২৩ অক্টোবর ২০২২


ওসমানী বিমানবন্দরে ‘এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স’, সুফল নিয়ে নানা প্রশ্ন!

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রবাসী অধ্যূষিত সিলেট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ। আমদানী রপ্তানীর ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী বিমানবন্দরে নির্মিত হয়েছে ‘এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স’। ইতোমধ্যে শেষ হচ্ছে এর নির্মাণকাজ। তবে কবে চালু হচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত এই কার্গো কমপ্লেক্স এই ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছুই বলতে পারছেনা কেউ। চালু হলেও সিলেটে প্যাকিং হাউজ না থাকায় এর সুফল পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন সিলেটের রফতানীকারকরা। এজন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী ও বিমান প্রতিমন্ত্রীর কাছে প্যাকিং হাউজ নির্মাণের দাবী তাদের।

এদিকে, অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরও ‘কার্গো কমপ্লেক্স’ চালু হতে বেশকিছু জটিলতা থাকে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিমানবন্দরের ফ্যাসিলিটিজ কর্তৃপক্ষসহ সরকারের কয়েকটি দপ্তরের কয়েকটি ধাপ পেরিয়েই চালু হবে এই কার্গো কমপ্লেক্স। একটি সূত্র জানিয়েছে আগামী বছরের শুরুর দিকে চালু হতে পারে এক্সপোর্ট কমপ্লেক্স।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট থেকে সরাসরি বিদেশে পণ্য রফতানির চালুর লক্ষ্যে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শেষ হয়েছে ‘এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজ। পাশাপাশি চলছে অত্যাধুনিক টার্মিনাল, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও কার্গো স্টেশন স্থাপনের কাজ। ইতোমধ্যে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক এক্সক্লুসিভ ডেডিকেশন সিস্টেম স্ক্যানার মেশিন।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ছাড়পত্র পেলেই এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্সটির উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এতে সিলেট অঞ্চলের পণ্য রফতানিতে উন্মোচন হবে সম্ভাবনার নতুন দ্বার। অন্যদিকে মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাড়বে সিলেটের সরাসরি ফ্লাইট।

জানা গেছে, ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বীকৃতি পায় সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর। ২০০৬ সালে বিমাবন্দর টার্মিনাল সম্প্রসারণ করা হলেও আন্তর্জাতিক বিমানের ফ্লাইট চলছে সীমিত। সিলেট থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হয় ২০০৭ সালে। রিফুয়েলিং স্টেশন চালু হয় ২০১২ সালে। সিলেট-দুবাই ফ্লাইট চালুর মাধ্যমে ২০১৫ সালে সিলেট-মধ্যপ্রাচ্য ফ্লাইট নিয়মিত চলাচল শুরু হয়।

কিন্তু পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে যেসব সুবিধা থাকা দরকার তার অনেক কিছুই ছিল না ওসমানী বিমানবন্দরে। আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়নে ২ হাজার ১১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ২০২০ সালের শেষের দিকে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণের প্রথম পর্যায়ের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে রয়েছে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও কার্গো স্টেশন স্থাপন। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বিমানবন্দরের আয়তন বাড়বে তিন গুণ। তখন শুধু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামাই নয়, বিমানবন্দরটি ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে, দ্রুত এগিয়ে চলছে বাকি কাজও।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, আরব আমিরাত থেকে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল রয়েছে। যদিও এ ধরনের টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন পুরোপুরি অনুমোদিত নয়। ইংল্যান্ডের ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টের পরামর্শ ও নির্দেশনা মেনে লাল-সবুজের পতাকাবাহী এয়ারলাইনস বাংলাদেশ বিমানই কেবল আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রী পরিবহন করছে। বর্তমানে সপ্তাহে হিথ্রো বিমানবন্দরে ৫ টি, ম্যানচেস্টারে ২ টি ও আরব আমিরাতে ১ টি ফ্লাইট চলাচল করে।

