২৬ জুলাই ২০২২
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : ছাতক উপজেলার জাউয়া ইউনিয়নের বড়কাপন বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার এগোলেই কপলা গ্রামের নাথপাড়া। এই পাড়ায় থাকেন নাথ সম্প্রদায়ের ১১৭টি পরিবার। গত মাসের মাঝামাঝিতে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে এই পাড়ার ৮০ শতাংশ পরিবার এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। পানি নেমে গেলেও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ায় এখনো নিজের ঘরে উঠতে পারেননি অনেকেই। বন্যার সময় যে ঘর ছেড়েছিলেন, এখনো আছেন পরের বাড়িতেই। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফা ১০ হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা করে সাহায্য দেওয়া হলেও নাথপাড়ার কেউ এ সাহায্য পাননি।
সুনামগঞ্জ জেলার অন্যতম হতদরিদ্র এই পাড়ার সংখ্যালঘু মানুষের ভাগ্যে খুব একটা ত্রাণও জোটেনি। সুনামগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (ডিডিএলজি) জাকির হোসেন ও ছাতকের ইউএনও মামুনুর রহমানের সহযোগিতায় ৭০টি পরিবারের জন্য একদিন কিছু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে গিয়েছিলেন আহমদ আল কবির নামের এক স্বেচ্ছাসেবী। এর বাইরে স্থানীয় মেম্বারের মাধ্যমে দুই কেজি করে চাল পেয়েছিলো কয়েকটি পরিবার। ত্রাণ বলতে এটুকুই।
গত রোববার দুপুর দেড়টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কপলা গ্রামের নাথপাড়া ঘুরে দেখা যায়, ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে ওঠা এই পাড়ার বেশিরভাগ ঘরের বেড়া ভাঙাচোরা, মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে। অনেকের ঘরের আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে, বাসনকোসন ভেসে গেছে। বিছানা-বালিশ ভিজে মেঝেতে পচে আছে। বাঁশের খুঁটি ও টিন দিয়ে নির্মিত কাঁচা ঘরগুলোর বেশির ভাগই বেড়ার নিচের অংশ পানির স্রোতে ভেঙে গেছে। এই অবস্থায় আধো আলো-আধো অন্ধকার ঘরের কোণে গাট্টিবোচকা গাদাগাদি করে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে বসবাস করছে বিধবা, প্রতিবন্ধী ও হতদরিদ্র পরিবারগুলো।
ডোবার পাশে নিজের আধভাঙা টিনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিধবা নারী সুকুমারী বালা দেবী (৬১)। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তার স্বামী উপেন্দ্রনাথ মারা গেছেন তিন বছর আগে। একমাত্র ছেলে সত্যেন্দ্র দেবনাথ ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করে। আট বছর বয়সী নাতনি তনুশ্রী দেবনাথকে নিয়ে ঘরে থাকতেন তিনি। ১৬ জুন বৃহস্পতিবার রাত বারোটায় ঘুম ভাঙার পর দেখেন ঘরে কোমর সমান পানি হয়ে গেছে, তখনই সব কিছু ফেলে নাতনিকে নিয়ে উঠেন বড় বোন দিপালীর বড়িতে। পানি কমার পর ঘরে ফিরে দেখেন সব শেষ। পানির তোড়ে বাসনকোসন ভেসে গেছে। বিছানা-বালিশ ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের তিনটি বেড়ার অর্ধেকটাই ভেঙে গেছে। বাঁশের খুঁটিগুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে। আট বছরের নাতনি তনুশ্রী এখন এই ঘরে থাকতে সাপের ভয় পায়। ফলে নাতনিকে নিয়ে তিনি এখনো বোনের বাড়িতেই আছেন।
বিধবা ভাতা বা সরকারি কোনো সাহায্য পান না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুনেছি ঘর মেরামতের জন্য সরকার গরিবদেরকে টাকা দিচ্ছে। আমার নাম উঠানোর জন্য মেম্বারকে বলেছিলাম, উঠায় না। বলে, তোমার ঘর যেহেতু মাটিতে পড়ে যায়নি, তাই তোমার নাম উঠানো যাবে না।’
