরিদর্শন করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সার্বিক কাজ শেষ করতে পেরেছি। অল্পকাজ চলমান আছে।’
মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রধানের আগমন নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ বাহিনী সর্বোচ্চ কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী যেসব স্থানে যাবেন ওই স্থানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে মহানগর পুলিশের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তারাও মাঠে কাজ করছেন।’
(আজকের সিলেট/২৭ জানুয়ারি/ডি/কেআর/ঘ.)