২ সেপ্টেম্বর ২০২২


ইভিএমে অনড় ইসি

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করে ভোট গ্রহণে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের আপত্তি থাকলেও অনঢ় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিশ্লেষকরা বলছেন, এত তাড়াহুড়ো করে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোটের সিদ্ধান্ত ইসি না নিলেও পারত। সক্ষমতার মধ্যে প্রত্যেক জেলার একটি আসনে ইভিএমে ভোট নিলে রাজনৈতিক সমঝোতাও হতে পারত।

এদিকে, সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট নিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে ইসি। রোডম্যাপও চূড়ান্ত করেছে। এখন শুধু ঘোষণার পালা। ইভিএম ইস্যুতে সমঝোতার জন্য আর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা নেই বলেও জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বলেন, ‘১৫০ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়টি ইসির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।’

যেসব রাজনৈতিক দল এখনো ইভিএমের বিরোধিতা করছে, সমঝোতার জন্য তাদের ডাকা বা কোনো বৈঠক আয়োজন করা হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে বেগম রাশেদা সুলতানা বলেন, ইভিএম ইস্যুতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আর কোনো আলোচনার সম্ভাবনা নেই। কেননা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের পরই ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ইসির হাতে এখন যে ইভিএম রয়েছে তাতে ৭০-৮০ আসনে ভোট গ্রহণ সম্ভব, সেক্ষেত্রে এই সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত ইভিএমের ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না, জানতে চাইলে বেগম রাশেদা সুলতানার বলেন, ‘ইসির কাছে থাকা ইভিএম ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আরো ইভিএম আনার ব্যবস্থা করা হবে।’ তবে ইভিএম কেনার প্রক্রিয়া ইসি এখনও শুরু করেনি বলে জানান তিনি।

রাশেদা সুলতানা জানান, ইতমধ্যেই নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। যেকোনো সময় ঘোষণা করা হবে।

ইভিএমের বিষয়ে বিভিন্ন দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কারচুপির যে অভিযোগ তুলছেন তা তদন্ত করা হবে কিনা জানতে চাইলে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘যারা অভিযোগ তুলছেন, তাদের তো নির্বাচন কমিশনে এসে প্রমাণ করতে বলা হয়েছে। তারা আসেননি। ফলে এ ধরণের অভিযোগ তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেই ইসির।’ তবে সাধারণ জনগণ যদি এ বিষয়ে ইসিতে কোনো অভিযোগ করেন তবে তা আমলে নেয়া হবে বলে জনান তিনি।

তবে বেসরকারি সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘ইভিএম যে উৎকৃষ্ট পন্থা তা ইসিকেই প্রমাণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, মানুষ ইভিএম বিশ্বাস করে না। এটি একটি ব্ল্যাক বাক্স। কিছু দেখা যায় না। এর নিয়ন্ত্রণ থাকে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টদের হাতে। এতে নির্বাচনী ফলাফল ওভাররাইট করা যায়।

সুজন সম্পাদক বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ইভিএমের স্বচ্ছতা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশন ও কর্মরতদের উপর। নির্বাচন কমিশনের উপরই যখন আস্থা নেই সে ক্ষেত্রে ইভিএম নির্ভুল কাজ করবে কীভাবে। ইভিএমে ফলাফল জালিয়াতি করা যায়। এটি একটি দুর্বল যন্ত্র, যাতে আমাদের বিশ্বাস নেই।’

নির্বাচন কমিশনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে প্রমাণ করব যে ইভিএমে জালিয়াতি হয়েছে? কারণ তারা তো সোর্সকোডসহ আনুষঙ্গিক কোনো তথ্যই সরবরাহ করেনি।’

ইভিএম বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, ইভিএমে ভোট গ্রহণে খারাপ কিছু দেখি না। বুয়েটের শিক্ষকরাও বলেছেন এ যন্ত্র নিরাপদ। দেশে ৮০০ নির্বাচন হয়েছে ইভিএমে। আর আমাদের তো প্রযুক্তির দিকেই অগ্রসর হতে হবে। ইভিএম হ্যাক হয় না। ইভিএমে ভোটগ্রহণ মন্দ কি।

তবে ইসি ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের বিষয়ে এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত না নিলেও পারত বলে মন্তব্য করে এই্ সাবেক নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘এত আসনে ইভিএমের ঘোষণা না দিয়ে কমিশনের সক্ষমতার মধ্যে প্রত্যেক জেলায় একটি আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে হয়তো রাজনৈতিক সমঝোতাও হতো বলে আমার ব্যক্তিগত মতামত।’ ইভিএম ভোট জালিয়াতির যে অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে আসছে তা সঠিক নয় বলেও মনে করেন তিনি। ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৮টি দলের সঙ্গে সংলাপের পর সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত গত ২৩ আগস্ট ঘোষণা করে ইসি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করতে হলে আরো ভোটিং মেশিন আমদানি করতে হবে। কিন্তু নির্বাচনের বাকি মাত্র এক বছর। এই অল্প সময়ে তা আমদানি করে ত্রুটি-বিচ্যুতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা অসম্ভভ। এক ধরণের হযবরল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হবে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে। আইন অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে ইসিকে। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে এ নিয়ে উত্তাপ ততই বাড়ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

দেশে গত পাঁচ বছরে ইভিএমে মোট ৭৯১টি নির্বাচন হয়েছে। তবে ইভিএম নিয়ে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের সংশয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর হয়নি। পাঁচ বছর আগেও ইভিএম নিয়ে বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের যে অবস্থান ছিল, এখনো তা একই আছে। বরং ক্ষেত্রবিশেষে ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।

বর্তমান ইসির অধীনে ১৩০টি নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার করা হয়। এসব নির্বাচনে বেশি আলোচনা হয়েছে ভোটকক্ষে (বুথ) ‘ডাকাতের’ উপস্থিতি, ইভিএমে ভোট নিতে দেরি হওয়া, আঙুলের ছাপ না মেলার মতো বিষয়। এর ফলে ইভিএমের গ্রহণযোগ্যতা আরও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

শেয়ার করুন