২১ জানুয়ারি ২০১৮


কেঁচোর বিনিময়ে মোটর সাইকেল

শেয়ার করুন

মৌলভিবাজার প্রতিনিধি : রাজেন্দ্র কুমার সিনহার কথা শুনলে অনেকেই অবাক হতেই হবে। তিনি কেঁচোর বদলে মোটরসাইকেল কিনেছেন। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এই কাজটি রাজেন্দ্র করেছেন পঞ্চাশ হাজার কেঁচোর বিনিময়ে।

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, এত কেঁচো তিনি কোত্থেকে পেলেন। এই প্রশ্নেরও জবাব পেলে অবাকই হতে হয়।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর এলাকার রাজেন্দ্র সিনহার নিজের মাত্র ১৩ শতাংশ জমি তার। এ জমির ফসলে সংসার চলত না বলে তাই অন্যের জমি বর্গায় চাষ করতেন। কিন্তু দিনরাত খাটনির পরও চার সন্তান নিয়ে চলা মুশকিল হয়ে পড়েছিল।

এই অবস্থায় রাজেন্দ্র পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন- পিকেএসএফের অধীনে ‘হীড বাংলাদেশ’ নামে সংস্থার কেঁচো ও কুঁচিয়া চাষ প্রশিক্ষণের কথা জানতে পারেন। এরপর তিনি তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এই দুটি প্রাণী চাষ করা শুরু করেন।

রাজেন্দ্র বলেন, ‘কিছু দিন আগে আমি হীডকে ৫০ হাজার কেঁচো দিয়েছি তারা আমাকে একটি মোটরসাইকেল দিয়েছে। প্রতি কেঁচো এক টাকা করে বিক্রি হয়।’

‘এখন আমরা সব কিছু হচ্ছে গল্পের মতো। গত দুই বছরে আমি কেঁচো চাষ করে তিন লক্ষ টাকা বিক্রি করেছি। কুচিয়া বিক্রি করেছি ২৫ হাজার টাকার। বড় মেয়ে পড়ার খরচ দিয়েছি এক লাখ ৭২ হাজার টাকা। মেয়ে এবার জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি হয়েছে। আমার পরিবার নিয়ে এখন আমি আরও সমৃদ্ধির সপ্ন দেখছি।’

রাজেন্দ্র জানান, তিনি আমার এখন চারটি রিং ও একটি প্লান্টে কেঁচো চাষ করেন। দুই বছর আগে শুরু করেছিলেন একটি রিং দিয়ে। পিকেএসএফ টাকা দিয়ে তাকে সহায়তা করেছে। এখন বোতল পদ্ধতিতে সবজিও চাষ করছেন তিনি।

রাজেন্দ্র সাফল্য দেখে এলাকার আরও অনেকে কেঁচো ও কুচিয়া চাষ করতে উৎসাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পিকেএসএফ আমাদের সমদ্ধির পথ দেখিয়েছে। এমন পদ্ধতি না থাকলে এই এলাকায় চা শ্রমিক হিসেবে বা একবার ধান চাষ করে আমাদের বাঁচতে হতো। এখন আমরা এ কাজ করার পাশাপাশি বিকল্প আয় করতে পারছি।’

রাজেন্দ্রর জীবনের মতো এমন গল্প কমলগঞ্জের এলাকায় বহু আছে। কেউ টার্কি পেলে, কেউ কুচিয়া চাষ করে, কেউ ছাগল পেলে আর্থিক সমৃদ্ধি পেয়েছে। কেউ বা আমার পুকুরে ভাসমান খাঁচা পদ্ধতিতে কুঁচিয়া চাষ ও সমন্বিত সবজি চাষ করছে।

চরিদিকে সিমেন্টের দেয়াল গড়ে তার ভেতরে প্লাস্টিকের পাইপে কুচিয়া চাষ করতে দেখা গেছে। কোন কোন জায়গায় আবার ডোবার নিচ থেকে জাল দিয়ে চাষ করা হয় প্রাণীটি।

