২৪ মে ২০২২
ডেস্ক রিপোর্ট : বন্যা আসলো চলেও যাচ্ছে, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্ধও আসছে কিন্তু নগরীর দুর্গত মানুষদের মাঝে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্ধকৃত সেই ত্রাণ সামগ্রী এখনো বিতরণ করেনি সিলেট সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে নগরজুড়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। সচেতন মহল মনে করছেন বন্যা শেষ হয়ে গেলে এসব ত্রাণ বিতরণ করে কি লাভ হবে?
জানা যায়, নগরীর বিভন্ন এলাকায় পুরো এক সপ্তাহ থৈ থৈ পানিতে দিনরাত কাটানোর পর গত ৩ দিন ধরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে অনেকে এলাকায় পানি পুরোপুরি নেমে যায়নি। সিলেট মহানগরের অপেক্ষাকৃত নিচু এবং সুরমা নদীসংলগ্ন এলাকা এখনও নিমজ্জিত রয়ে গেছে। বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কিছু পরিবার বাসা-বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। তবে এখনও অনেক মানুষ রয়ে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে।
গত ২০ মে সিটি কর্পোরেশন এলাকার বন্যাদুর্গতদের জন্য দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৬৩ মেট্রিকটন চাল, নগদ ২ লাখ টাকা ও ২২শত টাকা মূল্যের ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দিলেও আজ পর্যন্ত তা বিতরণ করেনি সিসিক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট জেলার নিম্নাঞ্চল গেল ১০ তারিখ থেকে প্লাবিত হলেও নগরে ১৫ তারিখ পানি প্রবেশ করে রাস্তাঘাট, দোকানপাট, ঘরবাড়ি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্লাবিত হয়। তখন থেকে নগরবাসী জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তির শিকার হোন। নগরবাসী জলজটে বন্দী থাকলেও নিজের ব্যক্তিগত ১২ দিনের সফরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন নগরপিতা আরিফুল হক চৌধুরী। তবে তিনি তার ব্যক্তিগত সফরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ নিজ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৃটেনে সাক্ষাৎ-এ মহা ব্যস্ত ছিলেন। তখন থেকে নগরপিতার অনুপস্থিত অনুভব করেন সিলেটবাসী। তারা নগরবাসীর দুর্যোগের সময় মেয়রের যুক্তরাজ্য অবস্থানকে মেনে নিতে পারেননি। তবে নিজের ১২ দিনের সফর শেষে ৬ মে যুক্তরাজ্যে যাওয়া মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ১৯ মে দেশে ফিরেন। দেশে এসে তিনি নগরবাসীর কাছে তথ্য প্রতারণা করেন। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি আমার সফর সংক্ষিপ্ত করে বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে এসেছি। তবে দেশে ফেরার ৬ দিন হলেও এখন পর্যন্ত নগরের বন্যাদুর্গতদের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ ত্রাণ বা সহায়তার হাত বাড়ান নি এমন অভিযোগ নগরবাসীর। তারা বলছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে খিচুরি আর পরিদর্শন করে মেয়র আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এমন নাটক না করলেও পারতেন।
নগরের উপশহরের বাসিন্দা সাবেক ব্যাংকার মখদ্দুস আলী বলেন, আমাদের এলাকায় মোটামুটি স্বাবলম্বী লোকজন বসবাস করেন। বন্যায় আমাদের এলাকা আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাব অনেক টের পেয়েছে। আমাদের এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অনেক সংকট ছিল। আমাদের এলাকায় যেমন মিডিল ক্লাস লোকজন বসবাস করেন তেমনি নিম্ন শ্রেণির অনেকেই বসবাস করেন। তাদের সিটি করপোরেশন কেয়ার করার কথা ত্রাণ তো দিবে দূরের কথা সেভাবে খোঁজখবর নেয় নি।
ষাটোর্ধ মখদ্দুস বলেন, শুনছি এবং সংবাদে পড়েছি পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হবে। এখন পর্যন্ত কোথাও এর ছিঁটেফোঁটা দেখা যায়নি। কথায় ফাস্ট সিসিক।
