২১ সেপ্টেম্বর ২০২২


‘ভূয়া পাসপোর্টে’ ২৬ বার ভারত যান সরকারী কর্মকর্তা

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : অন্য দেশের বাসিন্দা হয়ে বাংলাদেশ সরকারের একটি দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সড়ক ও জনপথ অধিদফতরে বড় পদে চাকরি করে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। এবার অন্য নামে পাসপোর্ট করে একবার দুবার নয়- একে একে ২৬ বার বিদেশ সফর করে ফের আসলেন আলোচনায়। তার নাম তুষার কান্তি সাহা। তিনি সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। সিলেট তার সর্বশেষ কর্মস্থল ছিলো। এখান থেকেই তিনি গত ফেব্রুয়ারি মাসে অবসরকালীন ছুটিতে যান।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তাকে নিয়ে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন তোলা হয়। ওই বৈঠকে জানানো হয়, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (তৎক্ষালীন) সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তুষার কান্তি সাহা সিলেটে থাকলেও প্রায়ই তিনি অবৈধভাবে ভারতে যাওয়া-আসা করেন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে অবৈধভাবে সিলেটের পাঁচটি প্রকল্পে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

সম্প্রতি দেশের প্রথমসারির একটি সংবাদপত্র তুষার কান্তি সাহার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে- গত ১৫ বছর ধরে অন্যের নামে পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি ভারতে যাতায়াত করছেন। বিদেশ সফরের তথ্য গোপন করে সরকারকে রেখেছেন অন্ধকারে। অভিযোগ রয়েছে- তিনি ভারতে বিপুল পরিমাণ সম্পদও করেছেন। সংসদীয় কমিটির নির্দেশে তার বিরুদ্ধে ২ বার তদন্তও করেছে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়। কিন্তু তার নামে কোনো পাসপোর্টের হদিস পায়নি। তবে গণমাধ্যম খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, সেই কর্মকর্তা মুকুল কুমার সাহা নামের পাসপোর্ট ব্যবহার করেই বার বার যাতায়াত করেন ভারতে। ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্যানুযায়ী- ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি মুকুল কুমার সাহা নামের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২৬ বার ভারতে গেছেন। সে দেশে অবস্থান করেছেন ১৫৭ দিন।

২০২১ সালে তুষার কান্তির বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে অনুপস্থিত থাকাসহ, ভারতে সম্পদ গড়া, অবৈধভাবে ভারতে যাতায়াত ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে। সে বছরই সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় সচিবকে নির্দেশ দেয়। একজন উপসচিব তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেন। কিন্তু দায়সারা গোছের কাজে ভারত সফরের প্রমাণ পায়নি তদন্ত কমিটি। ২০২১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটির সভা এই প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে ফের সচিব কিংবা অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দেয়। অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনেও তুষারকান্তি সাহা নামে পাসপোর্ট নেই বলে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে ২টি তদন্ত কমিটির একটিও তুষার কান্তি সাহার কোনো পাসপোর্ট খুঁজে পায়নি। তবে তুষার কান্তি সাহা যে পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০০৮ সাল থেকে ভারতে যাতায়াত করতেন তার সন্ধান পায় গণমাধ্যম। তিনি মূলত মুকুল কুমার সাহা নামে ২০০৭ সালের ২৭ নভেম্বর ফরিদপুর পাসপোর্ট অফিস থেকে একটি পাসপোর্ট করেন। ২০১২ ও ২০১৮ সালে তা দু’দফায় নবায়ন করেন। ওই পাসপোর্ট ব্যবহার (মুকুল কুমার সাহা- বিআর০৮৭৮৫৯৩) করে ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের 6E1859 ফ্লাইটে কলকাতায় যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।

ইমিগ্রেশন অনলাইনে হওয়ার পর যেসব তথ্য মিলেছে তাতে দেখা গেছে- ২০১৪ সালে বিএ০২৪৪৯৭৮ নম্বরের পাসপোর্ট দিয়ে ২০১৪ সালের ১৭ মে থেকে ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২০ বার ভারতে যান তুষার কান্তি। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে তা নবায়ন করে বিআর০৮৭৮৫৯৩ নম্বরের পাসপোর্ট গ্রহণ করেন তিনি এবং তা ব্যবহার করে ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৬ বার তিনি ভারতে যান। এই সময়কালের মধ্যে তুষার কান্তি মোট ২৬ বার ভারতে গিয়ে ১৫৭ দিন অবস্থান করেন।

মুকুল কুমার সাহা নামের পাসপোর্ট সম্পর্কে ফরিদপুর পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক শামীম আহমেদ জানান- এই পাসপোর্টধারীর আরও একটি নাম আছে। সেটা হলো তুষার কান্তি সাহা। ২০১৬ সালে ১০ মার্চ তুষার কান্তি সাহা নামে ফরিদপুর পাসপোর্ট অফিসে একটি আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেয়ার সময় তা মুকুল কুমার সাহা নামের পাসপোর্টের ফিঙ্গারপ্রিন্টের সঙ্গে মিলে যায়। তখনই তারা নিশ্চিত হন মুকুল কুমার সাহা ও তুষারকান্তি সাহা একই ব্যাক্তি।

তারপর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে শামীম আহমেদ বলেন, তুষারকান্তি সাহা নামে তাকে আর পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ২০১৬ সালের মার্চ মাসেই পাসপোর্ট অধিদপ্তরে চিঠি পাঠান ফরিদপুর পাসপোর্ট অফিস। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই এই কর্মকর্তার। ব্যবস্থা না নেওয়ার সুযোগেই মুকুল কুমার সাহা নামের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে নবায়ন করে নেন তুষারকান্তি সাহা। যার নম্বর বিআর০৮৭৮৫৯৩।

তবে এসব বিষয় অস্বীকার করেছেন তুষার কান্তি সাহা। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, তুষার কান্তি সাহা নামে তার একটি পাসপোর্ট ছিলো, তবে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

অথচ পাসপোর্ট অধিদপ্তর তাকে এই নামে কোনো পাসপোর্ট ইস্যু করেনি গণমাধ্যম জানতে পারে।

সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ রওশন আরা মান্নান জানান, সে অনেক অপকর্ম করেছে। সরকারকে না জানিয়ে ভারতে যাতায়াত করেছেন। সে কারণে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। যদিও তৎকালীন সচিব চেয়েছিলেন তাকে পদোন্নতি দিতে। কিন্তু আমি কঠোরভাবে বাধা দেই এবং অবশেষে সে পদোন্নতি সে পায়নি।

শেয়ার করুন