২৩ অক্টোবর ২০২২


পাঁচ শিল্পগ্রুপের কব্জায় চিনি

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : সবশেষ গত ৬ অক্টোবর প্রতি কেজি খোলা চিনি ৯০ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ৯৫ টাকা দাম নির্ধারণ করে সরকার। তবে দাম নির্ধারণের পরদিন থেকেই কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিয়ে চিনি কিনতে হয় ক্রেতাকে। আর দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চিনি নিয়ে শুরু হয় কারসাজি। প্রতিকেজি চিনি ১০০ টাকার নিচে বিক্রি করা হচ্ছে না।

আর গত শুক্রবার থেকে শুরু হয় চিনির কৃত্রিম সংকট। সিন্ডিকেটের কব্জায় বন্দি হয়ে পড়েন ক্রেতারা। গতকালও বেশিরভাগ দোকানেই বিক্রি করা হচ্ছিল না চিনি। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, চিনি নেই। তবে হঠাৎ চিনি কোথায় উধাও হলো, কারা চিনি মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করল, এমন নানা প্রশ্ন এখন ক্রেতাদের মনে।

এ পরিস্থিতিতে চিনি উধাও রহস্যের খোঁজে চিনির মিলসহ পাইকারী ও খুচরা প্রতিষ্ঠানে দেশজুড়ে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অভিযান পরিচালনাকারী একাধিক কর্মকর্তা ঢাকা টাইমসকে বলেন, চিনির বাজারে যারা কারসাজি বা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তারা ধরা ছোয়ার বাইরে।

অভিযান পরিচালনকারী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে চিনির উৎপাদন কম। তাই মিলগুলো সরবরাহ করতে পারছে না। চিনি সংকট সৃষ্টির পেছনে কয়েকটি মিল তাদের সন্দেহের তালিকায় থাকলেও অভিযানকালে হাতেনাতে তাদের কারসাজি উদঘাটন সম্ভব হয়নি। এস আলম গ্রুপের একটি মিলে ওজনে কম দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করা হয়েছে। তবে পাইকারি বিক্রেতাদের একটি সিন্ডিকেট চিনির কৃত্রিম সংকটে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করছেন। আজ থেকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে কারা জড়িত, তা ধরতে মাঠে নামবে সরকারি এ সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, মোনায়েম গ্রুপ, ফ্রেশ ও সিটি গ্রুপের চিনির মিলে অভিযান চালানো হয়। এ সময় তিনি কোনো অনিয়ম খুঁজে পাননি। তার সামনেই সরকার নির্ধারিত মূল্যে মিল থেকে চিনি বিক্রি করা হচ্ছিল। তিনি আরও বলেন, ‘মিলাররা বলছেন, গ্যাসের চাপ কম। চিনির মিলে ১৪০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু রয়েছে ২৫-৩০ পিএসআই।’

সহকারী পরিচালক হাসানুজ্জামান বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে চিনির সিন্ডিকেট পাইকারি বাজারে। তাই পাইকারি বাজারে অভিযান চালানো হবে।’

এর আগে কারওয়ানবজার ও মৌলভীবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চিনি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে দুটি সভা করবে ভোক্তা অধিদপ্তর।

অভিযানে অংশ নেওয়া ভোক্তা অধিদপ্তরের আরেক সহকারী পরিচালক মাগফুর রহমান বলেন, ‘আমরা কয়েকটি চিনি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছি। উৎপাদন পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছি। মোনায়েম গ্রুপ এবং সিটি গ্রুপের ক্যাপাসিটি রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকটে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। তবে তাদের ডিও উল্লেখ করা ছিল না। আমরা উল্লেখ করতে বলেছি। এই ‘পরিমিত উৎপাদনের’ কারণেই তারা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না। আর মোনায়েম গ্রুপের ‘ইগলু’ চিনি সাধারণত সেনাকল্যাণসহ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরবরাহ করা হয়। তাদের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। প্যাকেটের গায়ে ৯৫ টাকাই লেখা রয়েছে।

অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ জেলার দায়িত্বে থাকা ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি জানান, খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে অনিয়ম পেয়েছেন। বলেন, ‘আমরা বেশকিছু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়েছি। সেখানে ভাউচারে গোলমাল পাওয়া গেছে। ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযান চালিয়ে মনে হয়েছে, অপরাধী ধরা ছোঁয়ার বাইরে।’

রাজধানীর মৌলভীবাজারের বেশ কয়েকজন চিনি ব্যবসায়ী জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে মিলগেটেই প্রতি কেজি চিনি ৯০ টাকা করে পাইকারদের কাছ থেকে রাখা হচ্ছে। আর পাইকাররা কেজি প্রতি ২-৫ টাকা বাড়িয়ে নিচ্ছে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এরপর খুচরা ব্যবসায়ীরা এরসঙ্গে তাদের লাভের অংক যোগ করে ক্রেতার কাছ থেকে নিচ্ছেন ১০০ টাকা, বা এর চেয়ে বেশি। আর ২-৩ দিন ধরে মিলাররা চিনিই দিতে চাইছেন না। এসব কারণে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী চিনি বিক্রি আপাতত বন্ধ রেখেছেন।

একাধিক পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ঢাকা টাইমসের কাছে অভিযোগ করেন, ‘সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, ইগরু ও দেশবন্ধু গ্রুপ, এই ৫টি প্রতিষ্ঠান দেশে চিনি আমদানি, রিফাইনিং, বিপণনসহ দেশের চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। চিনির কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেট বা দাম বৃদ্ধিসহ চিনির বিষয়ক যা কিছুই হোক, তাদের ইশারা ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব না।

