২৮ আগস্ট ২০২২


এখনো নিরাপত্তা শর্ত পূরণ হয়নি বিআরটি প্রকল্পে

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প এলাকায় প্রাইভেটকারের ওপর গার্ডার পড়ে পাঁচজনের প্রাণহানির পর থেকে বন্ধ রয়েছে নির্মাণকাজ। পুনরায় কাজ শুরু করতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ যে নিরাপত্তাশর্ত দিয়েছিল, গতকাল পর্যন্ত তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। ফলে ঝুঁকি মাথায় নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে যানবাহন ও মানুষকে।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনো সুরক্ষা বেষ্টনীহীন অনিরাপদ ওই এলাকা দিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫৫ হাজার যানবাহন চলাচল করছে।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে সাড়ে ২০ কিলোমিটার বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। নির্ধারিত সময় চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কী প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, নাকি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে পঞ্চমবারের মতো মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে, সে প্রশ্নও এখন সামনে চলে এসেছে।

গত ১৫ আগস্ট র্দুঘটনার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কাজ আবার কবে শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ।

এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকাটাইমসের সঙ্গে কথা হয় প্রকল্পের চেয়ারম্যান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরীর। সচিব বলেন, ‘ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাশর্ত কতটুকু পূরণ করেছে তা তো নীট (নির্দিষ্ট করে) বলা যাবে না। তবে প্রায় শেষ করে এনেছে। আমাদের টিম প্রকল্প এলাকা ও নিরাপত্তার কাজ পরিদর্শন করেছে। নিরাপত্তার কাজ তারা (ঠিকাদার) মোটামুটি শেষ করেছে। সম্ভবত এ সপ্তাহের মধ্যে কাজ পুুনরায় শুরু করতে বলা হবে।’

নির্মাণকাজের মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে জানিয়ে বিআরটি প্রকল্পের চেয়ারম্যান বলেন, তিনি প্রতি মাসে প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে একটি মিটিং করবেন। সড়ক পরিবহন বিভাগও একটি সভা করবে ফলোআপের জন্য। কত দ্রুত কাজটি শেষ করা যায় তা এখন তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ বলেও জানান তিনি।

প্রকল্পের চেয়ারম্যান বলেন, ‘কাজটি শেষ করে মানুষের ভোগান্তি কত দ্রুত দূর করতে পারি- সেটাই হচ্ছে প্রথম কথা।’ আপাতত মেয়াদ বৃদ্ধি করার কোনো প্রক্রিয়া চলমান নেই বলে জানান তিনি।

এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরীর ভাষ্যমতে, প্রকল্পের কাজ ৮০ ভাগ শেষ। বলেন, ‘ঠিকাদারকে চাপে রাখা হয়েছে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য। এই মুহূর্তে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেই। আমরা চাচ্ছি মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য।’ গত ১৫ আগস্ট উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে প্রাইভেটকারের ওপর বিআরটি গার্ডার পড়ে নিহত হন ৫ জন। এ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হলে নিরাপত্তাঝুঁকি দেখিয়ে বন্ধ রাখা হয় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ। গতকালও ওই অবস্থাই দেখা গেছে।

অন্যদিকে, গত ১৫ জুলাই গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় উড়ালসড়কের লঞ্চিং গার্ডার পড়ে এক নিরাপত্তাকর্মী নিহত ও দুজন আহত হন। এসব হতাহতের বিষয়ে প্রকল্পের চেয়ারম্যান বলেন, ‘যেহেতু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটির তদন্ত রিপোর্ট আসুক, হাইকোর্টেও এ বিষয়ে একটা মামলা হয়েছে- সব মিলিয়ে আমরা (প্রকল্প কর্তৃপক্ষ) একটু বসব। রিপোর্টটা পেলে এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত চাইব।’

যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২০১২ সালে বিআরটি প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন হয়। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালে। চার বছরের কাজ ১০ বছরেও শেষ না হওয়ায় বিআরটি প্রকল্প এখন ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে চলাচলকারীদের দুর্ভোগের কারণ, যাত্রীদের গলার কাটা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় এ পর্যন্ত চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয় হয়। সর্বশেষ মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

বিআরটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে যখন প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা। চার দফায় ডিপিপি সংশোধন করে প্রকল্পের সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয় চার হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ বছরে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে দুই হাজার ২২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০৯ শতাংশ।

এদিকে আগামী বছরের জুন মাস পর্যন্ত পঞ্চমবারের মতো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে ডিপিপি সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে আলোচনা হচ্ছে নানা মহলে। তবে তা নাকচ করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জানান, ‘এর তো কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত নেই।’

বিআরটি প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, রোড ডিভাইডারের কাটা অংশে ফেলে রাখা হয়েছে গার্ডার। স্লাব, ইট, বালু, সিমেন্ট, রডসহ নানা নির্মাণসামগ্রীও উন্মুক্তভাবে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ঠিকাদারকে নিরাপত্তাবেষ্টনী, উপরে নেট দিতে হবে। তিনি বলেন, বাস্তব কথা হচ্ছে এত বড় একটা কাজ করতে হলে ঠিকাদারকে ফ্রি (উন্মুক্ত) স্পেস (স্থান) দিতে হয়। তা দিতে পারিনি। স্পেসটা ছোট। যদি রাস্তা বন্ধ করি তাহলে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রাস্তা চালু রেখেই কাজ করতে হয়েছে। এটাও একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।

বিআরটি প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি ঋণ দিয়েছে এক হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। বাকি অর্থায়ন সরকারের নিজস্ব। ডিপিপি চার দফা সংশোধন করায় বাড়তি ব্যয় মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ পর্যন্ত জোগান দিতে হয়েছে ৩ হাজার ১৬২ কোটি টাকা।

শেয়ার করুন