এদিকে, বিমানবন্দরের চলমান মেগা প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার বাড়বে বলে আশা ব্যবসায়ীদের। তারা জানান, সিলেটের শাক-সবজি, আনারস, লেবুজাতীয় ফল, পান, ফ্রোজেন ফিশ, নানা জাতের সুগন্ধি চাল, বেতের আসবাব, নকশিকাঁথা এবং কুটির শিল্পের বিশাল বাজার রয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের বিশাল অংশ সিলেটের হওয়ায় সেখানকার বাজারে এসব পণ্যের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। তাই সিলেটের ব্যবসায়ীরা যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে সাইট্রাস-জাতীয় ফল রফতানি করেন। তবে সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরে কার্গো টার্মিনাল না থাকায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সেই পণ্য পাঠাতে হয়। এতে ব্যয় ও দুর্ভোগ দুটোই বেশি।

সিলেটের ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ লাঘবেই চলমান মেগা প্রকল্পের আওতায় ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। স্ক্যানিং মেশিনসহ অত্যাধুনিক সব যন্ত্রাপাতিও স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এখন অপেক্ষা কেবল উদ্বোধনের।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, কার্গো টার্মিনাল ও আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল বিমানবন্দর পরিদর্শনে আসবে। তাদের অনুমতি পেলেই সিলেট থেকে সরাসরি পণ্য রফতানির দ্বার উন্মোচিত হবে। এজন্য হয় তো আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করা লাগতে পারে।

জানা গেছে, বিমানবন্দরে এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রথম অংশের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। আর দ্বিতীয় অংশের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের আগস্টে।

জালালাবাদ ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রোজেন ফিশ এক্সপোর্টার গ্রুপের সভাপতি আহমেদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হবেন সিলেটের কৃষকরা। কারণ সিলেটের কৃষকদের উৎপাদিত সাতকরা, লেবুসহ বিভিন্ন শাকসবজি দেশের বাজারের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানী হবে। এতে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের পথ প্রশস্ত হবে।

তিনি আরো বলেন, জানুয়ারী মাসে নির্মিত এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্সটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চালু হলেও এখনই এর সুফল পাবেন না সিলেটের রফতানীকারকগণ। কারণ কার্গো কমপ্লেক্স আর ফ্লাইট চালু হলেই চলবেনা। রফতানী করা পণ্যের মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজন যথাসময়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় প্যাকেটিং করা। এজন্য প্রয়োজন প্যাকিং হাউজ। যা সিলেটে নেই। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে আমরা যারা বিদেশে সবজি, ফলমূল রফতানী করি আমাদেরকে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্তাবধানে পরিচালিত নারায়নগঞ্জের প্যাকিং হাউজ থেকে পণ্য প্যাকেটজাত করতে হয়। তারপর বিমানবন্দরের নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, এমনিভাবে সিলেট থেকে পণ্য রফতানী করতে হলে প্রথমে প্যাকিং হাউজ নির্মাণ করতে হবে। আমরা সম্প্রতি সিলেট সফরকালে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী মহোদয়ের সাথে দেখা করে এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স এর পাশাপাশি সিলেটে প্যাকিং হাউজ নির্মাণের দাবী জানিয়েছি। এর সাথে সরকারের পররাষ্ট্র, কৃষি ও বিমান মন্ত্রণালয় জড়িত থাকায় সংশ্লিষ্টদে দৃষ্টি আকর্ষণ করি। মন্ত্রী মহোদয়গণ আমাদেরকে সিলেটে প্যাকিং হাউজি নির্মাণের ব্যাপারে আশস্ত করেছেন। আমরা প্রত্যাশা করছি হয়তো শীঘ্রই এ ব্যাপ্যারে ভালো কোন সিদ্ধান্ত আসবে।

বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হাফিজ আহমদ বলেন, বিমানবন্দরের এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এর সাথে সরকারের কয়েকটি দপ্তরের সম্পর্ক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র পেলেই এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স চালু হতে পারে। ফলে কখন সেটা চালু হবে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য আমাদের হাতে নেই।

শেয়ার করুন