২৮ আগস্ট ২০২২


খুপরি ঘরেই জীবন চলছে যুগের পর যুগ

শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : প্রাণ প্রকৃতির সবুজে ঘেরা পাহাড়-টিলা দেখে আমরা আবেগ আপ্লুত হই। কিন্তু এই পাহাড়-টিলার উঁচুনিচুর ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে অনেক লাঞ্ছনা আর বঞ্চনা, রয়েছে মৃত্যুর হাতছানি। আছে অব্যক্ত কথোপকথনের পঙক্তিমালা। পাহাড়ের উঁচুনিচুতে বাস করেন চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। তারা থাকেন পরিবার পরিজন নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর। কয়েক দশক ধরে দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ অনেকেই সেই খুপরি ঘরগুলোতে বসবাস করেন। ছন কিংবা খরের ছাউনি দিয়ে তৈরি ঘর এখন আর সচরাচর দেখা না গেলেও অনেক চা বাগানে এখনও দেখা মেলে সেইসব ছন বাঁশের খুপরি ঘরের।

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানের চা শ্রমিক তপন ভৌমিক। স্ত্রী, দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে থাকেন তেমনই একটি খুপরি ঘরে।

তিনি বলেন, কত বলছি, টিনের ঘর পাইনি। টিনের ঘর বাগানে দেয় না। ছনের ঘরেই কষ্ট কইরা থাকতে আছি।

তপন ভৌমিক জানান, তারা তিন পুরুষ ধরে এসব ঘরের মধ্যেই জীবন কাটিয়েছেন। এখন সবাই ইট, সুরকি আর টিনশেড দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করছে। কিন্তু দরিদ্র মানুষ বলে, ভাঙাচোরা খুপরি ঘরই আশ্রয়। কবে টিনের ঘরে ঘুমাতে পারবেন, বেঁচে থাকা অবস্থায় তা হবে কিনা জানেন না তিনি।

আরেক নারী শ্রমিক সাথী রানী জানান, ঘরের ছন বাঁশ খুলে পড়ছে। রোদ আর বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ঘরের ছাউনিতে এখন পলিথিন দিয়ে রেখেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিন বৎসর ধরে বাগানকে কইছি, ঘরে টিন লাগাইতে। তারা শুনে না, গুরুত্ব ও দেয় না।’

সুলেখা, অঞ্জুমনি ও আয়ুমতিসহ কয়েকজন চা শ্রমিক জানান, ছোট ছোট ছন বাঁশের খুপরি ঘরে কয়েক যুগ ধরে তারা বসবাস করছেন। পরিবারের সদস্যদের খুবই কষ্ট হয়। একই জায়গায় রান্না করা ও ঘুমাতে হয়। বৃষ্টি হলে সমস্যা আরও বাড়ে। পানি পড়ে ঘরে।

বিশাল সবুজের বুকে ছোট ছোট খুপরি ঘরে যুগ যুগ ধরে থাকার ফলে জীবন এখন আনন্দহীন। এভাবেই সাথী রানীর মত সুলেখা, অঞ্জুমনি আর আয়ুমতিদের মত আরও কত চা শ্রমিকদের শত কষ্টের মধ্যে কাটছে জীবন।

বাগান পঞ্চায়েত নেতা রঞ্জিত তাঁতি বলেন, এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে এই চা শ্রমিকেরা এক বিরাট ভূমিকা পালন করছেন, কিন্তু এদের ভাগ্যের হচ্ছে না পরিবর্তন। না হচ্ছে জীবনমানের উন্নতি। তাদের সংসার জীবন, দুঃখ, কষ্ট ও আনন্দানুভূতি উঠে আসে তাদের চেহারা দেখলে। দিনে ৮ ঘণ্টা চা বাগানে শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে সেই শ্রমের মূল্য হিসেবে যা পায়, তা বর্তমান শ্রমবাজারের তুলনায় রীতিমত অবিশ্বাস্য!’

চা সন্তান শিক্ষার্থী মিলন প্রসাদ জানান, বাগানে বসবাসরত শ্রমিকদের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষের রয়েছে অনেক বিধিনিষেধ। তার মধ্য একটি হল, নতুন ঘর তোলার সুযোগ নেই। বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া নির্দিষ্ট মাপের সেই ঘরেই জীবন কাটে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে। ব্রিটিশ আমল থেকেই এ অঞ্চলে চা বাগান গড়ে ওঠার সময় যে সকল নিয়ম কার্যকর ছিল তারই ধারাবাহিকতায় এখনও চলছে।

বাগানের সুযোগ-সুবিধার অধিকাংশই কাগজে থাকলেও বাস্তবে নেই জানান বাংলাদেশ চা কন্যা নারী সংগঠনের সভাপতি খায়রুন আক্তার।

তিনি বলেন, চা বাগানের শ্রমিকদের ঘর বাড়িগুলোতে গিয়ে দেখুন, তাদের ঘরের চালায় টিন নেই, দরজা-জানালা নেই। হয় না কোনো সংস্কার।

এদিকে গেল ১৯ আগস্ট শ্রীমঙ্গলের ফিনলে টি কোম্পানির লাখাই চা বাগানে এক টিলা ধসের ঘটনায় চারজন নারী চা শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

স্থানীয়রা জানান, আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে জরাজীর্ণ মাটির ঘরগুলো সংস্কারের জন্য মাটির প্রলেপ (লেপা) দেওয়ার জন্য মাটি আনতে গিয়ে টিলা ধ্বসে মৃত্যু হয় চারজন নারী চা শ্রমিকের।

জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান জানান, শ্রীমঙ্গল উপজেলার লাখাইছড়া চা বাগানে আকস্মিক টিলাধসে চারজন নারী চা শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহত প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা এবং এই চারজন চা শ্রমিক মায়ের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৪টি ঘর তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনায় জেলা প্রশাসন পরিবার ব্যথিত ও মর্মাহত।

শেয়ার করুন