২০ জুলাই ২০২২


রেলে ‘ঘাটে ঘাটে দুর্ভোগে’ সিলেটবাসী

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : রেল ভ্রমণে দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না সিলেটবাসীর। বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তা বেড়েই চলেছে। ট্রেনে আগুন, ঘনঘন দুর্ঘটনা, ঝুঁকিপূর্ণ লাইনে ট্রেনের রানিং আওয়ার বেড়ে যাওয়াসহ অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মোকাবেলা করে ট্রেনে যাতায়াত করছেন সিলেটের যাত্রীরা। ট্রেনের রানিং আওয়ার কমানোসহ দুর্ভোগ লাঘবে কোরিয়া থেকে ২০০ মেঘা হর্স পাওয়ার সম্পন্ন ৩০টি রেল ইঞ্জিন আনা হলেও লাইন ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় এসব ইঞ্জিন সিলেট লাইনের কোনো ট্রেনে সংযুক্ত করা হয়নি। আর স্বপই থেকে গেছে আখাউড়া সিলেট সেকশনে রেলের ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প। বরং রেল লাইনের স্থানে স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ এবং স্লিপার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই রুটে ট্রেনের গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। এরপরও প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। আর ডাবল লাইন না থাকায় ওইদিনের সিলেট অঞ্চলের বেশিরভাগ ট্রেনের যাত্রীদের চড়া মাশুল দিতে হয়।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া সেকশনে ১৭৮ কিমি রেলপথ রয়েছে। দীর্ঘ এ পথে ছোট-বড় ২৫০টির বেশি সেতু রয়েছে। সর্বনিম্ন ৩ ফুট থেকে ৩০০ ফুট দীর্ঘ সেতুগুলো ৬০-৭০ বছর আগে নির্মিত। প্রতিদিন এ রেলপথে ৬ জোড়া আন্তঃনগর এবং ৮টি ডেমু ও লোকালসহ কয়েকটি পণ্যবাহী ট্রেনও চলাচল করে।

রেললাইনের ক্লিপ ও হুক উঠে যাওয়া, সেতু-কালভার্ট সংস্কারের অভাব ও রেলসেতুর কাঠের স্লিপারগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রেলপথটি। দুর্ঘটনাও ঘটেছে অহরহ। ২০১৯ সালের ২৪ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও বরমচাল রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে ব্রিজ ভেঙে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন নিচে পড়ে ৫ জন নিহত ও অসংখ্য যাত্রী আহত হন। এরপর কয়েকটি ব্রিজ মেরামত করা হলেও ট্রেন লাইন এখানো ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।

রেলওয়ে সুত্র জানিয়েছে, আখাউড়া সিলেট রেললাইনের অবস্থা এখন এতোই শোচনীয় যে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আমদানিকৃত ২০০ হর্স পাওয়ারের বেশি শক্তির ৩০টি ইঞ্জিন আনা হলেও এসব ইঞ্জিন সংযুক্ত করা যায়নি।

উল্লেখ্য, সিলেটের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে। দুটি রেলপথের সাধারণ অংশ আখাউড়া-সিলেট সিঙ্গেল লাইন মিটার গেজ রেলপথ। আখাউড়া-সিলেট রেলপথের এই অংশটি আখাউড়া-কুলাউড়া-শাহবাজপুর-মহিষাধন (করিমগঞ্জ, ভারত) রেলপথের অংশ হিসেবে ১৮৯৬ সালে তৈরি হয়। আর কুলাউড়া-সিলেট রেলপথটি ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃক তৈরি করা হয়। আখাউড়া-সিলেট রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য ১৭৬.৬০ কিলোমিটার। এই অংশে মোট ৩৪টি স্টেশন (৩৪টি বি ক্লাস এবং ১১টি ডি ক্লাস স্টেশন) রয়েছে। এ সেকশনটি ৭৫ পাউন্ড ‘এ’ রেল এবং কংক্রিট স্লিপার (কিছু অংশে প্রায় ২৪ কিমি স্টিল স্লিপার) সমন্বয়ে তৈরি। এ অংশটি পাহাড় টিলা বিস্তৃত হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে স্টেপ গ্রার্ডিয়েন ও সার্প কার্পভ সমন্বয়ে নির্মিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হুন্দাই রোটেম থেকে আমদানিকৃত ২০০ হর্স পাওয়ারের বেশি শক্তির ৩০টি ইঞ্জিন সম্প্রতি আনা হয়। কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত ইঞ্জিনগুলো উচ্চগতির। নড়বড়ে, পাথরবিহীন রেললাইনে উচ্চগতির ও অধিক ওজনের এই ইঞ্জিনগুলো চলতে পারে না। তাই নতুন ইঞ্জিনগুলো সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলের অনুমতি দেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার আবু জাফর মিয়া বলেন, সিলেট-আখাউড়া সেকশনে রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও স্থানে স্থানে আমাদের লোকজন মেরামত কাজ করছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি আরও জানান, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত ৩০টি ইঞ্জিন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলছে।

রেলওয়ে সূত্র আরও জানায়, সিলেট অঞ্চলের যাত্রীদের দুর্ভোগ লাগবে সিলেট-আখাউড়া রেলপথটি ডাবল লাইন উন্নীত করতে ২০১৯ সালের আগস্টে ডিও ( আধা সরকারি পত্র) দেন তিন মন্ত্রী। তারা হলেন-সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এবং সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়কমন্ত্রী ইমরান আহমদ। একই মাসে একই অনুরোধ জানিয়ে ডিও দেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। কিন্তু এই স্বপ্ন এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) ধনঞ্জয় নাথ মজুমদারের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার সরকারি ফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও অফিস থেকে জানানো হয় ‘স্যার’ মিটিংয়ে আছেন।

শেয়ার করুন