জামতলার ব্যবসায়ী শামি আহমেদ বলেন- পানি কিছুটা নামলেও দূষিত জিনিস, ময়লা এখনো বাড়িঘরের বারান্দার মধ্যে রয়েছে। কাউন্সিলর কিংবা দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি এই অবস্থা পরিদর্শনের জন্যে আসেননি। পানি উঠে তার দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোনো কাউন্সিলর বা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এসে সহানুভূতিটুকুও জানাননি। এছাড়া, দূর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে মশার উৎপাত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঘরের ভেতর মশার কামড়ে টিকে থাকা দায়।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির বলেন, আবারও শান্তিপ্রিয় নগরবাসীর সাথে ধোঁকাবাজী ও মিথ্যাচরণ করেছেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি তার প্রাপ্ত সকল ছুটি কাটিয়ে সিলেট ফিরেছেন। লন্ডন সফর সংক্ষিপ্ত করে এসেছেন বলে তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, তিনি ১২ দিনের ছুটি নিয়ে ছুটির সময়সীমা পূর্ণ করে কি ভাবে তা সংক্ষিপ্ত করলেন। আমরা সিলেটবাসী এর সঠিক তথ্য চাই ; যদি সংক্ষিপ্ত করে থাকেন তার প্রমাণ সিলেটের জনসাধারণের কাছে দেন।
সস্তা প্রচারণা করা থেকে মেয়র আরিফকে বিরত থাকার কথা বলে সাবেক এ ছাত্রনেতা বলেন, মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজেকে মহান বানাতে সস্তা প্রচারণায় নেমেছেন। প্রাপ্ত ছুটি কাটিয়েও নিজের সফরকে সংক্ষিপ্ত করে বন্যার্তের পাশে দাঁড়াতে এসেছেন বলে প্রচার করছেন। এমন সস্তা প্রচারণা ও এহেন মিথ্যাচারীতার জন্য নগরবাসীসহ বানবাসী অসহায় মানুষদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত মেয়রের।
সিলেট জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী স্যার ও ডিসি স্যার বন্যার্তদের যা যা করার প্রয়োজন তা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরাও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করি। এ পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশনকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মধ্যে ৬৩ মেট্রিকটন চাল, নগদ ২ লক্ষ টাকা ও ২২শত টাকা ধরের ৮ জাতীয় পণ্য ১ হাজার প্যাকেট দেয়া হয়েছে। গত ২০ তারিখ সিটি করপোরেশনের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। বারবার বলার পর গেল গতকাল সোমবার জেলা ত্রাণ গুদাম থেকে সিটি করপোরেশন এসব গ্রহণ করে। তবে বার বার তাদের এসব বিতরণ করার তাগিদ দেয়া হলেও আজ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়নি। কবে বিতরণ করা হবে এ তথ্যও জানিনা।
সিসিকের প্রথম মেয়র ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান পুত্র ডা. আরমান আহমেদ শিপলু বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকতে। আমি আমার প্রয়াত পিতার মতো নগরবাসীর পাশে থাকার চেষ্টা করছি। আমৃত্যু আমার পিতা নগরবাসীর সেবায় ছিলেন। আমিও চেষ্টা করে যাচ্ছি। বন্যার্ত লোকজনের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে আমাদের জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের গঠিত মেডিকেল টিম কাজ করছে। তাছাড়া আমাদের পারিবারিক সংগঠন কামরান-আছমা হেলথ্ কেয়ার সার্ভিস মেডিকেল টিম গঠন করে কাজ করছে।
তিনি বলেন, সিসিক কেন ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছে না সেটা আমরা জানি না। তবে আপনার মাধ্যমে জানলাম বরাদ্দের ত্রাণ ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়নি। যা অপ্রত্যাশিত ও অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা আশা করবো সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর মোবাইল ফোনে বার বার কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেন নি।
তবে সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী বলেন, আমরা ত্রাণের প্যাকেট রেডি করছি এজন্য দেরি হচ্ছে। মেয়রর মহোদয়ের নির্দেশনা পেলেই তা বিতরণ করা হবে।