সিলভা এরিকও পিকেএসএফের সহযোগিতায় সামনে কুচিয়া চাষ করে তিনি আয় বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি চাষ করেন মুরগি। ছয় মাসে বিক্রি করেছেন ২৫ কেজি, প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা করে। তার খাঁচায় ৪৫টি মুরগি আছে যেগুলোর প্রতিটির দাম প্রায় ২০০ টাকা করে।

মৌলভীবাজার জেলায় পিকেএসএফের সহায়তায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখা যায় এ চিত্র।

কমলগঞ্জে পিকেএসএফের কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করছে হীড বাংলাদেশ নামে বেসরকারি সংস্থা।

হীড বাংলাদেশের ‘লিফট, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ কার্যক্রম’ পরিদর্শন করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও পিকেএসএফের সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।

এ সময় খলীকুজ্জমান হীড বাংলাদেশের ব্রিডিং খামার পরিদর্শন করে ইনকিউবেটর (ডিম ফুটানোর মেশিন) উদ্বোধন করেন। এসময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) জসীম উদ্দিন, মহাব্যবস্থাপক (কার্যক্রম) মশিয়ার রহমান, ব্যবস্থাপক (প্রকাশনা) সুহাস শংকর চৌধুরী, কর্মসূচি উন্নয়ন কর্মকর্তা (সমৃদ্ধি) গোলাম রব্বানী।

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘আমরা যেখানে যেটা সম্ভব সবগুলোই করার চেষ্টা করছি। টার্কি শুধু এখানেই নয়, অন্যান্য জায়গাতেও এটি পালনে সহায়তা করছি, কুচিয়া পালনে সহায়তা করছি। আমাদের মূল বিষয় হচ্ছে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেখানে যা পারে, যা করতে চায় সেটা তাকে করে দিতে সহায়তা করছি।’

‘আমরা লক্ষ্য করলাম টার্কি এখানে চলতে পারে। সারা বাংলাদেশেই চলতে পারে। সে লক্ষেই আমরা শুরু করেছি। বাচ্চা টার্কি ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণ টার্কি হয়ে যায়। এজন্য পিকেএসএফ এ এলাকায় হীড বাংলাদেশ এর মাধ্যমে আমরা এ কাজগুলো এখনে বাস্তবায়ন করছি।’

‘আমরা প্রথমকে ১০টি বাচ্চা অনুদান হিসেবে দেই সদস্যদের। এ এলাকায় শুধু টার্কি নয় অন্য মুরগি পালন হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। এগুলো পালন করে এরই মধ্যে সাবলম্বী তো তারা হয়েছেই, আরও অর্থনৈতিকভাবে টেকসইভাবে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।’

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘আমাদের কাজ হচ্ছে অতিদরিদ্রদের আস্তে আস্তে উঠিয়ে নিয়ে আসা। এরপর তাদের টেকসই ভাবে সাবলম্বী করা। আমরা সেই সহায়তা দিয়ে থাকি।’

১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার পিকেএসএফ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে সারাদেশে ২৭৭ টি সহযোগী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দারিদ্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য কাজ করেছে সংস্থাটি।

আদমপুর এলাকায় ১৮ নারী সদস্য গড়ে তুলেছে তাদের একটি দল যার নাম রখা হয়েছে ‘সংগ্রামী নারী দল’। এই দলের সদস্যরা এর আগে শুধু চা পাতা তুলেই দিন পার করত। প্রতিদিন চা পাতা তুলে একেকজন পেতেন ৮৫ টাকা। এখন তারা চা পাতা তোলার পাশাপশি ছাগল পালন করছেন।

প্রতি জনের চারটি থেকে শুরুকরে ১২টি পর্যন্ত ছাগল আছে।

হীড বাংলাদেশের সিলেট এরিয়ার কৃণি ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত সদস্যদের মনিটরিং করি। আমরা শুধু টাকাই দেই না, সেটা যেন যথাযথ ব্যবহার করা হয় সেটা নিশ্চিত করি।’

(আজকের সিলেট/২১ জানুয়ারি/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন