২২ ডিসেম্বর ২০২২


নির্বাচন সামনে রেখে সমান সুযোগ নিশ্চিতের তাগিদ

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বিরাজ করছে। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে এই কমিশন গঠনের শুরু থেকেই। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিশ্চিত করাকে ইসির সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, নির্বাচনের লেভিংপ্লেয়িং ফিল্ড ইসির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীসহ স্থানীয় প্রশাসনকে। ইসি ও স্থানীয় প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে। তাদের ভাষ্য, গাইবান্ধার উপনির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে নির্বাচনটি বিতর্কিত হতো না। আর ইসিকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো না।

এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে মাঠ পর্যায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হওয়ার মূল কারণ ছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের অত্যন্ত বিতর্কিত ভূমিকা।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনকালে এই সংস্থাসমূহের বদলি ও পদায়নসহ সার্বিক কর্তৃত্ব নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকতে হবে। অন্যদিকে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব অংশীজনের প্রতিবন্ধকতাবিহীন অংশগ্রহণ ও নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, প্রচার ও প্রকাশকে অবাধ ও মুক্ত রাখার জন্য নির্বাচন কমিশনকে কঠোরভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।

অন্যদিকে, সব দলের সহ-অবস্থান নিশ্চিত করাকে নির্বাচনপূর্ব চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছে ইসিও।

পটুয়াখালীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। সব ভোটার যেন ভোটকেন্দ্রে এসে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে চায় ইসি। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা এ কাজটি বাস্তবায়ন করতে চাই।’

সিইসি আরও বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের অনেক ঘাটতি রয়েছে। আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আমাদের ভোটারদের মন-মানসিকতায় ঘাটতি রয়েছে। কোনো ঘাটতিই থাকবে না, যদি আমরা ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ এবং তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারি।’

এদিকে বিশিষ্টজনরা বলছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অন্যতম প্রধান কাজ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোপরি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা। সেক্ষেত্রে ইসিকে অবশ্যই সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট সব আইন ও বিধি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে সব দলের জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত হয়। সম-অবস্থান সৃষ্টির লক্ষে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন কমিশনের শতভাগ নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারের কার্যক্রম সীমিত রুটিন কাজে সীমাবদ্ধ করা।’

নির্বাচনপূর্ব লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে। গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও কঠোর হতে হবে ইসিকে।’

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে গাইবান্ধার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও জানান সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের মাধ্যমে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দূরীকরণ, সব রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জন, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিতকরণ, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমসহ সকল অংশীজনের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে ইসিকে।

বিশিষ্টজনরা আরও মনে করেন, নির্বাচন কমিশনকে প্রদত্ত সাংবিধানিক বিশেষ দায়িত্ব ছাড়াও নির্বাচনকালীন সরকার ও তার প্রশাসনিক যন্ত্র বিশেষত প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমের ভূমিকা নিশ্চিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের জন্য সুষ্ঠু, অবাধ প্রতিযোগিতার সুযোগ না সৃষ্টি করতে পারলে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ভোটবাক্স বা ইভিএমের ব্যবহারসহ সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়বে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, কোনো এলাকায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে সেখানে বিরোধীমতের রাজনীতিবিদের নামে গায়েবি মামলা কিংবা পুরনো মামলায় গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান পরিচালনা হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারে মাঠে ব্যস্ত সময় পার করেন। অন্যদিকে, বিএনপিসহ বিরোধীমতের দলগুলোর নেতাকর্মীরা জামিনের জন্য আদালতে আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত থাকেন।

সুশীলসমাজের দাবি, একপক্ষ সরকারে থেকে অপরপক্ষ সরকারের বাইরে রেখে নির্বাচন করলে তা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির পথে অন্যতম বাধা। তারা বলছেন, একদিকে সংসদ সদস্য পদে থেকে সরকারপক্ষীয় সংসদ সদস্যরা পুলিশ সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে তাদের প্রার্থিতার পক্ষে প্রচারাভিযান চালানোর সুযোগ পান। অপরদিকে নানা ধরনের মামলায় পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ভয়ে নির্বাচনে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অবাধে নির্বাচনি প্রচারাভিযান চালানো থেকে বঞ্চিত হন সরকারবিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। বিষয়টি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ইস্যুতে প্রয়াত সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছিলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ না হলে কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।’

এছাড়া আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের দাবি উঠেছে বিদেশিদের পক্ষ থেকেও।

গত ৮ নভেম্বর ঢাকা সফরকালে মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আক্তার বলেন, ‘বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলসহ সব অংশগ্রহণকারীর জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে।’

শেয়ার করুন