২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
মিজান মোহাম্মদ : আলী মিয়া। নগরীর মিরাবাজারে অবস্থিত একটি ব্যান্ড ফার্ণিচার শোরুমের বিক্রয়কর্মী। প্রতিদিনের মতোই সকাল প্রায় ৯ টায় শোরুমে আসেন। শোরুম খুলে বসতে না বসতেই তিনজন হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) প্রবেশ করে বকশিস দাবি করেন। কীসের বকশিস জানতে চাইলে হিজড়াদের একজন ‘মাসিক বকশিস’ বলে জানান। আলী মিয়া শোরুমের ব্যবস্থাপক আসেনি জানিয়ে পরে আসতে বলেন। এতে হিজড়ারা হাততালি দিয়ে অশ্লীল অঙ্গ ভঙ্গি প্রদর্শন শুরু করেন। ভয়ে লজ্জায় আলী মিয়ার নিজের পকেট থেকে ১০০ টাকা বের করে দেন। এতে আরো মারমুখী হয় হিজড়ারা। অশ্লীল গালি দিতে দিতে শরীরের কাপড় খুলতে শুরু করে তারা। আলী মিয়া ভয়ে ৩০০ টাকা দিয়ে এ যাত্রায় রক্ষা পান।
আব্দুল হাকিম। শিবগঞ্জের একটি ব্যাংকের অফিস সহকারী। সকাল সাড়ে দশটায় অফিসে কাজ করছিলেন। এমন সময় কয়েকজন হিজড়া ব্যাংকে প্রবেশ করে পূজার চাঁদা দাবি করেন। নিরাপত্তা প্রহরী ও কর্মকর্তাদের এড়িয়ে ব্যবস্থাপকের রুমে জোর করে ডুকে যেতে চান। তারা বাঁধা দিলে ধস্তাধস্তি হয়। পরে কর্মকর্তারা ৭০০ টাকা দিয়ে রেহাই পান।
শুধুমাত্র মিরাবাজার কিংবা শিবগঞ্জেই নয়, প্রতিদিন এমন ঘটনাই ঘটছে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। এমনকি বাস ও ট্রেনেও চাঁদাবাজি করছে তারা। হিজড়াদের লাগামহীন চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন নগরবাসী।
চাঁদাবাজির শিকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ- প্রতিমাসেই পূজা, রোজা, ঈদ, বৈশাখ, সংক্রান্তি এমন অযুহাতে ২/৩ বার চাঁদা আদায় করে হিরজারা। চাঁদা প্রতিষ্ঠানভেদে ১০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। কেউ দিতে না চাইলে অশ্লীল অঙ্গ ভঙ্গি প্রদর্শন থেকে শুরু করে শরীর কাপড় খুলে উলঙ্গ পর্যন্ত হয়ে যায়। কেউ ভয়ে, কেউ লজ্জায় গ্রাহক বা কাস্টমারের সামনে টাকা দিতে বাধ্য হয়। এমন ঘটনা যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা নয়, বাসায় বাসায় গিয়ে এমনকি বিয়ের গাড়ি আটকিও চলে এমন চাঁদাবাজি।
অনুসন্ধানে নেমে কথা হয় সূচনা সুন্দরী নামে এক হিজড়ার সাথে। তিনি বলেন, পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আমরা অন্য কোন কাজ করতে পারি না। তাই দোকানে দোকানে বাসায় বাসায় ঘুরে টাকা তুলে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু আমাদের বেশ ধরে কিছু মানুষ হিজরা সেজে চাঁদাবাজি করছে আর দোষ যাচ্ছে আমাদের উপর। মানুষও বিরক্ত হচ্ছে।
হিজড়া কল্যাণ সমিতির সিলেট জেলার নেত্রী সুন্দরী হিজড়ার কাছে অভিযোগগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কোথাও মাসে ২/৩ বার যাই না। মাসে, দুইমাসে কোন অনুষ্ঠান হলে আমরা সবার কাছে সহযোগিতা চাই। যে যা দেয় তাই নিয়ে চলে আসি। জোরাজোরির কিছু নেই। আর কিছু পুরুষ-মহিলা হিজড়া সেজে নগরে চাঁদাবাজি করছে। ফলে বদনাম হচ্ছে আমাদের। মাসে একবারের বেশি কোন হিজড়া টাকা দাবি করলে তাদের বেঁধে রেখে আমাকে কল দেবেন।
অনেকদিন ধরেই অভিযোগ আসছে সিলেটের হিজড়াদের একটি অংশ পুরুষ। তারা হিজড়া সেজে নগরে চাঁদাবাজি করছে; কেউ কেউ অপরাধ কর্মকাণ্ডেও জড়িত। ‘ছদ্মবেশী হিজড়া’ দাবি যে মিথ্যে নয় তা প্রমাণ করে দিয়েছে রোববার সকালে নগরীর সুবহানীঘাটের বনফুলের সিঁড়ির দ্বিতীয় তলায় সেই ছদ্মবেশী হিজড়া তুষারের লাশ প্রাপ্তি।
জানা যায়, তুষার আহমদ পুরুষ হলেও থাকতেন হিজড়ার ছদ্মবেশে। হিজড়াদের সঙ্গেই তার ওঠাবসা। প্রায় রাতেই ‘হিজড়া বন্ধুরা’ এসে তাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যায়। ফেরেন পরদিন সকালে। রাতে কোথায় থাকেন, কী করেন- কেউ জানে না। পরিবারের শত বারণ। এই বারণে কান দেননি তুষার। হিজড়া বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যেতেন।