তবে এসব মিলগুলোর তরফ থেকে কারসাজি, সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে চিনির উৎপাদন অনেকাংশে কমে গেছে। ফলে তারা চাহিদা অনুযায়ী চিনি সরবরাহ করতে পারছেন না। তাদের কাছে চিনির পর্যাপ্ত কাঁচামাল রয়েছে। তবে এসব সংকটে তারা রিফাইন (শোধন) করে চিনি বাজারে ছাড়তে ব্যর্থ হচ্ছেন।

মঞ্জুর রহমান নামের এক ক্রেতা বলেন, তার বাসা মগবাজার মোড় এলাকায়। শুক্রবার রাতে চিনি চিনি কিনতে বের হয়ে মহাসংকটে পড়েন। মগবাজার মোড় হয়ে চিনি খুঁজতে খুঁজতে কারওয়ানবাজার কিচেন মার্কেটে গিয়ে একটি দোকানে প্যাকেটজাত চিনি দেখতে পান। তবে দোকানি তাকে জানিয়ে দেন চিনি বিক্রি হবে না। এসব চিনি নিয়মিত ক্রেতাদের জন্য রাখা হয়েছে। ওই রাতে চিনি ছাড়াই বাসায় ফেরেন তিনি। পরদিন (গতকাল) সকালে ১১৫ টাকায় এক কেজি চিনি কিনতে সক্ষম হন।

অন্যদিকে গত শুক্রবার শান্তিনগর বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের সেলসম্যান জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমরাই চিনি ৯৪ টাকা কেজি দরে কিনে এনেছি। এখন কী করে ৯০ টাকায় বিক্রি করবো?’

মৌলভীবাজারের খুচরা চিনি বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের বাজারে পরিবেশক পর্যায়ে চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বস্তাপ্রতি ৫ হাজার ২০০ টাকা দিলে গোপনে কেউ কেউ বিক্রি করছেন। এতে প্রতি কেজি চিনির দাম পড়ছে ১০৪ টাকা। এই দামে চিনি বিক্রি করলে প্রশাসন অভিযান চালাতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন তার মতো অনেকেই।

এসব বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিনের ভাষ্য, তাদের কাছে চিনির কাঁচামালের কোনো সংকট নেই। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় চিনি উৎপাদন করতে পারছেন না। তাদের দৈনিক ৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি পরিশোধনের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেখানে করতে পারছেন ১ হাজার টনের মতো। ফলে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই বাজারে দাম সহনীয় হয়ে আসবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বছরে দেশে চিনির চাহিদা ২০ লাখ টন।

জানা গেছে, মোট চাহিদার ৯৫ শতাংশই আমদানি করে থাকে ওই ৫টি প্রতিষ্ঠান এবং তাদের অনুগত প্রতিষ্ঠানগুলো। মোটকথা ওই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কব্জায়ই থাকে চিনির বাজার। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ টন। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে চিনি আমদানি হয়েছিল ২১ লাখ টন। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস, অর্থাৎ জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে বলে চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে।

এসব তথ্য বলছে, দেশে চিনির কোনো অভাব নেই। অথচ গত কয়েক দিনে বাজার থেকে এক রকম চিনি উধাও হয়ে গেছে। তাহলে এত চিনি গেল কোথায়, এমন প্রেক্ষাপটে সামনে চলে এসেছে সেই প্রশ্নও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিল মালিক ও বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে চিনি অবৈধভাবে মজুদ করে বাজারে সরবরাহ একরকম বন্ধ করে দিয়েছেন। এ জন্যই বাজারে চিনির সংকট।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে (২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১) দেশে এক কোটি ১১ লাখ ৫২ হাজার ৫৬০ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ আমদানি করেছে সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি এ সময়ে ৪৪ লাখ ২১৯২ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ৩৬ শতাংশ অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে মেঘনা গ্রুপ। মেঘনা সুগার রিফাইনারি লিমিটেড ও ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেডের নামে মেঘনা গ্রুপ আমদানি করেছে ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৯৯ টন অপরিশোধিত চিনি। এ ছাড়া আবদুল মোনেম সুগার.. রিফাইনারি লিমিটেড ১২ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৯ টন, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১০ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৫ এবং দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৯ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সারা দেশে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) প্রথার মাধ্যমে চিনি বিপণন করা হয়। কোনো চিনিই খাতুনগঞ্জের বাজারে আসে না। কারখানা মালিকের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে দ্বিতীয় সারির আড়তদাররা ডিও কিনে বাজারে তৃতীয় সারির ব্যবসায়ীদের (ডিও ব্যবসায়ী) কাছে বিক্রি করেন। দ্বিতীয় সারির আড়তদার কিংবা তৃতীয় সারির ডিও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জেলা উপজেলা পর্যায়ের মুদি দোকানি কিংবা খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিও কিনে কারখানাগুলো থেকে চিনি সংগ্রহ করে। এরপর মুদি দোকান হয়ে ভোক্তা পর্যায়ে চলে যায়। কিন্তু মিল থেকে সরবরাহ না দেওয়ায় পুরো সাপ্লাইচেইনে চিনির সংকট দেখা দিয়েছে এবং দাম বেড়েছে।

এদিকে গত ৬ অক্টোবরের আগেও গত ২২ সেপ্টেম্বর খোলা চিনির দাম নির্ধারণ করা হয়। তখন প্রতি কেজি খোলা চিনি ৮৪ টাকা আর প্যাকেটজাত ৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেসময়ও ওই দামে চিনি পাওয়া যায়নি। এরপর ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে ফের ৬ অক্টোবর চিনির মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রতি কেজি ৯০ টাকা, আর প্যাকেটজাত প্রতি কেজি ৯৫ টাকা।

শেয়ার করুন