একই কথা জানালেন ভূমিহীন নারী সীতা রাণী নাথও (৪৫)। কাঁচা ঘর বানিয়ে অন্যের জায়গায় থাকেন তিনি। ১৬ জুন রাতে ঘরে পানি উঠে গেলে আশ্রয় নেন একই গ্রামের সুবোধের বাড়িতে। বন্যার পানি নেমে গেলে ঘরে ফিরে দেখেন বেড়া ভেঙে গেছে। কাঁথা-বালিশ ও জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। হাঁড়িবাসন ভেসে গেছে। ফলে এখনো নিজের ঘরে উঠতে পারেননি তিনি।
সীতা রাণী জানান, বন্যার আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্বামী রতনমণি নাথ অচল হয়ে যান। এক ছেলে সেলুনে কাজ করে টানাটানির সংসার চালায়।
তিনি বলেন, ‘ঘর মেরামতের জন্য সরকারি সাহায্যের লিস্টে আমার নাম উঠানোর কথা মেম্বারকে বলেছিলেন। কিন্তু উঠায় না।’
দেড় বছর আগে স্বামী হারানো প্রণতি দেবনাথ (২৭) জানান, বন্যার পানির তোড়ে তার ঘরের টিনের বেড়া ভেঙে গেছে। কাঁথা বালিশ ও কাপড়চোপড় নষ্ট হয়ে গেছে। দশ বছর আগে বিয়ে হয়েছিলো তার। বছর দেড়েক আগে কৃষিক্ষেতে মই দেওয়া অবস্থায় মারা যান স্বামী লিটন দেবনাথ। ছয় বছরের একটি মেয়ে ও দেড় বছরের একটি ছেলেকে নিয়ে তিনি আছেন শ্বশুর উপেন্দ্রনাথের ভিটায়। অভাব অনটনের কারণে তার দুটি সন্তানই অপুষ্টিতে ভুগছে। সরকারি সাহায্য ও বিধবা কার্ডের জন্য তিনি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের কাছে দুইবার গিয়েছিলেন। আজও পাননি।
বন্যায় সম্পূর্ণ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান সুবধনী নাথ। নিঃসন্তান এই দম্পতি এখন বাস করছেন পরে ঘরে।
গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এখনো নিজের ঘরে উঠতে পারেননি সন্ধ্যা রাণী নাথও (৬৫)। বন্যার দিন থেকেই মানসিক প্রতিবন্ধী স্বামী কাঞ্চা নাথকে নিয়ে পরের ঘরে থাকছেন নিঃসন্তান এই নারী।
ঘরের বেড়া ভেঙে গেছে দিপালী দেবনাথেরও (৩৬)। প্রতিবন্ধী এক ছেলেকে নিয়ে বাস করছেন শ্বশুরের আশ্রয়ে।
বিধবা নারী তরুরাণী নাথ (৪৫) জানান, বিবাহযোগ্য একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ভাঙা বেড়ার ঘরে ভয়ে ভয়ে বসবাস করছেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামী শিবেন্দ্র দেবনাথকে নিয়ে ভাঙা বেড়ার ঘরে বসবাস করছেন ঝুনু দেবী (৬০)।
গোপেন্দ্র দেবনাথ জানান, বন্যার পানি কমে গেলেও এখনো তিনি নিজের ঘরে উঠতে পারেননি। থাকছেন গ্রামের নিরঞ্জনের বাড়িতে।
নাথপাড়ার রেখা রাণী দেবনাথ, নিকলেশ দেবনাথ, বারিন্দ্র নাথ, চম্পকা দেবী, লীলা দেবী, জোসনা দেবী, প্রণতি নাথ, বীরেন্দ্র দেবনাথ, বিপুলা দেবী, মনমোহিনী নাথ, চানমণি দেবনাথ, সুচিত্রা নাথ, বসন্ত দেবনাথ, জয়কুমার দেবনাথ, মলিন্দ্র দেবনাথ ও তারাচান দেবনাথ জানান, তাদের ঘরগুলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো সাহায্য পাননি তারা।
জানতে চাইলে জাউয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল জলিল বলেন, আমার ওয়ার্ডে যাদের ঘর মাটিতে পড়ে গেছে, এমন মাত্র চারটি ঘরের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে সাহায্য পেয়েছিলাম। এজন্য ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতে সরকারি সাহায্যের তালিকায় নাথপাড়ার কারো নাম দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছে আমি তাদের নাম দিয়েছি।
জাউয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা স্থানীয় মেম্বারের মাধ্যমে প্রস্তুত হয়ে আসে। এরপর যাচাই-বাছাই করে সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়। কপলা নাথপাড়ার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কারো নাম যদি আমার হাতে আসে, আমি নিজহাতে তাকে সাহায্য পৌঁছে দেব। বিধবা কার্ডের ব্যাপারে তিনি বলেন, তিন বছর ধরে সরকার কোনো বিধবা কার্ড দিচ্ছে না বলে নাথপাড়ার বিধবাদের দেওয়া যাচ্ছে না।