সবেশেষ রোববার সকালে তুষারের লাশ মিলে। এই খুনের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে পুলিশকে। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডটিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। লাশ উদ্ধারের পরপরই শুরু হয়েছে তদন্ত। নিহত তুষার আহমদের মূল বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরিপুরের শ্যামবাজার গ্রামে। অনেকদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন নগরীর খাসদবিরের তরঙ্গ-৩৮ আবাসিক এলাকায়।
তুষারের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তুষারের বয়স প্রায় ২০ বছর। সে একজন পুরুষ। অথচ নারী বেশে সে হিজড়া সেজে চলাফেলা করতো। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বার বার বারণ করা হলেও সে মানেনি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সে হিজরাদের সঙ্গেই নগরে চলাফেরা করতো। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই নারী সাজে থাকা শুরু করে তুষার। এরপর কিশোর হওয়ার পর নারী সাজার প্রবণতা তার আরও বেড়ে যায়। এ কারণে সে পড়ালেখাও বেশিদূর এগোয়নি।
বয়স ১৫-১৬ হওয়ার পরপরই তার সঙ্গে হিজড়াদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওদের সঙ্গেই সে শুরু করে চলাফেরা। বাড়ি থেকে হিজড়ার সাজে ঘর ছাড়তো। ফিরেও আসতো হিজড়ার সাজে। এরপর বাসাতে সে সাধারণ ভাবেই চলাফেরা করতো। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে এ নিয়ে বারণ করা হয়। বার বার চাপও দেয়া হয়। উল্টো বাড়ি ছেলে চলে যাওয়ার হুমকি দিতো। এ কারণে পরিবারের সদস্যরা তাকে বেশি চাপ দিতেন না। গত দুই বছর ধরে প্রায় প্রতি রাতেই হিজড়া বন্ধুদের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতো তুষার। ফিরতো পরদিন সকালে।
এমনভাবে গত শনিবার রাতে তুষারের এক হিজড়া বন্ধু তার বাসার সামনে আসে। সে তুষারকে ডাক দেয়। তুষারও তার ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রাতে সে বাসায় ফিরেনি। সকাল ১০টার দিকে পরিবারের সদস্যরা লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে হাসপাতালে যান। সেখানে মাসহ পরিবারের সদস্যরা লাশ শনাক্ত করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তুষার আহমদকে হত্যা করা হয়েছে। তার গলায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে লাশ উদ্ধারের পরপরই তদন্ত শুরু করেছে। তারা ইতিমধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
কোতোয়ালি থানার ওসি আলী মাহমুদ জানিয়েছেন, সিলেটে অনেক পুরুষ হিজড়া সেজে রয়েছে; এমন অভিযোগ অনেক আগে থেকেই আমাদের কাছে ছিল। ছদ্মবেশী হিজড়া তুষারের লাশ উদ্ধারের পর আমরা এ নিয়ে কাজ শুরু করেছি। তদন্তও অনেকদূর এগিয়েছে। ৬ হিজরাকে গ্রেফতারও করা হয়েছ, আশা করছি দ্রুতই খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবো। সিলেটে ছদ্মবেশী হিজড়া সেজে যারা বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
জয়বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি অজিত রায় ভজন বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আমাদের পরিবারগুলোতেই জন্ম হয়েছে। পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূল থাকায় তারা চাঁদাবাজি, মাদকব্যবসা ও অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে। তাদেরকে এড়িয়ে না গিয়ে আমাদের সাথে মিশতে দিতে হবে। কাজের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি ও সুযোগ করে দিতে হবে।