২৫ নভেম্বর ২০২২


‘হরিলুট’ হচ্ছে সরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ

শেয়ার করুন

ছাতক (ছাতক) প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত রোপওয়ের ১৯ কিলোমিটার রজ্জুপথ ও কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট চালুর কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ছাতকের ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ এ দু’টি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও চালু হয়নি ছাতক-সিলেট রেলপথও। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে সরকারি এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় হাওরাঞ্চলের শিল্পনগরী খ্যাত ছাতকে ধস নেমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। এতে ক্ষুব্ধ এ অঞ্চলের মানুষ। সরকারও হারাচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব।

যদিও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা শিগগিরই কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট ও সিলেট-ছাতক রেলপথ চালুর কথা জানিয়েছে। তবে কবে নাগাদ এগুলো চালু হবে-তা নিশ্চিত করতে পারেননি।

এদিকে, ছাতক ও সিলেটের ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত রোপওয়ের ১৯ কিলোমিটার রজ্জুপথ চালুর কোনো উদ্যোই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এটি চালুরও কোনো আশ্বাস মিলছে না।

পাথর আনার জন্য ছাতক-ভোলাগঞ্জ রোপওয়ের ১৯কিলোমিটার রজ্জুপথ স্থাপন হয়েছিল ১৯৬৪-১৯৭০ সালে। দীর্ঘ ৬ বছরে নির্মিত হয় এ রোপওয়ের রজ্জুপথ। এটি স্থাপন হওয়ার এক বছরের মাথায় শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। তখন উৎপাদনে যেতে পারেনি এ প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার যুদ্ধে রোপওয়ের রজ্জুপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ক্ষতিগ্রস্ত রোপওয়ের রজ্জুপথ মেরামতের পর চালু হয়। রোপওয়ের ভোলাগঞ্জস্থ নিজস্ব জায়গা থেকে পাথর তুলে রজ্জুপথে ছাতক স্টেশনে আনলোডিং করা হতো। আর এ পাথরগুলো সারা দেশের রেললাইনের নিচে দেয়া হতো। এ ভাবে চলছিল দীর্ঘদিন। রোপওয়ের রজ্জুপথে ছিল ৪টি স্টেশন। পাথর পরিবহনে বাকেট (বাক্স) ছিল ৪২৫টি।

২০১৩ সাল পর্যন্ত বাকেট চালু ছিল ২৪৬টি। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর এ্যাঙ্গেল-১ স্টেশন থেকে সর্বশেষ ছাতকে পাথর আনা হয়েছিল। এর পর থেকে রোপওয়ের রজ্জুপথটি বন্ধ হয়ে পড়ে। এর পর দীর্ঘ ৯ বছরেও চালু হয়নি সরকারি এ প্রতিষ্ঠান। আর চালু হবে কিনা এ বিষয় অজানা রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে ১৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এ রোপওয়ের রজ্জুপথ। স্প্যান, তার, ট্রেসেল ও বাকেটসহ মূল্যবান মালামাল প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে। অযতেœ অবহেলায় পড়ে আছে সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এসব যন্ত্রাংশ চোরেরা লুটপাট করে খাচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে- সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত দেশের একমাত্র রেলওয়ের রোপওয়ের রজ্জুপথের ভোলাগঞ্জের নিজস্ব পাথর কোয়ারি থেকে কয়েক কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে। কিছু কর্মকর্তা কর্মচারিদের মাধ্যমে পাথর উত্তোলন করে নিয়েছে প্রভাবশালী পাথর খেকোরা। পাথর উত্তোলন করায় সেখানের রোপওয়ে রজ্জুপথের একাধিক ট্রেসেল (খুঁটি) হেলে পড়েছে। এ ছাড়া রজ্জুপথের তার ছিড়ে হাওরের জমি, খালে ও নদীসহ বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে পাথর পরিবহনের বাকেট (বাক্স)। অনেকগুলো বাকেট ও ট্রেসেলের অংশ কেটে চোরেরা নিয়ে বিক্রি করছে।

এদিকে, ১৯৮৮ সালে ৬ একর জায়গা নিয়ে ছাতক রেলওয়ে স্টেশনের পাশে নির্মিত হয় কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট। কাঁচামালসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটিও বছরের প্রায় অর্ধেক সময় বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের ১৬ মার্চ থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে কংক্রিট স্লিপার প্লান্টটি। দীর্ঘ ৮মাসেও এ প্লান্টটি চালু হয়নি

অপরদিকে, ১৯৫৪ সালে স্থাপিত ছাতক-সিলেট ৩৪ কিলোমিটার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ২০২০ সালের ২৩ মার্চ করোনা মহামারির কারণে সারা দেশের সাথে এখানেও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।

করোনা মহামারি কাটিয়ে দেশের সব অঞ্চলে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও ছাতক-সিলেট রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি দীর্ঘ ২ বছর ৮ মাসেও। বন্ধ রেল লাইনে হরিলুট চলছে। স্টেশন কোয়ার্টারগুলোতে জুয়া, মদ-গাঁজার আসর বসছে প্রতিদিন। অপরাধিরা তাদের নিরাপদ স্থান হিসেবে বেঁচে নিয়েছে। সেই সাথে রেললাইনের পাথর, সিøপার, গাছ-গাছালি লুট হচ্ছে। জায়গা দখল করে দোকান কোঠা নির্মিত হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, এই সবের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারি ছাড়াও রয়েছেন এলাকার প্রভাবশালী লোক। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভয়াবহ বন্যায় বন্ধ ওই রেলপথের অনেকাংশে ক্ষতি হয়েছে। এই যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

ছাতকবাজার রেলওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা যায়, এ কার্যালয়ের অধিনে মঞ্জুরি পদ ছিল ১৪১টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৮জন। এর মধ্যে দুইজন চলতি বছরে অবসরে যাবেন। এখানের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত) দায়িত্বে আছেন সিরাজ জিন্নাত। তার মূল দায়িত্ব বিভাগীয় প্রকৌশলী ঢাকা-২। ছাতক-ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে ও পাথর কোয়ারির ভূমি রয়েছে ১০২৮.৩৩ একর। এর মধ্যে রেলওয়ের অধিগ্রহণকৃত ভূমি ৩৫৯.৮৭ ও খাস ভূমি রয়েছে ৬৬৭.৪৬ একর।

পাথর সঙ্কটসহ বিভিন্ন কারণে গত ১৬ মার্চ থেকে কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট ও ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ সাল থেকে দেশের একমাত্র রোপওয়ের রজ্জুপথ বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্রগ্রামের (পূর্ব) প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিয়া জানান, রোপওয়ে রজ্জুপথ ধরে যেখান থেকে ছাতকে পাথর আনা হতো সেখানে আগের মতো পাথর আর নেই। এছাড়া এই রোপওয়ে রজ্জুপথটি চালু করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। তাই এ বিষয়ে আপাতত কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছেনা।

একাধিক ট্রেসেল হেলে পড়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, মাত্র দুই একটা হবে। এছাড়া বন্ধ রোপওয়েতে নিরাপত্তাকর্মীও রয়েছে। কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট শিগগিরিই চালু করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ছাতক-সিলেট রেলপথ সংস্কার, মেরামত করে অবশ্যই চালু হবে। তবে কবে নাগাদ কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট ও রেলপথ চালু হবে-তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।

শেয়ার করুন